অধিভুক্তির ফলে কিছু সমস্যা তো হবেই, সেগুলো কাটিয়ে ওঠার বহু পথ ছিল। অতিরিক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা অবসরে যাওয়া শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের দিয়ে কাজ করানো যেত, যা এই সাত কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বলতে পারতেন। তা না করে বিশ্ববিদ্যালয় চেয়েছেন। সরকার দাবি মেনে নিয়ে কাজ করছে। সময় তো লাগবেই। এত দ্রুত তো কোনো সমাধান সম্ভব নয়। এখানে জাদু দিলেই তো বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যাবে না।...

সাত কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার আন্দোলন আরও নতুন নতুন সমস্যা ডেকে আনবে বলে আমি পূর্ববর্তী কয়েকটি লেখায় বলেছিলাম। আমি লিখেছিলাম, এটি সমস্যার সমাধান নয় বরং শুরু। দেখলাম তাই হচ্ছে। এখন ত্রিমুখী আন্দোলন সংকটককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশে জারির দাবিতে বেশ কয়েকদিন ধরে আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা। এরই ধারাবাহিকতায় ৭ ডিসেম্বর ২০২৫ আন্দোলনে ছিলেন সাত কলেজের স্নাতক স্তরের শিক্ষার্থীরা। তারা শিক্ষা ভবন ঘেরাও করে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ জারির দাবি জানান। শিক্ষার্থীরা বলছেন, অধ্যাদেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত তারা অবস্থান ছাড়বেন না। দুপুর ১টার দিকে আন্দোলনকারীরা শিক্ষা ভবন ঘেরাও করতে গেলে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। পরে তারা ভাবনে সমানের সড়ক অবরোধ করে ব্লকেড কর্মসূচি পালন করেন। এতে হাই কোর্টের মাজার রোড, সচিবালয়ের সমানের সড়কসহ আশপাশের এলাকার যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তারা বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি খসড়া আইন প্রকাশ করলেও এখানে চূড়ান্ত অধ্যাদেশের কেন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে কাজটি এত সহজ নয় যে, মুখে বলে দিলাম কিংবা এক পৃষ্ঠা লিখে দিলাম আর সব হয়ে গেল। এ পরিস্থিতিতে এ কাজ করতে কে রাজি হবেন? এ সরকারের কি এই কাজ? মন্ত্রণালয়ে যারা কাজ করেন তারা তো অস্থায়ী, তাদের মধ্যে কেউ আজ এই মন্ত্রণালয়ে আছেন আগামীকাল যাবেন স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়ে, কেউ যাবেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে, তারা তো নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। শিক্ষা উপদেষ্টা তো নির্বাচিত কেউ নন যে, তাকে এ জাতীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলে পরবর্তী সরকার তাকে দায়ী করবে।
ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ এবং সরকরি তিতুমির কলেজকে নিয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি গঠনের কার্যক্রম চলছে। কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে কলেজগুলোর শিক্ষকরা ও শিক্ষার্থীদের কয়েকটি অংশ মুখোমুখী অবস্থান নিয়েছেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটর অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। খসড়ায় সাতটি কলেজকে চারটি স্কুলে বিভক্ত করে ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি’ বা ‘স্কুলিং’ কাঠামোয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী কলেজগুলোতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠদানও চালু থাকবে। এদিকে কলেজগুলোতে কর্মরত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা পদোন্নতির মতো মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে ‘অধিভুক্তিমূলক কাঠামোতে’ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন। সাত কলেজের শিক্ষার পরিবেশ, অবকাঠামো, প্রশাসনিক পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আশঙ্কার কথা তুলে ধরছেন শিক্ষকরা। তারা বলেন, এ সাতটি কলেজ কেবল প্রতিষ্ঠান নয়, এটি রাজধানীর দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত ঐতিহ্যের অংশ। হঠাৎ করে নাম ও কাঠামো পরিবর্তন করলে সেই ঐতিহ্য ক্ষুণ্ন হবে এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষার নীতির পরিপন্থি হবে। তাই যুক্তিসংগত গবেষণা, সমীক্ষা, আলোচনাসাপেক্ষে দীর্ঘমেয়াদি ও শিক্ষার্থীবান্ধব সমাধান দিতে হবে। শিক্ষকদের বলছি, শিক্ষার্থীরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি থেকে বের হওয়ার জন্য আন্দোলন করছিলেন আর আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি জানিয়ে পুরো রাস্তাঘাট বন্ধ করে, রেলপথ অবরোধ করে মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছিলেন তখন আপনারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের কেন বোঝাতে পারেননি যে, কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা যাবে না, তারা যা যাচ্ছে যদি তাই করা হয়?
কলেজগুলোর বর্তমান শিক্ষার্থীদের একাংশ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির আইনি কাঠামো দ্রুত নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে দ্রুততম সময়ে অধ্যাদেশ জারির দাবি জানিয়েছেন। অপরদিকে উচ্চমাধ্যমিক ও অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের একাংশ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের মতোই প্রস্তাবিত কাঠামোর বিরোধিতা করে বলছেন, ‘স্কুলিং’ কাঠামোয় কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকবে না। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটা সময়সাপেক্ষ। মন্ত্রণালয় তো ঠিকই বলেছে, এটা তো হুট করে করা সম্ভব নয়, আর শিক্ষার্থীরা রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিলেই তাদের ন্যায্য আর অন্যায় সব কথা শুনতে হবে বিষয়টি তো তাও নয়। অথচ স্কুলিং মডেল বাতিলের দাবিতে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন পাঁচটি কলেজের শিক্ষার্থীরা। মন্ত্রণালয় বা সরকার কাদের কথা শুনবে?
শিক্ষার্থীরা বলছেন, সাত কলেজের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে সেশনজট, পরীক্ষার বিলম্ব, ফল প্রকাশে ধীরগতি ও প্রশাসনিক জটিলতায় শিক্ষার্থীরা ভয়াবহ ভোগান্তিতে পড়েছেন। তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি বাতিলের পর আমরা পরিচয় সংকটে আছি। আর ২৪-২৫ এর ক্লাস এখনো শুরু হয়নি। এটা তো শিক্ষার্থীদের নিজেদেরই সৃষ্টি! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের অধিভুক্তি বাতিলের জন্য তারা রাজপথ বন্ধ রাখা থেকে শুরু করে রেলপথ পর্যন্ত বন্ধ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট কেন তাদের পছন্দ হলো না, কে বা কারা তাদের উসকে দিল আন্দোলন করতে, তা আমাদের বুঝতে কষ্ট হয়। অধিভুক্তির ফলে কিছু সমস্যা তো হবেই, সেগুলো কাটিয়ে ওঠার বহু পথ ছিল। অতিরিক্ত শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা অবসরে যাওয়া শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের দিয়ে কাজ করানো যেত, যা এই সাত কলেজের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বলতে পারতেন। তা না করে বিশ্ববিদ্যালয় চেয়েছেন। সরকার দাবি মেনে নিয়ে কাজ করছে। সময় তো লাগবেই। এত দ্রুত তো কোনো সমাধান সম্ভব নয়। এখানে জাদু দিলেই তো বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যাবে না। ওইদিকে শিক্ষকরা চাচ্ছেন না এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর হোক, আবার উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা চাচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয় হোক, তাহলে তাদের ঐতিহ্য থাকবে না, ইত্যাদি নানামুখী সমস্যায় মন্ত্রণালয় এখন কী করবে? এ সমস্যা যে হবে, তা আমি বেশ কয়েকটি লেখায় প্রকাশ করেছিলাম যে, সমস্যা আরও প্রকট হবে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণার মাধ্যমে। এখন ২৪-২৫ এর ক্লাস কে শুরু করবে? ইউজিসি তো এখনো হাতে নিতে পরেনি, সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তো নেই, অবার এগুলো ঠিক আগের মতো কলেজও না, ঢাবির অধিভুক্তিও নেই। সিদ্ধান্ত কে দেবে?
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকাকালীন কলেজগুলোর শিক্ষার মান নিয়ে সর্বদাই কথা হতো, বাস্তবে সবাই তার প্রমাণ পেত কিন্তু শিক্ষার্থীদের সেই মান বাড়ানোর জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কোনো কথা বলেননি, শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য কোনো আন্দোলনে নামেননি বরং সব মেনে নিয়ে নিয়েছিলেন।
এখানে আবেগের কিংবা সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিয়ে আর সরকারকে চাপ দিয়ে কিছু করতে যাওয়ার অর্থ দেশের মানুষ কিন্তু ভালোভাবে বোঝে। অতএব, আমাদের সহনশীল ও যৌক্তিক আচরণ প্রদর্শন করতে হবে।
লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং
প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন
অব বাংলাদেশ (ইট্যাব)
[email protected]


.jpg)