কবিতার ভাষাতেই বলি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে যখন জনসমুদ্রে জোয়ার জেগেছে, তখনই দীপ্ত বিজয়ী এসে পৌঁছুলেন জনসভায়। সরাসরি ঢাকা বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচলের গণসংবর্ধনায়। রাজনীতির যুবরাজ তারেক রহমান মঞ্চে দাঁড়িয়ে শুরু করলেন কথা বলা। শুরুতেই ‘প্রিয় বাংলাদেশ’ বলে সম্বোধন করলেন মাতৃভূমিকে। মাতৃভূমি যেন তার কাছে কোনো মৃন্ময়ী সত্তা নয়, চিন্ময় বোধে ধরা দিল। দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো দেশবন্দনা দিয়ে শুরু করলেন কথা বলা। এরপরই ‘প্রিয় মুরব্বিবর্গ’ বলে সম্বোধন করলেন উপস্থিত বয়স্ক মানুষদের। চিরায়ত বাংলার এই সমাজে মুরব্বিরা সব সময়ই সর্বাগ্রে সমাদৃত। গত দেড় বছরের নানা সময়ে তাদের প্রতি এই আচরণে ছেদ পড়েছে। শিক্ষক থেকে গুরুজনদের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন এই দেশে। তারেক রহমান স্মরণ করলেন, দেশের লক্ষ-কোটি মানুষকে। দেশের মানুষের কাছে ফিরে আসতে পেরে তিনি আপ্লুত।
জাতির ইতিহাসই হচ্ছে তার শিকড়, তার অস্তিত্ব। বক্তৃতার শুরুতে সেই ইতিহাসের কথা স্মরণ করলেন তারেক রহমান। বাংলাদেশকে প্রিয় মাতৃভূমি বলে সম্বোধনের পর উল্লেখ করলেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, শহিদদের রক্তদানের কথা। ধারাবাহিকভাবে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের কথাও বলেছেন তারেক রহমান। সবশেষে বললেন চব্বিশের আন্দোলনের কথা। এই আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষের যে অংশগ্রহণ ছিল, সে কথা স্মরণ করলেন তিনি। বিস্মরণ নয়, দূর ও কাছের ইতিহাসকে তিনি ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছেন। এর মধ্য দিয়ে বোঝা গেছে, তার ইতিহাসবোধ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে তিনি বাংলাদেশের অস্তিত্ব বলে মনে করেন। প্রায় ষোলো মিনিটের বক্তৃতায় তারেক রহমান দুবার একাত্তরকে স্মরণ করেছেন। এই ইতিহাস-চেতনাই বাংলাদেশকে তার হৃদয়ে ধারণ করার কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়।
কোনো সংগ্রামই একক মানুষের সংগ্রাম নয়, তিনি সর্বস্তরের মানুষের কথা বলে তাদের সেই সংগ্রামকেও স্বীকৃতি দিলেন। কিন্তু দেশ তো শুধু বিস্তৃত প্রসারিত একখণ্ড ভূমি নয়। দেশের পরিচয় মানুষের অধিকারের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশের অবিস্মরণীয় ইতিহাসকে স্মরণ করার পর তাই তিনি অধিকারের বিষয়টি তুলেছেন। উল্লেখ করেছেন, অধিকারহীন মানুষ তার ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে চায়। এই অধিকার হচ্ছে গণতান্ত্রিক অধিকার। গণতন্ত্রই হচ্ছে মানুষের মুক্তিসনদ। অধিকার বলতে আবার যে অর্থনৈতিক অধিকার বোঝায়, সেকথা বলতেও ভুল করেননি তারেক রহমান। তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে বললেন, অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপরই বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে।
কিন্তু কাদের জন্য এই দেশ, কারা এই দেশের মানুষ? তারেক রহমানের কাছে এই ‘মানুষ’ হচ্ছে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ। তিনি নারী-পুরুষের ওপর গুরুত্বারোপ করে উল্লেখ করলেন নানা বর্গের মানুষের কথা। তরুণ, শিশু এমনকি প্রতিবন্ধী মানুষও বাদ পড়ল না। বললেন পাহাড়ি, সমতলের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ শ্রমিক ও কৃষকের কথা। বাংলাদেশের সব মানুষকে তিনি এক সুতোয় বাঁধলেন।
লক্ষ্য কী? তাও তার চিন্তায় স্পষ্ট। সবাই মিলে দেশকে গড়ে তুলতে হবে। দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে যদি পারস্পরিকভাবে একাত্ম করে তোলা না যায়, তাহলে দেশকে তো গড়ে তোলা যাবে না। বিভক্তি নয়, ঐক্যের কথা বললেন তিনি। এরপরই তার কণ্ঠে উচ্চারিত হলো সেই অমোঘ কথাটি: ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’। যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদবিরোধী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট বর্ণবাদবিরোধী জনসভায় বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’। কথাটি লুথার বলেছিলেন সাত বার। তারেক রহমানও বললেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান, ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি।’ লুথার সাদাদের সঙ্গে কালোদের ঐক্যের কথা বলেছিলেন, যে ঐক্য ১০০ বছরেও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল না। আর তারেক রহমান বললেন বাংলাদেশের মানুষের ঐক্যের কথা। ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিরাপদ দেশ গড়ার কথা। মার্টিন লুথার কিং তার ঐতিহাসিক ভাষণে প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ‘লেট আস ফ্রিডম রিং’- আসুন স্বাধীনতার জয়ধ্বনি হোক; তারেকও অনেকটা সেই সুরে বললেন, মানুষের নিরাপদে থাকার কথা, স্বপ্নের কথা। এই স্বপ্ন দেখে একজন মা- তার সন্তান যেন নিরাপদে জীবন নির্বাহ করতে পারে। কিন্তু সেটা পেতে হলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা চাই। তারেক রহমান সেই আহ্বানই জানালেন। বললেন দেশকে গড়ে তুলতে হলে ‘শান্তি চাই’। একবার নয়, তিনবার ধ্রূবপদের মতো এই কথাটি বলেছেন তিনি।
একজন প্রকৃত জননায়কের মতো ভাষণ দিলেন তারেক রহমান, যার মধ্যে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। কাউকে অভিযুক্ত নয়, কোনো দলকে কটাক্ষ করা নয়, এমনকি তিনি নিজেও যে কটাক্ষের শিকার হয়েছেন বার বার, সেসব নিয়েও কিছু বলেননি। দেশের কল্যাণের কথা, ঐক্যের কথা, ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের স্বপ্নবীজ তিনি বুনে দিলেন কথায় কথায়।
জাতীয় নেতার মতোই ভীষণ পরিপক্ব আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভাষণ ছিল এটি। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ কবি ল্যাংস্টন হিউজের কবিতার একটা পঙ্ক্তি, ‘আসুন, স্বপ্ন দেখি, আমেরিকা আবার আমেরিকা হয়ে উঠুক’। আমরাও তারেক রহমানের সুরে বলতে পারি, ‘আসুন, স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশ আবার বাংলাদেশ হয়ে উঠুক।’
.jpg)


