আমাদের রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মধ্যে অশোভনীয় শত্রুতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে জাতির বিভক্তি। এ বিভক্তির কারণেই কোনো রাজনৈতিক হত্যা কিংবা ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটলে আমাদের মাথায় নতুন ভূরাজনীতির খেলায় বিদেশিদের ষড়যন্ত্রের কথা চলে আসে। এ অবস্থা আর চলতে পারে না। অস্ত্রচর্চা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গণতন্ত্রের শক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে হবে। নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-উত্তর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তা জাতীর ঐক্যবদ্ধ বিবেকের অগ্নিশিক্ষা দিয়ে করতে হবে নিশ্চিত।…
প্রায় দেড় যুগ পরে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশায় জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের মনোনীত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে এবং প্রার্থীরা যথারীতি স্ব স্ব নির্বাচনি এলাকায় দলীয় সাংগঠনিক বৈঠক, কর্মিবৈঠক, বিভিন্ন উপায়ে জনসংযোগ করছেন। দলীয় কর্মসূচি ও প্রার্থীর নিজস্ব জীবন ও কর্মভিত্তিক প্রচারপত্রও ভোটারদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। কোনো কোনো প্রার্থী হাটবাজারে সভাও করছেন, করছেন উঠান বৈঠক। শুরু হয়েছে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের কাজ।
অনেক চড়াই-উতড়াই পেরিয়ে সবকিছু মোটামুটি ভালোভাবেই চলছিল। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে মতামত বিনিময় সভাও শেষ করেছে। দেশি-বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক বিষয়ে ইতিবাচক মতামত পাওয়া গেছে। হঠাৎ জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যার ঘটনায় নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ভাবনা যথার্থভাবেই সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। এহেন জঘন্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনে নিরাপত্তা ভাবনা আরও বেড়েছে ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাকশ্রমিক দিপু হত্যার ঘটনায়। এর মধ্যে আবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। ঘটেছে ‘প্রথম আলো’, ডেইলি স্টার’ মিডিয়া হাউসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৫৩ বছরের আর্কাইভ ধ্বংস হয়েছে, পুড়ে গেছে বিভিন্ন ডকুমেন্টসসহ হাজার হাজার বইপুস্তক। সুরের মূর্ছনা সৃষ্টিকারী বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী নান্দনিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট হয়েছে তছনছ। তার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়িঘর ও রাজনৈতিক দলের অফিসে দেওয়া হয়েছে আগুন। সবকিছু মিলে স্বাভাবিক নাগরিক জীবনযাত্রার দৃশ্যমান ছন্দপতন! পাশাপাশি নিরাপত্তা আশঙ্কাও অত্যন্ত পরিষ্কার।
গত ২২ ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রথম আলো পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় তিন কলামব্যাপী সংবাদ- ‘নিরাপত্তা, অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে আবেদন ১৫ রাজনীতিবিদের,’ একই সংবাদে বলা হয়েছে- ‘বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাদের বাসবভবনে নিরাপত্তা বিধানসহ সার্বক্ষণিক গানম্যান চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদেন করেছেন। রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি ২৫ জনের মতো সরকারি কর্মকর্তাও অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন। ব্যবসায়ীরা তো নিরাপত্তার প্রশ্ন আগেই তুলেছেন। সব নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব- এটা প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত সত্যকথন। কিন্তু বাস্তবতা কী? দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বমোট যে সংখ্যা তাতে কতজন নাগরিককে রাষ্ট্রের পক্ষে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব? আর একটি বিষয় এখানে উল্লেখ না করা নেহায়তই অবিবেচকের কাজ হবে- থানা লুটের অস্ত্রও তো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ওইসব লুট করা অস্ত্র তো রয়ে গেছে সন্ত্রাসীদের হাতে আর ওগুলো তো নির্বাচনকালীন যে অপব্যবহার হবে না তারও তো নেই কোনো গ্যারান্টি।
যাই হোক, আসলে নির্বাচনকালীন প্রার্থীর তো ভোটারকে বুকে জড়িয়ে ধরতে হয়, হাতে হাত মেলাতে হয়। যেতে হয় মানুষের ভিড়ের মধ্যে। যত বেশি ভোটারের কাছে সে যেতে পারবে ভোটার তাকে তত বেশি আপন করে নেবে- এটাই তো ভোটের প্রচারণার সংস্কৃতি। যে প্রার্থী যত বেশি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে থাকে, সে প্রার্থীর কাছে সাধারণ মানুষ আসতে পারে না, পারে না কথা বলতে। এ বিষয়ে এককথায় বলা যায়, যে প্রার্থীর নিরাপত্তা বেষ্টনী যত বেশি সে প্রার্থী নির্বাচনকালে তত বেশি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, এটাই স্বাভাবিক। অধিক রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কারণে প্রার্থীর জনবিচ্ছিন্নতার বিকল্প অবশ্য তেমন আর কিছু দেখি না। আবার দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলার যে অবস্থা তাতে প্রার্থীকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা না দেওয়ার তো কোনো বিকল্প নেই। বিকল্প নেই রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও।
এখানেই প্রশ্ন আসে রাজনৈতিক দল, সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী, সরকারি কর্মকর্তা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ীসহ অন্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব কি একা সরকারের? এভাবে কি কোনো দেশে কোনো সরকার রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সব নাগরিকের দায়িত্ব একা নিশ্চিত করতে পেরেছে? শুধু সরকারের একার পক্ষে এটা সম্ভব নয়। তাহলে কী করতে হবে? সে কথায়ই আসা প্রয়োজন।
প্রথমত, প্রয়োজন সব রাজনৈতিক দলের নেতা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, মিডিয়া হাউসগুলোর মালিক ও সম্পাদক, ব্যবসায়িক প্রতিনিধি, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধি, প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত করা। যে কনভেনশনে আলোচনা করতে হবে আমাদের দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড, মব সৃর্ষ্টি, আগুন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্বসহ সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে মূল কারণ কী কী? এবং তার সম্ভাব্য সমাধানের বাস্তবসম্মত সমাধান কী?
দ্বিতীয়ত, কারণগুলো চিহ্নিত হওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নযোগ্য উপায় বাস্তবায়ন, মধ্যম মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য উপায় চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।
এককথায় বলতে গেলে, দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একীভূতকরণ করা। কারণ, জাতিগতভাবে যদি ঐক্যবদ্ধ না হওয়া যায় তাহলে যেকোনো ঘটনায় একশ্রেণির মানুষকে একশ্রেণি দোষারূপ করবে কিংবা দায়ভার চাপাবে এটাই স্বাভাবিক। পাশাপাশি সব নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব হবে যেসব ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে আছেন তাদের আস্থায় নিয়ে আসা। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার কোনো ঘটনা ঘটলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেই ভুয়া ভুয়া বলে একদল লোক চিৎকার করে। ভাবুন তো, যারা সংঘটিত ঘটনার বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন তাদের ওপর যখন অনাস্থাই শুধু নয় বরং অসম্মান করা হয় তখন সংশ্লিষ্টদের পেশাগত অবস্থান কিংবা তাদের মানসিকতা কী অবস্থায় চলে যায়; এ বিষয়টিও আমাদের ভাবনায় নেওয়া দরকার।
প্রিয় পাঠক, আমরা যদি ভোটের দিনের কথাই বলি- জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। একদিনে একই সময়ে ৩০০ আসনে নির্বাচন। ভোটার, ভোট গ্রহণকারী প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, রিটার্নিং অফিসার, প্রার্থী, প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট, পুলিং এজেন্টসহ উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক নেতা, সংগঠক, কর্মী, সমর্থক দলমত, শ্রেণি-পেশা, ধর্ম, বর্ণ, গোত্রনির্বিশেষে সবার আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশন কিংবা সরকারের পক্ষে শতভাগ অসম্ভব। একান্তভাবেই প্রয়োজন সব জনগণের আন্তরিক সহযোগিতা।
একইভাবে নির্বাচনের আগে প্রচার-প্রচারণাকালে প্রার্থী, রাজনৈতিক দলের নেতা, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান জনগণের আন্তরিক ও বলিষ্ঠ কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া এককভাবে নির্বাচন কমিশন কিংবা সরকারের পক্ষে শতভাগ অসম্ভব।
এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে পরমতসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক আন্তরিক সম্পর্কোন্নয়ন প্রয়োজন। যেমন এ বাংলার ময়দানেই একসময় একদলের নেতা অন্য এক দলের নেতার এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য গেলে, যে নেতার এলাকায় যেতেন তার বাড়িতেই মেহমান হতেন। এটাই তো আসলে সত্যিকার রাজনীতির সৌন্দর্য। একজন রাজনৈতিক নেতা অন্য রাজনৈতিক নেতার খোঁজখবর নিতেন, ভালোমন্দ দেখাশোনা করতেন। সুখে-দুঃখে প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াতেন। সাধারণ জনগণও এসব অবস্থা দেখে রাজনীতিবিদদের সম্মান করতেন, আস্থায় নিতেন এবং দেশ ও জাতির উন্নয়নে তাদের পথের পাথেয় হিসেবে ভাবতেন। আস্থা রাখতেন তাদের চলার পথের প্রতি, বিশ্বাসী হতেন তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি, আর এটাই তো বাস্তবতা। কারণ, রাজনীতির চলার পথ ভিন্ন হতে পারে, আদর্শ ভিন্ন হতে পারে, মতের পার্থক্য ভিন্ন হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। সবার সব কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য তো এক; আর তা হলো দেশ ও জাতির কল্যাণ। তাই তো বলি, লক্ষ্য যদি এক ও অভিন্ন হয় তাহলে তো রাজনৈতিক হত্যা শব্দটি রাজনৈতিক অভিধান থেকে উঠে যাওয়া উচিত। বিপরীতে অতীতে যেমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল হিমালয়সম আদর্শের প্রতীক; আজও জাতির প্রত্যাশা প্রতিটি রাজনৈতিক নেতা তেমনই হোক। তাহলে দূর হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিরাপত্তা ভাবনা।
এখানে প্রকৃত গণতন্ত্রচর্চার কথাও স্বাভাবিকভাবেই এসে যায়। সত্যিকার গণতন্ত্রচর্চার যত তত্ত্ব কথা চালু আছে তার মধ্যে সর্বজন বিবেচিত বক্তব্য হচ্ছে এরকম যে, বিরোধী মতামত, বলার স্বাধীনতা, পরিবেশ নিশ্চিত করবেন যার বিপক্ষে বলা হবে তিনিই। আর এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। উল্লিখিত মতামত উপেক্ষা করে নীতি, আদর্শ, দলীয় কর্মসূচির কথা না বলে মঞ্চে উঠেই যদি বিপক্ষকে দেশ ছাড়া কিংবা অশোভনীয় ভাষায় গালাগাল করা হয় তাহলে গানম্যান, লাইসেন্সধারী অস্ত্র, ব্যক্তিগত সিকিউরিটি কোনো কিছুই নির্বাচনকালীন বা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা বিধান করতে পারবে না বরং ব্যর্থ হবে উল্লেখযোগ্যভাবে। যার নজির আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। গত ২২ ডিসেম্বর নির্বাচনি প্রচারণাকালে খুলনায় এনসিপির সংগঠক মোতালেবের মাথায় গুলিই যার প্রমাণ। কয়েকদিন আগে নোয়াখালীতে এক অবুঝ শিশুর পুড়ে মরার করুন চিত্র। তার মায়াবী অবয়ব আজও আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়।
পরিশেষে, একথা বলা খুব একটা অতিরঞ্জিত হবে না যে, আমাদের রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মধ্যে অশোভনীয় শত্রুতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে জাতির বিভক্তি। এ বিভক্তির কারণেই কোনো রাজনৈতিক হত্যা কিংবা ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটলে আমাদের মাথায় নতুন ভূরাজনীতির খেলায় বিদেশিদের ষড়যন্ত্রের কথা চলে আসে। আসাও স্বাভাবিক।
তাই প্রবন্ধের উপসংহারে বলব এ কথা- সাধু সাবধান! এ অবস্থা আর চলতে পারে না। অস্ত্রচর্চা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গণতন্ত্রের শক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে হবে। নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-উত্তর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তা জাতীর ঐক্যবদ্ধ বিবেকের অগ্নিশিক্ষা দিয়ে করতে হবে নিশ্চিত। সবাই সে ভালো দিনের প্রত্যাশায় থাকি।
লেখক: উপ-উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত), প্রাইম ইউনিভার্সিটি, অর্থনীতিবিদ ও কলামিস্ট
.jpg)
.jpg)
