নরসিংদীতে চাঁদাবাজদের হাতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন, মোহাম্মদপুরের আসাদগেটে রিকশাচালকদের হাতে পুলিশের সার্জেন্ট লাঞ্ছিত হয়েছেন। এ দুটো ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কেননা ইতিপূর্বে বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা হতাহতের শিকার হয়েছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শৃঙ্খলার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত তারাই যদি যথাযথ দায়িত্ব পালনের সময় হামলার শিকার হয় তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে শঙ্কার আবির্ভাব হওয়াটাই স্বাভাবিক। মানুষের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে। সব পর্যায়ের মানুষের মাঝে আক্রান্ত হওয়ার ভয় পরিলক্ষিত হচ্ছে। ঘর থেকে বের হয়েই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ততার মুখোমুখি হচ্ছে; এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দেশের সব পর্যায়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে একযোগে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় এখনো মবের ঘটনা চলছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে মবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। কার্যত গুরুত্বপূর্ণ তেমন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। কেননা, একটার পর একটা ঘটনা ঘটেই চলছে। বিশেষ করে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেসবের মূল্যায়ন করে প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করে আইনের মুখোমুখি করে বিচার নিশ্চিত করা অবশ্য কর্তব্য। এর ব্যত্যয় হলে দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে দেখা যায়, কিছু কিছু জায়গায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে প্রতিপক্ষকে শত্রুতাবশত হত্যার ঘটনা ঘটছে। আহত কিংবা অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ততার ঘটনাগুলোও বিভিন্ন জায়গায় ঘটে যাচ্ছে। সব ঘটনার খবরাখবর পত্রিকার পাতায় আসছে না, এ ব্যাপারটিও মেনে নিতে হবে। ডার্ক ফিগার অব ক্রাইমের কারণে অপরাধের সঠিক খবরাখবর প্রকাশ্যে আসে না। আবার যারা দায়িত্বশীল পর্যায়ে রয়েছেন তাদের ব্যাপারেও অভিযোগের পাহাড় দৃশ্যমান। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিতে তদন্ত কাজের কোনো অগ্রগতি নেই কিংবা আদৌ তদন্ত হবে কি না, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ তথা শৃঙ্খলা ফেরাতে যৌক্তিক অবস্থান নিশ্চিতে সঠিক পদক্ষেপের অভাব রয়েছে।
সারা দেশে নতুন করে অপরাধীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গাজীপুর ও চট্টগ্রামে কলকারখানা ও গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসংখ্য শ্রমিক বেকার হয়েছে। কর্মহীন হয়ে কেবলমাত্র জীবনের তাগিদে অনেকেই অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। প্রয়োজনের তুলনায় আয়-রোজগার কমে আসায় কেউ কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এমন একটা অবস্থা দাঁড়িয়েছে যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে কতিপয় জনগণ। আবার কিছু কিছু জায়গায় উদ্ভূত বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনের মাত্রাও সাম্প্রতিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।
অনলাইন স্পেসে সাইবার বুলিংয়ের মাত্রাও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাইবার অপরাধ ও সাইবার অপরাধীর সংখ্যা বেড়ে চলছে। অন্যদের খাটো করে, ছোট করে, প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ও আলোচনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে সামাজিক বিচ্যুতি ও অনিয়মের মাত্রাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থী ও সমাজের গণ্যমান্যদের নিয়েও ফেসবুকে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। পরস্পর বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটছে। জমি দখল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জবরদখলকে কেন্দ্র করে হানাহানি, মারামারির ঘটনাও অহরহ ঘটেই চলছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে একই রাজনৈতিক দলের সদস্যদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও আইনগতভাবে রাষ্ট্রকর্তৃক দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উল্লেখযোগ্য নজির দেখা যাচ্ছে না। অপরাধীরা বিনা বাধায় সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ফেরাতে যথোপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। সমাজকে ঢেলে সাজাতে হলে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক ও সহনশীল করতে সরকারকে আইন প্রয়োগে কঠোর হতে হবে। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে, অপরাধীদের আইনের হাতে সোপর্দ করে রাষ্ট্রীয় আইনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিশ্চিত করতে হবে, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মতো অন্য সব অপরাধের ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণু নীতি প্রণয়ন করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে গ্রেপ্তার কিংবা হয়রানি করা যাবে না। আবার রাজনৈতিক পরিচয়ে কাউকে দায়মুক্তি দেওয়াও যাবে না। যেসব অপরাধ ইতোমধ্যে ঘটেছে প্রত্যেকটি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনসাপেক্ষে সঠিকভাবে তদন্ত করে দায়ীদের শনাক্ত করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দিতে হবে; থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। দাগি আসামিদের ব্যাপারে সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে সরকারকে। সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাই জনগণকে আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তুলবে এবং আমরা আশাবাদী সরকার এ পথেই নিরপেক্ষতা দেখাতে সচেষ্ট থাকবে। সরকার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারলে আইনের শাসন বাস্তবায়নে জনগণও সরকারকে সহযোগিতা করবে।
দ্বিতীয়ত, যেসব অপরাধী কারাবরণ করে জামিনে ফেরত এসেছে কিংবা শাস্তি ভোগ করে সমাজে ফিরে এসেছে, তাদের পুনর্বাসনের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে যথার্থ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়; অপরাধীরা অপরাধ করার পর সমাজ থেকে চ্যুত হয়ে পড়ে কিংবা বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য করা হয়। ফলে অপরাধীরা বারবার অপরাধ করে কোনোভাবে টিকে থাকতে চায়। আবার এও বলা যায়, সমাজ অপরাধীদের ভালো হওয়ার সুযোগ না রাখায় অপরাধীরা পুনরায় অপরাধ করতে বাধ্য হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অপরাধীদের সমাজের অংশ বিবেচনা করে নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, তরুণ প্রজন্মকে সঠিক ও স্বাভাবিক পথে পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে সমাজের সিনিয়র সিটিজনদের। শুধু তাই নয়; সমাজকে সুপথে পরিচালনার জন্য তরুণদেরও কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, তরুণদের দিয়েই আগামীর বিশ্ব পরিচালিত হবে। সে কারণেই তরুণদের সঠিক শিক্ষা প্রদানের নিমিত্তে সমাজ ও রাষ্ট্রকে আধুনিক ও যুগোপযোগী ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি কিশোর অপরাধ দমনে পরিবারকে দায়িত্ব নিতে হবে, কিশোর অপরাধের ভয়াবহতায় সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। কিশোরদের সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে আগামীতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন কঠিন কোনো কাজ হবে না। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সমস্যার বিষয়ে এক সদস্য যাতে অন্য সদস্যদের ওপর ভরসা কিংবা নির্ভর করতে পারে, সেসব নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিহতে দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নে নাগরিকেদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। জবাবদিহির অনুশীলনের মাধ্যমেই সত্যিকারের সুশাসন নিশ্চিত করা যায়। সুশাসন নিশ্চিতে রাষ্ট্রের সব জায়গায় জবাবদিহির চর্চা করতে হবে। রাষ্ট্রের সব সেক্টর ও প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরানো সহজ হবে।
পরিশেষে বলা যায়, দায়িত্ব নিয়ে সবাইকে কাজ করতে হবে। প্রত্যেক নাগরিকের কর্ম রাষ্ট্রের কাছে মহামূল্যবান। মনে রাখতে হবে, দেশের শৃঙ্খলা রক্ষা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। রাষ্ট্রের সব বিভাগ ও জনগণ সর্বসম্মতিক্রমে একত্রিত হয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণের শপথের মধ্যদিয়ে দেশের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব হবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

