ফেডারেশন কেবল প্রাদেশিক অভিযোগের ওপর টিকে থাকতে পারে না। রাজনীতি যখন পরিচয়ভিত্তিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন গণতন্ত্রও কেবল আনুষ্ঠানিক রূপে পরিণত হয়। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে আবেগপ্রবণ প্রাদেশিক রাজনীতি সাময়িক লাভ দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় ঐক্যকে দুর্বল করে।...

পাকিস্তান একটি ফেডারেল, গণতান্ত্রিক ও বহুজাতিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল- যার শক্তি নির্ভর করত যৌথ ক্ষমতা, সাংবিধানিক ভারসাম্য এবং সব প্রদেশের সমান অংশগ্রহণের ওপর। স্বাধীনতার সময় রাজনৈতিক কল্পনা ছিল স্পষ্ট- জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো জাতিগত, ভাষাগত ও প্রাদেশিক সীমার ঊর্ধ্বে উঠে এমন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি গড়ে তুলবে, যা বিভিন্ন অঞ্চলকে একটি শক্তিশালী ফেডারেশনে একত্রিত করবে। কিন্তু সাত দশক পেরিয়ে যাওয়ার পর সেই দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় ম্লান হয়ে গেছে। আজ পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কার্যত প্রাদেশিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ, আর ছোট দলগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে আটকে রয়েছে। জাতীয় রাজনীতির শূন্যতা ক্রমেই বাড়ছে, যার জায়গা নিচ্ছে আঞ্চলিক সম্প্রসারণ ও প্রাদেশিক অগ্রাধিকার।
বর্তমান রাজনৈতিক মানচিত্র এ প্রবণতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) মূলত সিন্ধু প্রদেশে সীমাবদ্ধ, পাকিস্তান মুসলিম লিগ প্রধানত পাঞ্জাবে প্রভাবশালী, আর পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ক্রমশ খাইবার পাখতুনখোয়াতেই কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। এটি কোনো সাময়িক রাজনৈতিক ওঠানামা নয়; বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিফলন, যা পাকিস্তানের ফেডারেল কাঠামোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আজ এ দলগুলো জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির ধারক না হয়ে অনেক বেশি প্রাদেশিক দুর্গে পরিণত হয়েছে।
পিপলস পার্টির অবনমন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এক সময় এটি সত্যিকারের জাতীয় দল হিসেবে পরিচিত ছিল, কিন্তু আজ এর রাজনৈতিক প্রভাব মূলত সিন্ধুর গ্রামীণ এলাকাতেই সীমাবদ্ধ। মুসলিম লিগ, যা ঐতিহাসিকভাবে পাঞ্জাবে প্রভাবশালী, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় টেকসই সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৮ সালের পর তেহরিক-ই-ইনসাফ নিজেকে জাতীয় দল হিসেবে উপস্থাপন করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রাজনীতিও প্রধানত খাইবার পাখতুনখোয়াতেই সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে- আজ কি পাকিস্তানে সত্যিকারের কোনো জাতীয় রাজনৈতিক দল আছে? বাস্তবতা এ প্রশ্নের উত্তরকে না-সূচক করে।
যখন রাজনৈতিক দলগুলো দু-একটি প্রদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন জাতীয় রাজনীতি স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে যায়। ফেডারেল ব্যবস্থা যৌথ মালিকানা ও অংশীদারত্বের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু প্রাদেশিক রাজনীতি সেই ধারণাকে বিভাজনে পরিণত করে। তিনটি বড় দলই তাদের নামে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি ব্যবহার করে, কিন্তু বাস্তবে তাদের রাজনীতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক। এটি গঠনমূলক ফেডারেলিজম নয়, বরং রাজনৈতিক সুবিধার জন্য লুকিয়ে রাখা প্রাদেশিকতা। এর দায় প্রধানত দলীয় নেতৃত্বের ওপরই বর্তায়, যারা জাতীয় বিস্তারের কঠিন পরিশ্রমের বদলে প্রাদেশিক নিরাপত্তাকে বেছে নিয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অর্থনীতি কেন্দ্রীভূত ছিল, যার ফলে প্রদেশগুলো সম্পদের বৈষম্যপূর্ণ বণ্টন ও সীমিত স্বায়ত্তশাসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে। এসব অভিযোগ নতুন বা ভিত্তিহীন নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক দলগুলো শক্তিশালী ফেডারেল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে সমস্যার সমাধান করার বদলে এগুলোকে নির্বাচনি লাভের জন্য ব্যবহার করেছে। আঞ্চলিক বঞ্চনা রাজনৈতিক পুঁজি হয়ে উঠেছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, জাতীয় সংহতি জোরদার হলে প্রদেশ ও দল- উভয়েরই লাভ হতো, কিন্তু স্বল্পমেয়াদি নির্বাচনি হিসাব দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে ছাপিয়ে গেছে।
একটি প্রকৃত জাতীয় দল গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক সাংগঠনিক পরিশ্রম, আদর্শগত স্পষ্টতা, নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ এবং সেসব এলাকায় সক্রিয় সম্পৃক্ততা, যেখানে জয়ের সম্ভাবনা কম। অধিকাংশ দল এ চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে যায় এবং নিজেদের শক্তি সেসব এলাকায় কেন্দ্রীভূত করে, যেখানে তাৎক্ষণিক নির্বাচনি সাফল্য সম্ভব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ কৌশল দলগুলোকে ভৌগোলিকভাবে সংকুচিত করে এবং জাতীয় রাজনীতির পরিসর সীমিত করে ফেলে।
দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামোও এ সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। নেতৃত্ব যখন কয়েকটি পরিবার বা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন নতুন প্রতিভা- বিশেষত সেই প্রদেশগুলো থেকে, যেখানে দল দুর্বল, উদ্ভাসিত হওয়ার সুযোগ পায় না। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা ছাড়া কোনো দল জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত হতে পারে না। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিং, জোরপূর্বক জোট এবং কৃত্রিম আনুগত্য দলগুলোকে আরও প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দেয়, যেখানে তারা প্রাদেশিক খোলসের মধ্যেই নিরাপত্তা খোঁজে।
যখন জাতীয় নীতির বিতর্ক ভাষাগত, জাতিগত ও প্রাদেশিক পরিচয়ের চারপাশে আবর্তিত হয়, তখন রাজনীতি সংকীর্ণ ও আবেগনির্ভর হয়ে পড়ে। স্বল্পমেয়াদে এ ধরনের বয়ান ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা জাতীয় ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বড় দলগুলোর প্রাদেশিক রূপান্তর কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতাই নয়, বরং ফেডারেল স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও একটি গুরুতর হুমকি। যখন প্রতিটি দল শুধু নিজেদের ‘প্রদেশের’ কথা বলে, তখন যৌথ জাতীয় পরিচয় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ‘আমরা বনাম তারা’ ধরনের রাজনীতির জন্ম হয়।
প্রাদেশিক রাজনীতি জাতিগত ও ভাষাগত বিভাজনকে আরও তীব্র করে এবং সামাজিক সংহতি ক্ষুণ্ন করে। যদি ফেডারেল সরকারকে কোনো একটি প্রদেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়, তবে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা কমে যায়। নীতিনির্ধারণ প্রাদেশিক স্বার্থের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়, ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে কেন্দ্র সহযোগিতার ক্ষেত্র না হয়ে সংঘাতের ময়দানে পরিণত হয়।
কোনো ফেডারেশন কেবল প্রাদেশিক অভিযোগের ওপর টিকে থাকতে পারে না। রাজনীতি যখন পরিচয়ভিত্তিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন গণতন্ত্রও কেবল আনুষ্ঠানিক রূপে পরিণত হয়। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে আবেগপ্রবণ প্রাদেশিক রাজনীতি সাময়িক লাভ দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় ঐক্যকে দুর্বল করে। একটি শক্তিশালী ফেডারেশনের জন্য অন্তর্ভুক্তি অপরিহার্য- ক্ষমতা, সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সব প্রদেশের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
যদি প্রদেশগুলো মনে করে যে কেন্দ্র অন্যদের এবং তাদের স্বার্থ উপেক্ষিত, তবে সাংবিধানিক ও সামাজিক সংকট অনিবার্য হয়ে ওঠে। আজ পাকিস্তান ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহূর্তে প্রয়োজন সত্যিকারের জাতীয় রাজনৈতিক দল, যারা চারটি প্রদেশেই প্রোথিত থাকবে, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করবে এবং আঞ্চলিক সুবিধার বদলে জাতীয় বয়ানকে অগ্রাধিকার দেবে। প্রাদেশিক রাজনীতি সাময়িক আশ্রয় দিতে পারে, কিন্তু জাতি গড়ে ওঠে না সংকীর্ণ ভিত্তির ওপর। শক্তিশালী জাতীয় দল ছাড়া পাকিস্তানের ফেডারেশন কেবল একটি আইনি কাঠামো হয়েই থাকবে, বাস্তব সত্যে পরিণত হবে না। নেতৃত্বকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও প্রাদেশিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে, নচেৎ ইতিহাস বারবার একই প্রশ্ন তুলবে- পাকিস্তানের নেতারাই কি জাতীয় রাজনীতির ধারণাকে সমাহিত করেছেন?
লেখক: ইসলামাবাদে অবস্থানরত সম্পাদক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, বুক অ্যাম্বাসাডর
ও একাধিক গ্রন্থের লেখক
[email protected]


.jpg)