তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই দারিদ্র্যের একটি প্রধান কারণ দুর্নীতি। আমাদের দেশও এর থেকে মুক্ত নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শিখিয়েছে। আগামীতে এমন একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সব মানুষ ন্যায্যতার ভিত্তিতে তার অধিকার ভোগ করতে পারে। এজন্য দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্নীতিবাজ এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে।…

দুর্নীতি এমনই এক সামাজিক ব্যাধি, যা থেকে বিশ্বের কোনো দেশই সম্পূর্ণভাবে মুক্ত নয়। প্রতিনিয়তই দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে দুর্নীতির মাত্রা তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম হলেও স্বল্পোন্নত ও দরিদ্র দেশগুলোতে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার প্রত্যক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে দুর্নীতি। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে সর্বত্রই। এমনকি যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন, তারাও আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েন। সুযোগ আছে অথচ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার শুরু হয়। যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন, তারা অথবা তাদের আজ্ঞাবহ গোষ্ঠী নানাভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটে নিচ্ছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি শাসকচক্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্য নিরসনের মাধ্যমে এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক মুক্তি এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এ দেশের লাখো মানুষ জীবনের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। আমরা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে দেশের ভৌগোলিক স্বাধীনতা পেয়েছি ঠিকই; কিন্তু মানুষ এখনো অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে পারেনি। অনেকের মনে থাকার কথা, ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রচারণাকালে একটি পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছিল। ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ শিরোনামে প্রকাশিত সেই পোস্টারে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মাঝে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। সেই পোস্টার সাধারণ ভোটারদের মনে দারুণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। সাধারণ মানুষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানিয়েছিল। তারা ভেবেছিল, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হলে সব ধরনের বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শোষণ দূর হবে। এভাবে চলতে থাকায় ১৯৭৪ সালে দেশে দেখা দেয় স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। সেই দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে মারা যায়। অর্থনীতিবিদরা গবেষণা করে বলেছেন, শুধু খাদ্যাভাবের কারণে ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়নি। দেশে সেই সময় বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য মজুত ছিল; কিন্তু সেই খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থায় নানা দুর্নীতি থাকার কারণেই মূলত এমন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়। অর্থাৎ ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ অনেকটাই ছিল মনুষ্যসৃষ্ট।
রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের মধ্যে স্ববিরোধিতা প্রত্যক্ষ করা যায়। দলটির নেতারা মুখে যা বলেন, তা করেন না। আর যা করেন, তা মুখে বলেন না, অন্তরে পুষে রাখেন। আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল, তখন তারা দুর্নীতি ও দলীয়করণের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে দুর্নীতি আর দলীয়করণ ও আত্মীয়করণকে মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। দলীয়করণ ও আত্মীয়করণ ছিল আওয়ামী লীগের মূল লক্ষ্য। কোনো রাজনৈতিক দল যদি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ না থাকে, তাহলে সেই সরকারের আমলে দুর্নীতি-অনাচার বেশি হয়। ২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধান থেকে বাতিল করে দেয়। এরপর তারা দেশে জঘন্যতম স্বৈরশাসন চালাতে থাকে। মানুষের সব ধরনের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত একতরফা এবং বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রক্ষমতা চিরস্থায়ী করার স্বপ্নে বিভোর হয়। রাষ্ট্রক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য তারা আজ্ঞাবহ চাটুকার শ্রেণি গড়ে তোলে। বিভিন্ন গোষ্ঠীকে দুর্নীতি করার সুযোগ দিয়ে অনুগত করে রাখে। সব সরকার আমলেই শাসকগোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দুর্নীতির বিস্তার লাভ করার প্রমাণ মেলে। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরও বর্তমান সরকার দুর্নীতি দমনে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। তাই দুর্নীতি রোধে দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে লাগসই কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিগত সরকারের আমলে দেশের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জানার জন্য যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার সমতুল্য ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এটাই দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের পূর্ণ চিত্র নয়। এর বাইরে আরও অনেক অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত হয়েছে। বিগত সরকার আমলে যারাই দুর্নীতির মাধ্যমে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হয়েছেন, তাদের সবারই রাজনৈতিক পরিচয় ছিল। দেশে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছিল, সরকারদলীয় সমর্থক না হলে কারও পক্ষে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জন করা সম্ভব হতো না। আর সরকারদলীয় সমর্থক হলে দুর্নীতি করেও পার পাওয়া যেত। দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যত ‘ঠুঁটো জগন্নাথে’ পরিণত করা হয়েছিল। সরকার-সমর্থক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দুর্নীতি করলে দুদক সেখানে চুপ থাকত। আর বিরোধীদলীয় কেউ সামান্য পরিমাণ দুর্নীতি করলে অথবা দুর্নীতি না করেও দুদকের হয়রানির শিকার হতে হতো। বেগম খালেদা জিয়ার নামে যে মামলায় তাকে শস্তি দেওয়া হয়, তা তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে দায়েরকৃত। অথচ একই সময়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ১৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। আমাদের দেশে দুর্নীতির করতেও রাজনৈতিক পরিচয় প্রয়োজন হয়। বিগত সরকার আমলে সরকারদলীয় স্থানীয় পর্যায়ের নেতারাও হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। লুটপাটের জন্য যত ধরনের আইনি পরিবর্তন করা প্রয়োজন তা করা হয়েছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান মোতাবেক, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এটি খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র নয়। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আড়াল করে রাখা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে আনা হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করে যাবে বলে অনেকেই মনে করছেন।
বাংলাদেশে কোনো সরকারই দুর্নীতি প্রতিরোধকে তাদের মূল এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করেনি। সরকার পরিবর্তন হলেও দুর্নীতিবাজদের কিছু হয় না। তারা রং বদলে নতুন সরকারের আজ্ঞাবহ হিসাবে নিজেদের জাহির করে আবারও নবউদ্যমে দুর্নীতি শুরু করে। কথায় বলে, ‘অর্থই সকল অনর্থের মূল’। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, অর্থ ছাড়া আমাদের এক মুহূর্তও চলে না। কিছু মানুষ মনে করেন, ‘Money is the second god’। তারা বিশ্বাস করেন, অর্থই হচ্ছে সব জাগতিক ক্ষমতার উৎস। তাই যেভাবে পার অর্থ উপার্জন কর। তারা অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে কোনো নীতি-নৈতিকতার ধার ধারে না। প্রচলিত আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে অন্যায়ভাবে অর্থ বা সম্পদ উপার্জনকেই সাধারণভাবে দুর্নীতি বলা যেতে পারে। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিস্ময়কর উন্নতি করেছে; কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল ন্যায্যতার ভিত্তিতে বণ্টিত হয়নি বলে দেশে মানুষে মানুষে, অঞ্চলে অঞ্চলে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান আয়-বৈষম্য ছিল অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের ২৮ শতাংশ ছিল শীর্ষ ১০ শতাংশ বিত্তবান পরিবারের অধীনে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসে জাতীয় আয়ে তাদের অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ শতাংশে। আর একই সময়ে জাতীয় আয়ে শীর্ষ ১০ শতাংশ দরিদ্র পরিবারের অংশ ২ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ১ দশমিক ৩১ শতাংশে নেমে এসেছে। গত সরকারের লজ্জাজনক বিদায়ের পেছনে দুর্নীতি একটি বড় কারণ ছিল। তাদের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে দেশে বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে।
তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই দারিদ্র্যের একটি প্রধান কারণ দুর্নীতি। আমাদের দেশও এর থেকে মুক্ত নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শিখিয়েছে। আগামীতে এমন একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সব মানুষ ন্যায্যতার ভিত্তিতে তার অধিকার ভোগ করতে পারে। এজন্য দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্নীতিবাজ এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে, তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগে কারও বিরুদ্ধে মামলা করা হলে তার সমুদয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে জব্দ করা যেতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই প্রমাণ করতে হবে তিনি নির্দোষ। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে তাকে তার সম্পত্তি ফেরত দেওয়া হবে। মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতিবাজকে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠিন শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। ইচ্ছাকৃত বৃহৎ ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্নীতিবাজ ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদিতে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া যাবে না এবং তাদের সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


.jpg)