ঢাকা ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ফিলিপাইনে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা জারি টেকনাফে বজ্রপাতে সাগরপারের দোকান ক্ষতিগ্রস্ত স্পেসএক্সের শেয়ার যেভাবে কিনবেন, ঝুঁকি কী গাইবান্ধায় প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত ছোট ভাই, আশঙ্কাজনক বড় ভাই ময়মনসিংহে ডিসি অফিসে বিএনপির বর্তমান ও বহিষ্কৃত নেতার হাতাহাতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাত ও পায়ের গঠন কেমন ছিল? ঈশ্বরদীতে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ নিহত ২ চুরি, সিস্টেম লস ও ভর্তুকিতে ঘুরপাক পঞ্চগড়ে ব্যর্থ হয়ে চার দিন পর ১০ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ রামিসা হত্যা মামলার রায় যেভাবে কার্যকর হবে রৌমারী সীমান্তে বিএসএফের পুশইনের চেষ্টা মুক্তাগাছায় পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু পটুয়াখালীতে জলোচ্ছ্বাস ঠেকানো সবুজ দেয়াল বিলীন! আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর চলচ্চিত্র 'সাঁকোটা দুলছে' বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে সরকারের ব্যাপক প্রস্তুতি রাঙামাটিতে আওয়ামী লীগ -যুবলীগ নেতাসহ গ্রেপ্তার ২১ পুশইন ব্যর্থ, দুদিন পর হরিপুর সীমান্ত থেকে ১১ জনকে ভারতের অভ্যন্তরে নিল বিএসএফ বিশ্ব সমুদ্র দিবস আজ ই-ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়াল এনবিআর ময়মনসিংহে ধসে পড়া বেইলি ব্রিজটি ১০ বছর ধরে ছিল ঝুঁকিপূর্ণ সাদুল্লাপুরে কাভার্ডভ্যানে ট্রাকের ধাক্কা, নিহত ১ লেবানন থেকে ড্রোন হামলায় ফিরল দুই রেমিট্যান্স যোদ্ধার মরদেহ মতিঝিলে ব্যাংকের সামনে দিনদুপুরে ব্যবসায়ীকে গুলি করে দুর্ধর্ষ ছিনতাই বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার পথে ইলন মাস্ক কালজানি ও দুধকুমারের কালো রূপ: বর্ষার আগেই নদীগর্ভে শতাধিক বাড়ি চাকরি না পেয়ে ইউটিউব দেখে আম চাষ, লক্ষাধিক টাকা আয় মিত্রদের ক্ষয়ক্ষতি পূরণে ইরানের সম্পদ ব্যবহারের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত সন্তানের বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা কেন বৃদ্ধাশ্রম? সৌরবিদ্যুৎ খাতে বাড়তি কর চাপানো ঠিক হবে না
Nagad desktop

নিষিদ্ধ নয়, তবু নিষেধ থাকে

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:২৯ পিএম
আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৩৪ পিএম
নিষিদ্ধ নয়, তবু নিষেধ থাকে
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সাহিত্যের কথা বলি বা রাজনীতির- কৃষকের উপস্থিতি কোথাও নিষিদ্ধ নয়, তবু অলিখিত একটি নিষেধ থাকে। নিষেধটা শ্রেণির। কৃষককে সাহিত্য সৃষ্টিকারী বা রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে ভাবা হয় না; ফলে সাহিত্য ও রাজনীতি- উভয় ক্ষেত্রেই কর্তৃত্ব থাকে অকৃষক শ্রেণির হাতে। তারা কৃষকের দুঃখে সহানুভূতি দেখায়, তার পক্ষে কথা বলে, কিন্তু সত্যিকারের স্থান সৃষ্টি করতে পারে না। এই নিষেধ আসে বিচ্ছিন্নতা ও দূরত্ব থেকে; স্বার্থের পাহারাদারি দিয়ে দুর্লঙ্ঘ্য হয়ে দাঁড়ায়। কৃষক ও অকৃষকের স্বার্থ প্রায়শই পরস্পরবিরোধী।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে কৃষকের দুঃখের সংক্ষিপ্ত কিন্তু মর্মস্পর্শী বিবরণ আছে বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায়। কৃষক তার উপন্যাসে নায়ক হবে এটা সম্ভব ছিল না। নায়ক জমিদাররাই এবং জমিদারদের জীবনযাপনে কৃষক প্রান্তবর্তী বটে, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসেও সেটি সত্য। কিন্তু প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গদেশের কৃষকদের দুর্দশায় অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত। সেই দুর্দশার খরালোকে তার প্রবন্ধে জমিদারদের বিলাসবাহুল্য নিতান্ত কুৎসিত ঠেকে। শ্রেণিবিভাজনের বিষয়টা বঙ্কিমচন্দ্র অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে জানতেন। জমিদার যে কৃষকের শত্রু প্রবন্ধে তিনি তা অত্যন্ত পরিষ্কার করে বলেছেন। জমিদারি ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করেছে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং সে ব্যবস্থাই বঙ্গদেশের কৃষকের সর্বনাশের জন্য দায়ী। এ সত্য অত্যন্ত পরিচ্ছন্নরূপে তার লেখাতে উপস্থিত। এই সূর্যের চারপাশেই অন্যসব গ্রহ-উপগ্রহের ঘূর্ণিবাজি জানিয়েছেন তিনি। তবু ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ প্রবন্ধের উপসংহারে এসে তিনি লিখেছেন, ‘যে ভ্রম ঘটিয়াছিল এক্ষণে তাহার সংশোধন সম্ভব না। সেই ভ্রান্তির ওপর আধুনিক বঙ্গসমাজ নির্মিত হইয়াছে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ধ্বংসে বঙ্গসমাজে ঘোরতর বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা। আমরা সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নহি।’ 

প্রথমে ঘটবে বিশৃঙ্খলা পরে দেখা দিবে বিপ্লব, এই রকমের আশঙ্কা। অসামান্য বঙ্কিমচন্দ্রও তার শ্রেণির মানুষই রয়ে গেছেন, শেষপর্যন্ত; সীমান্ত লঙ্ঘনের বৈপ্লবিক ঘটনাটি ঘটেনি। বরং তিনি সংকুচিত হয়ে গেছেন। বিপ্লবকে পাছে সহায়তা করা হয় তাই ‘সাম্য’ নামের জনপ্রিয় বইটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, মীর মোশাররফ হোসেনের নাটক ‘জমীদার দর্পণ’-এর প্রশংসা করে বইটিকে প্রচার না করতে লেখককে সৎপরামর্শ দিয়েছেন। শঙ্কা ওই একই, পাছে অশান্ত কৃষক উসকানি পেয়ে যায়। জমিদারি ব্যবস্থার অপসারণের ‘কুপরামর্শ’ তিনি ইংরেজদের দিতে পারেননি। কারণ, তার মতে, ওই কাজ করলে ইংরেজরা ‘মিথ্যাবাদী’ প্রমাণিত হবে এবং ‘প্রজাবর্গের অবিশ্বাসভাজন’ হয়ে পড়বে। বলেছেন, ‘যেদিন ইংরেজের অমঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হইব, সমাজের অমঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হইব, সেদিন সে পরামর্শ দিব।’ ইংরেজের মঙ্গল ও উঠতি মধ্যবিত্ত বাঙালির উন্নতি যে একসূত্রে গাথা এমন স্পষ্ট সত্য বঙ্কিমচন্দ্রের মতো সত্য উন্মোচনকারী লেখকের পক্ষে চেপে রাখাটা অসম্ভব ছিল বৈকি।

বঙ্কিমচন্দ্রের অল্প কিছু আগের মানুষ মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। মধুসূদনের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’তে জমিদার ভক্তপ্রসাদ বাবুর অত্যাচারের বিরুদ্ধে দরিদ্র প্রজা হানিফ গাজি ও পঞ্চানন বাহস্পতি ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়েছে। জমিদার তাতে জব্দ হয়। কিন্তু সত্য তো এটাও যে, তার নিজের রচিত এই প্রহসনটি সম্পর্কে মধুসূদন উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন না, তার সময়ে এটির যে মঞ্চায়ন হয়েছে এমনও নয়, সর্বোপরি এর স্বাভাবিক গ্রাম্য ভাষাকে তিনি যথার্থ সাহিত্যের জন্য উপযুক্ত বলে যে মনে করতেন তাও নয়। মধুসূদন তার অপর প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’তে তার সমসাময়িক অত্যন্ত আধুনিক বলে পরিচিত ইয়ং বেঙ্গলদের বিদ্রোহের সামান্যতাকে বিদ্রুপ করেছেন। ইয়ং বেঙ্গলরা নিজেদের জন্য স্বাধীনতা চাইত, কিন্তু তারা বঙ্গদেশের কৃষকদের নিয়ে ভাবত বলে জানা যায় না। অন্যদিকে মানুষ হিসেবে সবাইকে ছাপিয়ে উঠেছিলেন যে অসামান্য বিদ্যাসাগর তার জগতে কৃষকের ঠাঁই হয়নি। তারা যে সাঁতরে উঠবে এমনটা পারেনি। না তার বিদ্যার জগতে, না তার করুণায়। 

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে কৃষক আছে, কৃষকের জীবনও আছে। কিন্তু তুলনায় জমিদারের সংখ্যা অনেক বেশি এবং চূড়ান্ত বিচারে তার নিজের টানটা জমিদারদের দিকেই। স্মরণীয় যে তিনি যতই সংবেদনশীল হোন, ছিলেন সামাজিক বিপ্লবের বিরোধী। কথাসাহিত্যকে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবল প্রতাপান্বিত জমিদারবাড়ি থেকে বের করে মধ্যবিত্তের ও নিম্নমধ্যবিত্তের জীবনে নিয়ে এসেছিলেন এবং তার লেখায় রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্পৃহা অত্যন্ত প্রবলভাবে উপস্থিত। কিন্তু তাই বলে দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে এত দূর পর্যন্ত এগোতে প্রস্তুত ছিলেন না। তার ভেতরে রক্ষণশীলতা ছিল। 

বাংলার গ্রামের ছবি জীবন্ত হয়ে আছে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যে। স্বভাবতই সেখানে কৃষক আছে। তাদের সংকট, শ্রম, সংগ্রাম সবই পাওয়া যাবে। কিন্তু অভাব বিপ্লবী চেতনার। তারাশঙ্কর রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন; সে রাজনীতি ভারতীয় কংগ্রেসের, যার কাজ বিপ্লবের সম্ভাবনাকে উৎসাহ দান করা নয়, বিপ্লবের বিরোধিতা করা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনায় একধরনের বিষণ্নতা পাওয়া যায়। ওই বিষণ্নতা গ্রামবাংলার বৈশিষ্ট্য বৈকি। বাংলার গ্রামে প্রাণ যেমন পাওয়া যায় বর্ষার ও গ্রীষ্মের এবং বসন্তেরও, তেমনি বিষণ্নতা থাকে শরতে, হেমন্তে ও শীতে। বিভূতিভূষণের গ্রাম আসলে নিম্নমধ্যবিত্তেরই, সে গ্রামে দারিদ্র্য বড় হয়ে ওঠে, কৃষকের সংগ্রামকে ছাপিয়ে। বলা যায় তার গ্রাম কৃষকশূন্যই বটে। 

রূপসি বাংলার গ্রামীণ জীবনের যে প্রাণস্পর্শী ছবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় পাওয়া যাবে তেমনটা বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ। এ গ্রামও বিষণ্ন। এখানে ফসলের খেত, প্রবহমান নদী, পাখি, আকাশ, ঋতুর যাওয়া-আসা, গাছপালা সবকিছু প্রাণের সম্পদে সমৃদ্ধ; মানুষের আবেগ আছে। সেখানে দেখার ও অনুভব করার মানুষ আছে বলেই এই বাংলা এত মধুর। সবকিছুই মানুষের জন্য। তবে এই মানুষ শিক্ষিত, রুচিবান, ইতিহাসে প্রোথিত আন্তর্জাতিকতার বোধে ঋদ্ধ বাঙালি মধ্যবিত্ত। এই মানুষটি মানুষের ভিড় পছন্দ করে না। সে সমসাময়িক এবং সমসাময়িকতাকে অতিক্রমকারী আধুনিক। কৃষকের পক্ষে আধুনিক হওয়াটা অসম্ভব।

জসিমউদ্‌দীনও খাঁটি বাংলার কবি। তার জগতে গ্রাম আছে, গ্রামেই তার প্রধান আগ্রহ, তাকে পল্লীকবিও বলা হয়ে থাকে। পল্লীর মানুষের মুখপাত্র তিনি। তাদের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও দুঃখকে তার চেয়ে ভালোভাবে কে বুঝেছেন? আবার কিন্তু সত্য এটাই যে, তিনি সমাজ পরিবর্তনের জন্য লেখেননি, যদিও সমাজ-পরিবর্তনটা যে অত্যাবশ্যকীয় এই সংবাদ তার কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতেই রয়েছে।

পরিবর্তনের ব্যাপারে সরাসরি লিখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। অমন করে আর কেউ লেখেননি বাংলা ভাষায়। সুকান্ত ভট্টাচার্যও লিখেছেন। সুকান্ত আরও লিখতেন, কিন্তু অসুস্থ সমাজ তাকে সুস্থ থাকতে দেয়নি; অত্যন্ত অল্পবয়সে তিনি চলে গেছেন। নজরুলের লেখক-জীবনও সংক্ষিপ্ত, সব মিলিয়ে ২২ বছরের হবে। কিন্তু ওই জীবনের পরিপূর্ণ ব্যবহার তিনি করে গেছেন। মেহনতি মানুষের কথা লিখেছেন। সেখানে শ্রমিক আছে, কৃষকও আছে। রেলস্টেশনে লাঞ্ছিত এক কুলির অপমানে তিনি জগৎজুড়ে মেহনতি মানুষের ক্রন্দনধ্বনি শুনতে পেয়েছেন। কিন্তু তিনি ক্রন্দনের কবি নন, কবি সমাজবিপ্লবের; সেজন্য কেবল যে মেহনতিদের পক্ষে লিখেছেন তা নয়, সমাজবদলের রাজনীতিতেও যোগ দিয়েছেন। 

নজরুলের উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’র নায়ক আনসারের বয়স বেশি নয়। এবং অল্পবয়সেই সে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, শুরু করেছিল কংগ্রেস-খেলাফত দিয়ে, কিন্তু অচিরেই বুঝে ফেলে যে ওই পথে জনগণের মুক্তি আসবে না, যে জন্য শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে সে নতুন রাজনীতির পথ ধরেছেন। এক কথায় বলতে গেলে সে কমিউনিস্ট হয়েছে। আনসার অবশ্য অচিরেই গ্রেপ্তার হয়েছে, চলে গেছে জেলে, এবং যক্ষ্মা ব্যাধির কারণে সেখানেই মারা গেছে। বেঁচে থাকলে আনসার দেখতে পেত যে তার আশপাশে যে শ্রমিকরা রয়েছে, তারা সংখ্যায় অত্যন্ত অল্প এবং দেশের জনসংখ্যার অধিকাংশই হচ্ছে কৃষক। এটা দেখে তাকে কৃষকের কাছে যেতে হতো। নজরুল নিজে এটা বুঝে নিয়েছিলেন। কৃষকের দুঃখ নিয়ে তিনি লিখেছেন। দুটি পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করাই হয়তো যথেষ্ট হবে। নজরুল প্রশ্ন করেছেন, ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা, ক্ষুধায় আসে নি নিদ/আধমরা সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?’ ঈদের ওপর বহু লেখা পাওয়া যাবে। ঈদে আনন্দের কথা জানা গেছে, কৃষকের দুঃখের কথাও বলা হয়েছে, কিন্তু ওই একটি সরল প্রশ্নে নজরুল যেভাবে কৃষকের জীবনকে তুলে এনেছেন তেমনটা অন্যত্র পাওয়া যাবে না। প্রশ্নটির ভেতর ধিক্কার আছে, রয়েছে- যে ব্যবস্থা কৃষককে আধমরা করে রেখেছে সেই অন্যায় ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলার আহ্বানও। এমন আহ্বান যদি শত-সহস্র কণ্ঠে সুসংগঠিতভাবে উঠত এবং তদানুযায়ী কাজ হতো সমাজবিপ্লব তাহলে অনিবার্য ছিল। 

কৃষকের নিকট প্রতিবেশী হচ্ছে জেলে। জেলেরাও চাষ করে। ক্ষেত্রে নয়, জলাশয়ে ও নদীতে। পদ্মা নদীর চাষিদের কথা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন তার ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে। অমন করে আর কেউ বলেননি। মেহনতি মানুষের মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে মানিক বুঝে নিয়েছেন যে বিপ্লব ছাড়া কুলাবে না; সে জন্য নজরুলের আনসারের মতো তিনিও কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তবে ভারতবর্ষে ওই আন্দোলনের পতাকাবাহী যে সংগঠন তার কর্মীরা অসাধারণ আত্মত্যাগের পরও দেশের মানুষকে মুক্ত করতে পারছেন না দেখে তিনি হতাশ হয়েছেন, তার মনে হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি জনগণের পার্টি হওয়ার যে অঙ্গীকার নিয়েছিল তা রক্ষা করতে পারেনি। ওদিকে নজরুল যে শেষ পর্যন্ত নির্বাক হয়ে গেলেন তার পেছনে একটা কারণ নিশ্চয়ই ছিল মুক্তি আন্দোলনের যে স্রোতের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন এবং যেটি গড়ে তোলার কাজে নিজেকে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন সেটির গতিবেগ স্তিমিত হয়ে যাওয়া। ‘ধূমকেতু’র পরে নজরুল যে পত্রিকাটি প্রকাশ করেন তার নাম দিয়েছিলেন ‘লাঙল’ এবং পত্রিকার অফিসের সামনে আস্ত একটি লাঙল টাঙিয়ে দিয়েছিলেন। বিপ্লবের শক্তি কোথায় নিহিত রয়েছে সে বিষয়ে তার ধারণা ছিল পরিষ্কার। 

রবীন্দ্রনাথ সব সময়েই তাৎপর্যপূর্ণ, কোনো এক প্রশ্নে নয়, বহু প্রশ্নে এবং কৃষক-প্রশ্নেও। তার সাহিত্যে কৃষক আছে, তবে প্রধান স্থান দখল করেছে এমন নয়। সেটা সম্ভব ছিল না। শ্রেণির পাহারা রবীন্দ্রনাথকেও নিবৃত্ত করেছে, যেমন করেছে রবীন্দ্রনাথের একজন নির্ভরযোগ্য মুখপাত্র গোরাকে। গোরা শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতীয়তাবাদের সীমা লঙ্ঘন করে সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদে গিয়ে পৌঁছায়, কিন্তু তার জগতে কৃষক নেই, নেই মুসলমানও। সে গেছে; গ্রামে গেছে, গিয়ে কৃষক ও মুসলমানের জীবন দেখেছে; কিন্তু সেখানে যে রয়ে যাবে সেটা তো তার পক্ষে কোনোমতেই সম্ভব নয়, গ্রামবাসী ওই মানুষদের জীবনের সঙ্গে যে গোরার জীবনের একটা স্থায়ী যোগাযোগ ঘটবে তাও অকল্পনীয়। বাস্তবতা এটাই। 

শ্রেণির প্রাচীর রবীন্দ্রনাথকে পীড়া দিয়েছে। জমিদারত্ব তার কাছে অন্যায় ও অসহ্য মনে হয়েছে। জমি তারই হওয়া চাই জমিকে যে ভালোবাসে, জমিতে যে ফসল ফলায়। নিজের জমিদারি তিনি ত্যাগ করবেন বলেও ভেবেছেন; কিন্তু মুশকিলটা দেখেছেন এইখানে যে, জমি ছেড়ে দিলেই জমিদারি প্রথা উঠে যাবে তা নয়। বরঞ্চ বড় জমিদারের জায়গায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিদার গজিয়ে উঠবে এবং কৃষক সেখানেই রয়ে যাবে যেখানে সে ছিল। সমস্যার সমাধান অবশ্যই ছিল; যে সমাধান তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়ে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে এসেছিলেন; কিন্তু সেরকম বিপ্লবের পক্ষে দাঁড়ানো তো রবীন্দ্রনাথের পক্ষে সম্ভব ছিল না। 

যারা চাষ করে, হাল ধরে এবং উচ্ছেদ হয়ে যায় ভূমি থেকে, তাদের দুঃখ রবীন্দ্রনাথ জানেন, সে নিয়ে ভাবেন, কিন্তু তাদের সঙ্গে এক হয়ে যে যাবেন এমনটা তার পক্ষে সম্ভব নয়। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে অসামান্য একটি কবিতা ‘ঐকতান’ লিখেছেন- ‘সে কবিতার বেশ কিছু পঙ্‌ক্তি আমাদের সবারই পরিচিত। বিশেষ করে সে কয়টি যেখানে তিনি বলছেন, কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন,/কার্যে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন/ যে আছে মাটির কাছাকাছি/ সে-কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি’।

১৯১০ সালের গোরা এই আত্মীয়তার কথা ভাবেনি, ৩০ বছর পরে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং যার কথা কেবল ভাবলেন না, নিজের জীবনে সেটা স্থাপন করতে পারেননি বলে আক্ষেপ করলেন। নজরুল যে তার এই প্রতীক্ষার কিছুটা হলেও মিটিয়েছিলেন এটা বলা হয়ে থাকে এবং বলাটা মোটেই অতিশয়োক্তি নয়। 

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মেধার কঙ্কাল ও মায়াহীন সভ্যতা নূরজাহান ট্র্যাজেডির সমাজতাত্ত্বিক পাঠ

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
নূরজাহান ট্র্যাজেডির সমাজতাত্ত্বিক পাঠ
ড. দিপু সিদ্দিকী

সন্তানদের শুধু আমলা বা প্রকৌশলী বানানোর অন্ধ ইঁদুরদৌড় বন্ধ করে, সবার আগে তাদের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার যৌথ প্রতিজ্ঞা আমাদের রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবারকে নিতেই হবে।...

মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নূরজাহান বেগমের পচাগলা লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি স্রেফ কোনো প্রাত্যহিক ক্রাইম রিপোর্টের খতিয়ান নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং সর্বোপরি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক দেউলিয়াত্ব ও পচনের এক জীবন্ত ময়নাতদন্ত। ১ জুন রাতে ৯৯৯-এ আসা একটি ফোন কলের সূত্র ধরে পুলিশ যখন মিরপুর-৬ নম্বরের সি-ব্লকের সেই অন্ধকার কক্ষটিতে প্রবেশ করে, তখন সেখানে সভ্যতার এক বীভৎস কঙ্কাল পড়ে ছিল। দীর্ঘদিন অবহেলা, অনাহার আর চরম অমানবিক পরিবেশে পড়ে থাকার কারণে শরীরটিতে পচন ধরেছিল।

এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে নির্মম এবং কুৎসিত অধ্যায়টি উন্মোচিত হয় যখন মৃতার সন্তানদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় সামনে আসে। নূরজাহান বেগম কোনো গৃহহীন বা অনাথ বৃদ্ধা ছিলেন না। তিনি সেই ফ্ল্যাটটিতে নিজের মেয়ের সঙ্গেই থাকতেন, যিনি পেশায় একজন স্কুলশিক্ষিকা। তার অন্য সন্তানদের মধ্যে একজন সরকারের যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক এবং অপরজন কানাডাপ্রবাসী। সমাজের সর্বোচ্চ স্তরের সফল, প্রতিষ্ঠিত এবং উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের জন্মদাত্রীর এই পরিণতি একবিংশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজকে এক চরম আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

সামাজমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া ও দ্বিমুখী দ্বন্দ্ব
এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তুলেছে। কিন্তু এই ভার্চুয়াল প্রতিক্রিয়ার গভীরতা কতটুকু? এটি কি সাময়িক হুজুগ, নাকি সমাজ পরিবর্তনের কোনো আন্তরিক তাগিদ–তা নিয়ে আজ নির্মোহ বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, নূরজাহানের এই চলে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন পারিবারিক দুর্ঘটনা নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সংকটের খণ্ডচিত্র মাত্র। যখন কোনো বাবা বা মা নিঃসঙ্গ অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, তখন সমাজ খুব দ্রুত সন্তানদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। চারদিকে রব ওঠে–‘সন্তানরা অকৃতজ্ঞ এবং অমানুষ ছিল।’ কিন্তু আমরা কখনো নিজেকে প্রশ্ন করি না–যে সন্তানকে আজ অকৃতজ্ঞ বলছি, তাকে কৃতজ্ঞতা শেখানো হয়েছিল কবে? যে সন্তানকে আজ হৃদয়হীন বলছি, তার হৃদয়টা ভেঙেছিল কে?

একটা শিশু পৃথিবীতে আসে মায়া নিয়ে। তার পর ধীরে ধীরে আমরা তাকে বদলে দিতে শুরু করি। আমরা বলি–ওকে হারাতে হবে, ওর চেয়ে বেশি নম্বর পেতে হবে, ওর চেয়ে বড় হতে হবে। আমরা তার হাতে বই দিই, কিন্তু মানবতা দিই না। আমরা তাকে অঙ্ক শেখাই, কিন্তু সম্পর্কের হিসাবের বাইরে ভালোবাসতে শেখাই না। আমরা তাকে সফল হওয়ার শিক্ষা দিই, কিন্তু কারও চোখের জল মুছে দেওয়ার শিক্ষা দিই না। বছরের পর বছর আমরা তার ভেতরের কোমল মানুষটাকে হত্যা করি, তার পর একদিন আশা করি–সে আমাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসবে। এ যেন একটি গাছের শেকড়ে প্রতিদিন বিষ ঢেলে, শেষ বয়সে এসে মিষ্টি ফল খুঁজে বেড়ানোর মতো।

আধুনিক শিক্ষার ভ্রান্তি: মেশিন বনাম মানবিক সত্ত্বা
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে। ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং আর করপোরেট ম্যানেজমেন্টের মতো বিষয়ে জ্ঞানলাভের এক অন্ধ প্রতিযোগিতা চলছে আমাদের চারপাশে। নতুন প্রযুক্তি আসছে–এটি নিঃসন্দেহে সময়ের দাবি। কিন্তু এসব অগ্রগতির কেন্দ্রে যে উপাদানটি থাকার কথা ছিল, তা হলো ‘মানুষ’। মানুষের সেবায়, মানুষের আত্মিক কল্যাণে কীভাবে এ বিজ্ঞানকে কাজে লাগানো হবে, সেই পরিমিতিবোধ মানুষকে কে দেয়? এই চেতনা কোনো ল্যাবরেটরি বা কোডিং ক্লাসরুম থেকে আসে না; এটি আসে কলা (Arts), সাহিত্য, ইতিহাস এবং সামাজিক দর্শনবিষয়ক চর্চা থেকে।

দর্শনহীন বিজ্ঞান আর মূল্যবোধহীন উচ্চশিক্ষা মানুষকে মানুষ বানায় না, বরং তাকে পরিণত করে একেকটি দক্ষ, সংবেদনহীন, স্বার্থপর রোবটে। নূরজাহান বেগমের সন্তানরা বুয়েটে পড়াতে পারেন, সরকারের নীতিনির্ধারণ করতে পারেন, ক্লাসরুমে শিশুদের পাঠ দিতে পারেন–কিন্তু মায়ের জীর্ণ ঘরের খবর রাখার, অসুস্থ জন্মদাত্রীর পাশে দাঁড়ানোর ন্যূনতম মানবিক বোধটুকু তাদের ভেতর গড়ে ওঠেনি। কারণ, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তাদের ‘সফল’ হতে শিখিয়েছে, ‘মানুষ’ হতে শেখায়নি।

আত্মকেন্দ্রিক পরিবার ও করপোরেট দাঁড়িপাল্লা 
এ সংকটের শেকড় আরও গভীরে, আমাদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরে। বর্তমান বিশ্বায়িত অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ব্যক্তিস্বার্থ আর চরম ভোগবাদের ওপর। আমাদের সনাতন যৌথ পরিবারের সুরক্ষামূলক কাঠামো ভেঙে আমরা এখন ‘আমি, আমার সঙ্গী আর আমার চার দেয়াল’–এই আত্মকেন্দ্রিক অণু-পরিবার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় সম্পর্কগুলোও এখন লাভ-ক্ষতির করপোরেট দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করা হয়।

ড. সুকোমল বড়ুয়ার দর্শন ও বাস্তবায়নের শূন্যতা
কারিগরি শিক্ষার এই নৈতিক মহামারি থেকে সমাজকে বাঁচাতে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডক্টর সুকোমল বড়ুয়া দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার আত্মিক রূপান্তরের কথা বলে আসছেন। তার মতে, কেবল বস্তুগত শিক্ষা মানুষকে অহংকারী ও বিচ্ছিন্ন করে তোলে। এর বিপরীতে তিনি আমাদের পাঠ্যক্রমে অহিংসা, পারস্পরিক মৈত্রী এবং অসাম্প্রদায়িক সামাজিক দর্শনের মেলবন্ধনের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি মূলত ‘মানবিক জ্ঞান ও বিজ্ঞানের একটি সমন্বিত শিক্ষা মডেল’ প্রস্তাব করেন। বিভিন্ন ফোরামে তার এই দূরদর্শী চিন্তাধারা প্রশংসিত হলেও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক মহল, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা কারিকুলাম বোর্ড তা বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই দর্শনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক করা যায়নি বলেই আজ সমাজ এমন মানবিক শ্মশানে পরিণত হয়েছে, যেখানে কাগজের সার্টিফিকেটের আড়ালে তৈরি হচ্ছে ‘উচ্চশিক্ষিত অমানুষ’।

উত্তরণের পথ: আইন বনাম মনস্তাত্ত্বিক সংস্কার
এই সামাজিক মড়ক থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই একটি সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ সংকটের সমাধান কেবল একতরফা আইনি প্রয়োগে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন দ্বিমুখী নীতি। বলা যেতে পারে-
আইনের কঠোর প্রয়োগ: বাংলাদেশে ২০১৩ সালের ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ রয়েছে। এটি একটি ভালো আইন হলেও সচেতনতার অভাব ও আইনি জটিলতার কারণে এর প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত। এ আইনের ধারাগুলো আরও কঠোর ও গতিশীল করা সময়ের দাবি। মা-বাবাকে অবহেলাকারী সন্তানদের চাকরি, পদোন্নতি বা রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা বাতিলের মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান যুক্ত করতে হবে।

পারিবারিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের সংস্কার: আইন দিয়ে রাষ্ট্র কাউকে শারীরিকভাবে পাশে দাঁড় করাতে পারবে, কিন্তু মনের ভেতরের সহানুভূতি জোর করে তৈরি করতে পারবে না। সেটার জন্য প্রয়োজন পারিবারিক মনস্তত্ত্বের আমূল সংস্কার। প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন নিয়ম হলো–যা বপন করবে, একদিন তাই ফিরে আসবে। তাই সন্তানকে শেখান–একটা ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাবার দিতে, একটা কান্নারত মানুষকে সান্ত্বনা দিতে, একটা সম্পর্ককে আগলে রাখতে। কারণ জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে মানুষ বুঝতে পারে–এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় অভাব অর্থের নয়, সবচেয়ে বড় অভাব ভালোবাসার।

সবচেয়ে করুণ মৃত্যু সেটা নয়, যখন মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। সবচেয়ে করুণ মৃত্যু তখনই ঘটে, যখন জীবিত অবস্থাতেই একটি হৃদয়ের ভেতর থেকে মায়া, ভালোবাসা আর মানবিকতা মারা যায়। সন্তানদের শুধু আমলা বা প্রকৌশলী বানানোর অন্ধ ইঁদুরদৌড় বন্ধ করে, সবার আগে তাদের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার যৌথ প্রতিজ্ঞা আমাদের রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবারকে নিতেই হবে। নয়তো আজ যে অবহেলা আর নির্মমতার শিকার এই মা হলেন, কাল সেই একই ভয়াবহ নিয়তি আমাদের প্রত্যেকের দরজায় এসে কড়া নাড়বে।

লেখক: প্রাবন্ধিক এবং কবি; ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং শত্রু-মিত্র খেলা

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং শত্রু-মিত্র খেলা
আনু মুহাম্মদ

যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এসব দেশে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। শতভাগ ভুল কথা।  স্বৈরাচার সাম্রাজ্যবাদের জন্য কখনোই সমস্যা না, বরং বিশ্বে স্বৈরাচারী শাসকদের প্রধান অংশ তাদেরই তৈরি কিংবা তাদেরই লোক। স্বৈরশাসক তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তারা বিরক্ত হয়।...

পুঁজিবাদের সম্প্রসারণে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা খুবই সহায়ক হয়েছিল। আর উপনিবেশগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্প্রসারণে পশ্চিমা মিশনারিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, ভূমিকা ছিল স্থানীয় এক ধরনের ধর্মীয় নেতা ও ক্ষমতাবানদেরও। আবার ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী অবস্থানেও কোনো কোনো মিশনারি ও স্থানীয় কোনো কোনো ধর্মীয় নেতার ভূমিকা দেখা গেছে। উত্তর উপনিবেশকালে প্রান্তস্থ দেশগুলোতে খুঁটি ধরে রাখতে, বিপ্লব ঠেকাতে পুঁজিবাদীকেন্দ্র বা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো ধর্মীয় শক্তি ব্যবহারে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। মূলধারার চার্চ সাম্রাজ্যবাদের খুঁটি হিসেবে বরাবরই কাজ করেছে। তারা একদিকে মুসলিম রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সবরকম ব্যবস্থা নিয়েছে, অন্যদিকে ইসরায়েলকে একটি বিষফোঁড়া হিসেবে প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে তাদের অনুগত ইসলামপন্থি দল ও ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে বিপ্লববিরোধী আতঙ্ক সৃষ্টি করার কাজ সহজ ছিল। বস্তুত, এই ধর্মপন্থিরা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে জনগণের মুক্তির লড়াই ঠেকাতে সামরিক বেসামরিক স্বৈরশাসকদের সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের পথই সুগম করেছে।

এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আশির দশক পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক ধর্মপন্থি সংগঠন, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে ধর্মরক্ষার নাম করে নিজেদের আধিপত্য নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহার করেছে। এর একটি বড় উদাহরণ আফগানিস্তান। প্রথমে মুজাহিদিনদের মাধ্যমে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সমর্থিত সরকার উচ্ছেদ করে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় আফগান মুজাহিদিনদের সবরকম পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে, প্রশিক্ষণ দিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে, অর্থ দিয়েছে। এর অংশীদার ছিল সৌদি আরবও। ইউএসএইড সরবরাহ করেছে ইসলামের নামে সহিংস উন্মাদনা সৃষ্টির মতো বই, শিশুদের পাঠ্যপুস্তক। যার মধ্যে সোভিয়েত সৈন্যের চোখ উপড়ে ফেললে বেহেশতে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিও ছিল।  আফগানিস্তানে সিআইএর এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে মাঠের ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সামরিক শাসনের মাধ্যমে জেনারেল জিয়াউল হকের মতো এক বাধ্য নিষ্ঠুর  সামরিক জেনারেলকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাজে দিয়েছে।

মুজাহিদিনদের অস্থিতিশীল শাসনের সময়েই একপর্যায়ে আকস্মিকভাবে বিশাল শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয় তালেবান। মুজাহিদিনদের বিরুদ্ধে যাদের অস্ত্র, সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ এবং কৌশলগত সমর্থন সবই জোগান দিয়েছে সেই একই যুক্তরাষ্ট্র। প্রথম দফায় তালেবানরা আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখলের সূচনা করে ১৯৯৭ সালের ২৪ মে। ঠিক তার আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ ব্যবসা জগতের মুখপাত্র ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আফগানিস্তান নিয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সেখানে লেখা হয়: আফগানিস্তান হচ্ছে মধ্য এশিয়ার তেল, গ্যাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ রপ্তানির প্রধান পথ।... তাদের পছন্দ কর বা না কর ইতিহাসের এই পর্যায়ে তালেবানরাই আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। দুই দিন পর অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের ২৬ মে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস লেখে: ক্লিনটন প্রশাসন মনে করে যে, তালেবানদের বিজয় ইরানের পাল্টা শক্তি হিসেবে দাঁড়াবে... এমন একটি বাণিজ্য পথ উন্মুক্ত করবে যা এই অঞ্চলে রাশিয়া ও ইরানের প্রভাবকে দুর্বল করবে।

মার্কিন তেল কোম্পানি ইউনোকল, যারা ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সময়ে বাংলাদেশ থেকে গ্যাস ভারতে রপ্তানির জন্য অনেক চেষ্টা করেছে, ক্লিনটন প্রশাসন ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের অবস্থানকে ‘খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি’ বলে অভিহিত করে। এই কোম্পানি বিশ্ববাজারে বিক্রির জন্য তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস ও অপরিশোধিত তেল নেওয়ার প্রকল্প নিয়ে অপেক্ষা করছিল।

১৯৯০-এর শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব আধিপত্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শত্রুপক্ষ দরকার হয়। ১৯৯১ সালে প্রথম দফা ইরাক আক্রমণের মধ্যদিয়ে পরবর্তী কয়েক দশকের যাত্রাপথ নির্মিত হয়। একদিকে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘শান্তি’র প্রতিপক্ষ ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে সবরকম বিদ্বেষী প্রচারণা, বৈষম্য ও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে থাকে মধ্যপ্রাচ্য, আরব ও মুসলমান পরিচয়ের মানুষ। অন্যদিকে রাজা-বাদশাসহ মুসলিমপ্রধান দেশের শাসকদের দেখা যায় সাম্রাজ্যবাদী এ নকশা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালনে। এ সময় থেকে ‘ইসলামি সন্ত্রাসী’র তৎপরতাও বেশি বেশি দেখা যায়, যা এই নকশা এগিয়ে নিতে খুবই প্রয়োজনীয় ছিল।

২০০১ সালে নিউইয়র্কের ‘টুইন টাওয়ার’ হামলার পর থেকে এই কর্মসূচির অধিকতর সামরিকীকরণ ঘটে। ফুলিয়ে-ফাপিয়ে তোলা স্পষ্ট-অস্পষ্ট, ঘোষিত-অঘোষিত, ‘সন্ত্রাসী’দের  বিরুদ্ধে ২০০১ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ একটি বৈশ্বিক এজেন্ডার রূপ দেয়। আরব বিশ্বে রাজতন্ত্রকে ভর করেই এ সন্ত্রাসী আধিপত্য বিস্তৃত হয়। পাশাপাশি পুরোনো মিত্রদেরই সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে যুক্তরাষ্ট্র, মিডিয়াসহ তাদের নানা সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসলাম ও মুসলমানবিদ্বেষী প্রচারণা জোরদার হয়। এ প্রচারণার প্রতিক্রিয়ায় ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনীতির ক্ষেত্রও উর্বর হতে থাকে। অন্যদিকে অপমান, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ক্ষোভের ওপর ভর করে বিশ্বজুড়ে ইসলামপন্থি রাজনীতির নতুনভাবে প্রসার ঘটে।

এ সূত্র ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী-পুরুষ-শিশুসহ বহু নিরীহ মানুষ খুন হয়েছে। মসজিদ, মন্দির গির্জা, মেলা, উৎসব, ভাস্কর্য আক্রান্ত হয়েছে। ইসলামের নাম নিয়ে এসব গোষ্ঠীর বর্বর দিগভ্রান্ত সন্ত্রাসী তৎপরতার কারণে বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে। রাষ্ট্রের দমনপীড়ন, সহিংসতা বেড়েছে, বিশ্বে অশান্তি বেড়েছে। এগুলোকে কেউ ‘জিহাদ’, কেউ ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই’ বলে মহিমান্বিত করতে চান। মোহমুক্ত থাকলে এসব বয়ান যে কত ভ্রান্ত তা উপলব্ধি কঠিন নয়। কারণ এসব আক্রমণ-সন্ত্রাস বিশ্বের ক্ষমতাবান রাষ্ট্র, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনার বিরুদ্ধে দেখা যায় না। সে কারণে তাদের দুর্বলও করে না, বরং তাদের দমনপীড়ন ব্যবস্থার পক্ষে আরও বিস্তৃত যুক্তি তুলে ধরে। সেই সূত্র ধরেই গত আড়াই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিভাবকত্বে পরিচালিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে দেশে দেশে জনগণের ওপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস-জুলুম আরও বেড়েছে। রাষ্ট্র আরও সশস্ত্র এবং নৃশংস হয়েছে।

অনেকে এও যুক্তি দিতে চেষ্টা করে যে, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন এই ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ ‘ইসলামি জঙ্গি’দের বিরুদ্ধে সেকুলার শক্তির পক্ষে। এটিও আরেকটি বড় ভ্রান্তি। বস্তুত, নির্বাচিত এবং সেক্যুলার সরকার উচ্ছেদে মার্কিনি রেকর্ড অনেক। চিলিসহ ল্যাটিন আমেরিকায় এর দৃষ্টান্ত অনেক, বিশ্বের অন্য প্রান্তেও। যেমন, ’৭০ ও ’৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে সেক্যুলার সরকারই ক্ষমতায় ছিল, কিন্তু তাদের অপরাধ তারা ছিল মার্কিনবিরোধী। অথচ এ সরকারগুলো আফগানিস্তানে ভূমি সংস্কার, নারী অধিকার, শিক্ষা ও চিকিৎসা সংস্কারে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছিল। এদের উচ্ছেদ করে মার্কিন রাষ্ট্র এমন শক্তিকে একের পর এক ক্ষমতায় এনেছে যারা এগুলোর ঘোর বিরোধী।  ইরাক ও লিবিয়াতেও সেক্যুলার সরকারই ক্ষমতায় ছিল। তাদের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার সমস্যা থাকলেও জাতীয় সক্ষমতা, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানিসহ জনঅধিকারের ক্ষেত্রে সেখানে অনেক সাফল্য ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে সাদ্দাম ও গাদ্দাফির শাসনব্যবস্থা উচ্ছেদের পর সেসব ব্যবস্থা তছনছ হয়েছে। আর সেখানে বিভিন্ন ধর্মপন্থি গোষ্ঠীর প্রভাব, সংঘাত বেড়েছে। সর্বশেষ সিরিয়াতেও তাই ঘটল।

এ রকমও কেউ কেউ বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এসব দেশে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। শতভাগ ভুল কথা।  স্বৈরাচার সাম্রাজ্যবাদের জন্য কখনোই সমস্যা না, বরং বিশ্বে স্বৈরাচারী শাসকদের প্রধান অংশ তাদেরই তৈরি কিংবা তাদেরই লোক। স্বৈরশাসক তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তারা বিরক্ত হয়।

লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই নতুন উপ-উপাচার্য নিয়োগ

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১০:২৬ এএম
আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ১০:৩০ এএম
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই নতুন উপ-উপাচার্য নিয়োগ
অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলাম-অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) পদে দুই অধ্যাপককে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

শনিবার (৬ জুন) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলামকে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলমকে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর ধারা ১৩(১) অনুযায়ী তাদের এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, যোগদানের তারিখ থেকে চার বছর অথবা অবসরের তারিখ- যেটি আগে ঘটবে, ততদিন তারা নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন। উপ-উপাচার্য হিসেবে তারা তাদের বর্তমান পদের সমপরিমাণ বেতন-ভাতা পাবেন।

এছাড়া বিধি অনুযায়ী পদসংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুবিধা ভোগ করবেন এবং সার্বক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও সংবিধি দ্বারা নির্ধারিত এবং উপাচার্য দ্বারা অর্পিত ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন করবেন।

প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর যেকোনো সময় এ নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন।

আমানউল্লাহ/ আজহার 

চামড়া নিয়ে দুর্ভোগ আর দুর্গতির শেষ কোথায়

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম
চামড়া নিয়ে দুর্ভোগ আর দুর্গতির শেষ কোথায়
রাজেকুজ্জামান রতন

বছরে প্রায় ২৫ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত করতে না পারার কারণে একটা কত বড় সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটতে দেখছে বাংলাদেশ। পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে দেশের বাজার, কর্মসংস্থান, বিদেশে রপ্তানি এবং পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা সম্ভব। দুর্দশা দৃশ্যমান, কিন্তু সমাধানের দায় নেবে কে?

দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পের কাঁচামাল নিয়ে দুর্গতির শেষ কি হবে না? নাকি এটা এক পরিকল্পিত দুর্দশা, যার কবলে পড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের সম্ভাবনা? প্রতিবছর ঈদুল আজহা এলে এই প্রশ্ন আর হাহাকার তৈরি হয় দেশের মানুষের মধ্যে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রতিবারের মতো এবারের ঈদুল আজহায় কাঁচা চামড়ার দাম আবারও মারাত্মকভাবে পড়ে গেছে। এর ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও চামড়া সংগ্রহকারীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন, যার ফলে দেশের চামড়া খাতের দীর্ঘদিনের সংকট নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। লাভের আশায় চামড়া কিনে অনেক ব্যবসায়ী কোনো ক্রেতা খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত অবিক্রীত চামড়া রাস্তার পাশে ফেলে দিতে বা মাটিতে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু এবার নয়, প্রায় এক দশক ধরে সংকটে বন্দি থাকা এই চামড়া খাতের স্থায়ী অব্যবস্থাপনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঈদের সংকটে।

এর কারণ কী? দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত কিন্তু সমাধানহীন সমস্যা হলো, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে একটি সম্পূর্ণ কার্যকর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সেন্ট্রাল এফ্‌লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। এ কারণে চামড়া খাতটি আন্তর্জাতিক পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স বা মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না, এ জন্য বৈশ্বিক রপ্তানি বাজারে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত হচ্ছে না। ফলে রপ্তানির সম্ভাবনা এখনো বাস্তবে রূপ নিতে পারছে না।

ধারণা করা হয়, দেশে উৎপাদিত কাঁচা চামড়া থেকে তৈরি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ বছরে ১২ বিলিয়ন (১ হাজার ২০০ কোটি) ডলার আয় করার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু বর্তমানে তার চামড়াশিল্পের সম্ভাবনার মাত্র শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ কাজে লাগাতে পারছে। সম্ভাবনা এবং বাস্তবতার মধ্যে কত ফারাক! রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, অর্থাৎ এক দশকে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। অথচ একই সময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। যদিও পোশাকশিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতে হয় আর চামড়াশিল্পের কাঁচামাল দেশেই মজুত এবং নষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন। কারণ পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স বা নীতিমালার উদ্বেগের কারণে বৈশ্বিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া কেনেন না। কিন্তু অন্যান্য দেশ কী করছে? ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনামের চামড়া রপ্তানির পরিমাণ বাংলাদেশের কাছাকাছিই ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের মধ্যে ভিয়েতনাম ২৯ বিলিয়ন ডলারের জুতা রপ্তানি করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জুতা রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে, যা বাংলাদেশের চামড়া খাতের মোট রপ্তানি আয়ের চেয়ে প্রায় ২৫ গুণ বেশি। এটা কি জাদুমন্ত্রে সম্ভব হয়েছে? তা নয়। ভিয়েতনাম তাদের অবকাঠামো তৈরি করেছে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। আর বাংলাদেশ কোনো বর্জ্য শোধনাগার বা স্যুয়ারেজ প্ল্যান্ট ছাড়াই একটি ট্যানারি শিল্পনগরী গড়ে তুলেছে। আমরা আমাদের জাতীয় সম্পদ এই কাঁচা চামড়াকে মাটিতে পুতে, নদীতে ফেলে ধ্বংস করে ফেলেছি।

সরকার-নির্ধারিত দাম এবং বাজারের মধ্যে বিরাট ফারাক। সরকার এ বছর ঢাকার জন্য লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। মাঝারি মানের একটি গরুতে সাধারণ ১৮-২০ বর্গফুট ও বড় গরু থেকে ২৪-২৬ বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। ফলে সরকার-নির্ধারিত সর্বোচ্চ দাম প্রতি বর্গফুট ৬৭ টাকা হিসাবে মাঝারি মানের লবণযুক্ত একটি চামড়ার দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা, আর বড় চামড়ার ক্ষেত্রে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা।

বাজারের চিত্র কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকায় আকার ও গুণমানের ওপর ভিত্তি করে এবার বেশির ভাগ কাঁচা চামড়া ৩০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান চামড়া ব্যবসা কেন্দ্র পোস্তার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তারা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার বেশি দাম দিয়ে কোনো চামড়া কেনেননি। অথচ দুই দশক আগে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন একই ধরনের চামড়ার দাম ৫০০ টাকারও কম। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী, বর্তমানে এই দাম ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা হওয়া উচিত ছিল।

আড়তদাররা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সস্তায় চামড়া কিনে তা সংরক্ষণ করার পর ট্যানারিগুলোর কাছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করেন। তার মতে, প্রতি পিস চামড়া সংরক্ষণে খরচ হয় মাত্র ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা। ফলে ৪০০ টাকায় কেনা একটি চামড়া যখন ট্যানারিতে পৌঁছায়, তখন সব মিলিয়ে তার ৮০০ টাকা হয়ে যায়।

আড়তদাররা সারা বছর ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় চামড়া বিক্রি করেন। কাঁচা এবং ওয়েট-ব্লু (আংশিক প্রক্রিয়াজাত) চামড়া রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাজার সীমিত, ফলে ঈদুল আজহার সময় উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ চামড়া ধরে রাখতে পারছেন না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করলে তার মূল্য আছে। লবণ ছাড়া চামড়ার গুণ ও মান রক্ষা করা যায় না। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে চামড়া খাতের সংকটকে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে হাজারীবাগের কারখানাগুলোর গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সরকার ট্যানারি মালিকদের সাভারে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করে। তবে শিল্প-মালিকদের প্রতিনিধিদের দাবি, সাভার শিল্পনগরী পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। ফলে অনেক ট্যানারি মালিক আর্থিক সংকট ও ঋণখেলাপির মুখে পড়েছেন। আর পরিবেশ দূষণ বুড়িগঙ্গা নদী থেকে এখন ধলেশ্বরী নদীতে স্থানান্তরিত হয়েছে।

ঈদুল আজহায় প্রতিবছর যে পরিমাণ চামড়া উৎপাদিত হয়, তা ধারণ বা প্রক্রিয়াজাত করার মতো সক্ষমতা আমাদের নেই। চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত কাঁচা বা লবণযুক্ত এবং ওয়েট-ব্লু চামড়া আমদানি করে। চামড়া রপ্তানি বন্ধে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে না, ফলে চোখের সামনে এই মূল্যবান কাঁচামাল পচে যাচ্ছে। অন্যদিকে সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে চামড়া সংগ্রহ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা নজরে পড়েছে। নিষেধাজ্ঞা ছিল ঈদের পর সাত দিন রাজধানী অভিমুখে পরিবহনের ক্ষেত্রে। কিন্তু কে মানে সেই নিষেধাজ্ঞা! বিসিক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা স্বীকার করেছেন যে, বিপুল পরিমাণ চামড়া ঈদের পর পরই সাভারে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, ঈদের দিন দুপুর থেকে পরদিন বেলা ১১টার মধ্যে ৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৪৯টি কোরবানির পশুর চামড়া এই শিল্পনগরীতে প্রবেশ করেছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫২টি। গত বছর ঈদের প্রথম তিন দিনে শিল্পনগরীতে মোট কোরবানির পশুর চামড়া প্রবেশ করে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৭ পিস। যেখানে এ বছর ৩০ মে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শিল্পনগরীতে মোট চামড়া প্রবেশ করেছে ৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৫ পিস। ফলে এটি ধারণা করলে ভুল হবে না যে, সঠিক সংরক্ষণ বা লবণ দেওয়া ছাড়াই ঢাকার বাইরের একটি বড় অংশের চামড়া সরাসরি শিল্পনগরীতে ঢুকে পড়েছে। এই চামড়ার ভবিষ্যৎ কী?

বছরে প্রায় ২৫ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত করতে না পারার কারণে একটা কত বড় সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটতে দেখছে বাংলাদেশ। সংরক্ষণের অভাবে চামড়া পচে নষ্ট হয়, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার তৈরি না করার কারণে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করা যাচ্ছে না, কিন্তু দেশের বাজারে জুতা সস্তায় পাওয়া যায় না। সবাই বলছে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে দেশের বাজার, কর্মসংস্থান, বিদেশে রপ্তানি এবং পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা সম্ভব। দুর্দশা দৃশ্যমান, কিন্তু সমাধানের দায় নেবে কে? 

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি 
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]

যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব
ড. এম শামসুল আলম

ন্যূনতম ব্যয়ে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য। সরকার যে কাজই করুক না কেন, তাতে পরিশেষে জনকল্যাণ নিশ্চিত হতেই হবে। ফলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা অন্য যেকোনো পণ্য কিংবা সেবাই হোক, জনগণ যেন তা ন্যূনতম ব্যয়ে পায়, তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।...

জ্বালানি মানব জীবনের জন্য একটি আবশ্যিক পণ্য। জ্বালানি নিরাপত্তার ঘাটতি, অর্থাৎ যেকোনো মৌলিক চাহিদার ঘাটতি যতটা-না বিপজ্জনক, এর থেকেও জ্বালানিঘাটতি অত্যধিক বিপজ্জনক। তাই এ ঘাটতি সৃষ্টি করা সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার খর্ব করার শামিল। সুতরাং, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্র তার এ দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। বর্তমান সরকারের আমলেও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আজও ভয়াবহ বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতি উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই।

কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, গ্রাহকরা ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে ইউনিটপ্রতি ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে ৬৯ পয়সা বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা, শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব‍্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে ৯২ পয়সা বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা এবং ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৩০ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। নতুন ঘোষণায় পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধি করে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। এ ছাড়া খুচরা পর্যায়ে ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি গড়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা বেশি গুনতে হবে।

১৯৯০ সাল থেকে দেশের বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতে যেসব সংস্কার তথা রূপান্তর হয়েছে এবং হচ্ছে, সেসবে রাষ্ট্রের নীতি বা আদর্শ না থাকায় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অর্থবহ না হওয়ায় ‘সবার জন্য লোডশেডিংমুক্ত বিদ্যুৎ’ অবশেষে লোডশেডিং যুক্ত বিদ্যুতে পরিণত হয়েছে। এখানেই সরকার পরিকল্পনা-বিভ্রান্তির শিকার। পরিকল্পনা তৈরির আইনি এখতিয়ার সরকারের। বিগত ৩৩ বছরে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি উপ-খাতসমূহ পরিচালনা ও উন্নয়নে বহু নীতি বা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। সেসব পরিকল্পনার কোনোটি মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে কি না আমার জানা নেই। এসব পরিকল্পনা মূলত তৈরি করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উভয় বিভাগ। বাস্তবায়নও করে স্ব স্ব ক্ষেত্রে তারাই। ফলে পরিকল্পনা স্বার্থসংঘাতযুক্ত। পরিকল্পনা আইনের আওতায় বাস্তবায়িত না হলে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা যায় না। তাছাড়া পরিকল্পনা প্রণেতা যদি বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ হয়, তাহলে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণহীন হয় এবং সরকার বিভ্রান্তিতে পড়ে। এভাবেই সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পরিকল্পনা-বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০-এর আওতায় বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি উন্নয়নে প্রতিযোগিতাবিহীন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতে প্রতিযোগিতা কমিশন আইন ২০১২ কার্যকারিতা হারায়। ফলে বিদ্যুৎ, গ্যাস, কয়লা, তরল জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন/আমদানি, সঞ্চালন/পরিবহন ও বিতরণে প্রতিযোগিতাবিহীন বিনিয়োগ অব্যাহত আছে। বাজারে প্রতিযোগিতা না থাকলে বাজার প্রকৃতপক্ষে মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা হারায়। বাজার এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ায় অলিগোপলির শিকার হয়। অর্থাৎ বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথা রাষ্ট্রের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আর যদি মন্ত্রী-এমপিরা ব্যবসায়ী হয়, তাহলে তো আর কোনো কথাই থাকে না। ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছেমতো মূল্য নির্ধারণের সুযোগ নেয় এবং জনগণের ওপর এক ধরনের লুণ্ঠন চালায়। ব্যবসায়ীরা এখন বাজারের ওপর সেই একক কর্তৃত্ব চালাচ্ছে। বাজারকে অলিগোপলি প্রতিষ্ঠিত করে তারা ইচ্ছেমতো মূল্য নির্ধারণ করছে। তেল-লবণ-চাল-আটা-ডালসহ যেকোনো ভোজ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির গতি-প্রকৃতি দেখে বোঝা যায়, কীভাবে তারা তা নিয়ন্ত্রণ করছে। আমদানিকৃত পণ্য বা দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য অথবা সেবা সবই নিয়ন্ত্রণ করছে ব্যবসায়ীরা। আর তারা তাদের ইচ্ছেমাফিক মূল্য বাড়াচ্ছে।

আইন অনুযায়ী সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যহার নির্ধারণের একক এখতিয়ার ছিল বিইআরসির, তা সত্ত্বেও বিপিসি নিজেই ফার্নেস অয়েলসহ অন্যান্য তরল জ্বালানি এবং ডিজেল, পেট্রোল ও কেরোসিনের মূল্যহার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগকে দিয়ে যখন-তখন ইচ্ছেমাফিক বৃদ্ধি এবং নির্ধারণ করত। আইনানুযায়ী, এই মূল্যহার সরবরাহ ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। বিনিয়োগ ব্যয় সমন্বয়ে সরবরাহ ব্যয় নির্ধারিত হয়। বিনিয়োগ প্রতিযোগিতাহীন হওয়ায় ন্যায্য ও যৌক্তিক ব্যয় অপেক্ষা সরবরাহ ব্যয় অনেক বেশি হয়। আর এই বেশি ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে বিপিসি নিজে এবং ক্ষেত্র বিশেষে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগকে দিয়ে ইচ্ছেমাফিক মূল্যহার বৃদ্ধি করে। এতে বোঝা যায়, তরল জ্বালানির বাজার কীভাবে সরকারি মালিকানাধীন ব্যবসায়ী বিপিসির কাছে জিম্মি তথা অলিগোপলির শিকার। এই একই কথা বিদ্যুৎ, গ্যাস, কয়লা, এলপিজি, এলএনজি ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কমবেশি প্রযোজ্য।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন ২০০৩-এর আওতায় জ্বালানির মূল্যহার গণশুনানির ভিত্তিতে নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের একক ক্ষমতা দিয়ে সরকার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বিইআরসি’ প্রতিষ্ঠিত করে। জ্বালানি সরবরাহে সংশ্লিষ্ট সংস্থা/কোম্পানিগুলোকে বিইআরসির লাইসেন্সি হিসেবে বিইআরসির নিয়ন্ত্রণাধীনে আনা হয়। আবার ২০২৩ সালে ওই আইন সংশোধন করে মূল্যহার গণশুনানি ব্যতীত নির্ধারণের ক্ষমতায় মন্ত্রণালয়কে আনা হয়। আমরা যদি ভোক্তাদের দিক থেকে দেখি–রাষ্ট্র আমার এই অধিকারটুকু নিশ্চিত করবে, আমি যদি বাজার থেকে কোনো পণ্য বা সেবা কিনতে চাই, তাহলে সেই পণ্য বা সেবার মূল্য যেন ন্যায্য ও যৌক্তিক হয়। সেজন্য বাজার প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে এবং সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রতিযোগিতা কমিশনের। অথচ এখানে কমিশন নিষ্ক্রিয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিইআরসির। কিন্তু বিইআরসি সেই প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একেবারেই নিষ্ক্রিয়। হাইকোর্টের রায়েও বিআরসির নিষ্ক্রিয়তাকে বেআইনি ও কর্তৃত্ববহির্ভূত বলা হয়েছে।

সরকারের দাবি, তারা দেশের বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতে অনেক উন্নয়ন করেছে। তা আসলে কতটা সঠিক ও গ্রহণযোগ্য–এমন প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়, যখন দেখা যায় প্রতিযোগিতাবিহীন বাজার সৃষ্টি করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় এবং মুনাফা সমন্বয় করে অন্যায় ও অযৌক্তিক মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত। আবার প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ সংকটের কারণে সিংহভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা অব্যবহৃত থাকায় প্রতি একক বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যয়বৃদ্ধিতে মূল্যহার বৃদ্ধি ঘটে। যে রূপান্তরের পরিণতিতে জনগণ এমন পরিস্থিতির শিকার হয়, আমার বিবেচনায় তাকে কোনোভাবেই উন্নয়ন, কিংবা সঠিক ও যৌক্তিক রূপান্তর বলা যায় না। বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার করার মতো প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হতে হবে। এ জ্বালানি সরবরাহ সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করাই হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন। এর পরিবর্তে কেবলমাত্র বিদ্যুতের অভিক্ষিপ্ত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন বলা সম্ভব নয়।

ন্যূনতম ব্যয়ে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য। সরকার যে কাজই করুক না কেন, তাতে পরিশেষে জনকল্যাণ নিশ্চিত হতেই হবে। ফলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা অন্য যেকোনো পণ্য কিংবা সেবাই হোক, জনগণ যেন তা ন্যূনতম ব্যয়ে পায়, তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাত উন্নয়ন ও পরিচালনায় এমন কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে জনসাধারণ অধিক মূল্যহারের শিকার হচ্ছে।

লেখক: জ্বালানি উপদেষ্টা