শাহদীন মালিক সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, আইনজ্ঞ এবং সংবিধানবিশেষজ্ঞ। বহু বছর ধরে তিনি রাজনীতি, আইন-আদালত, সংবিধান ও মানবাধিকার বিষয়ে নিয়মিত লিখছেন। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র সহসম্পাদক শেহনাজ পূর্ণা-
খবরের কাগজ: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?
শাহদীন মালিক: এবারের নির্বাচন অবশ্যই ভালো হবে। অন্তর্বর্তী সরকারকে আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনগুলো হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারকে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকায় আমরা দেখতে চাই। নির্বাচনের কোনো ইস্যুতে কোনো পক্ষপাতিত্ব তারা করবে না। সবার জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বজায় রাখবে আশা করা যায় । সেসব দিক বিবেচনায় নির্বাচন ভালোই হবে বলে মনে হচ্ছে।
খবরের কাগজ: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও নির্বাচনি পরিবেশ কেমন দেখছেন?
শাহদীন মালিক: বিগত তিনটি নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। তাদের মধ্যে ভোটদানের ব্যাপারে এক ধরনের অনীহা দেখা গেছে। এর কারণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে আস্থার পরিবেশ ছিল না। এবারের নির্বাচন সেদিক থেকে ভিন্নতা পেয়েছে। নির্বাচন নিয়ে মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও নির্বাচনি পরিবেশ ইতিবাচক মনে হচ্ছে। এবার বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটারের কথা শুনতে পাচ্ছি। তাদের মধ্যে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। আমার ধারণা, এবার বিপুলসংখ্যক মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা ভোট দেবেন। নতুনদের অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে সবাই ভালো একটি নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছে।
১৮ কোটি লোকের সমাজে কিছু বিরোধ হবে, মারামারি হবে। এটা তো খুব স্বাভাবিক। নির্বাচনে ঝগড়াঝাটি, বাড়াবাড়ি, কটুবাক্য, হয়তো কোথাও কিছুটা লোক আহত বা আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার ঘটনা ঘটবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি মনে করি না যে, এমন কিছু ঘটবে যা নির্বাচনের ওপরে প্রভাব ফেলবে। এ ধরনের কোনো আশঙ্কা আছে বলে আমি মনে করি না। একজন গণতান্ত্রিক মানুষ হিসেবে আমি যদি বলি যে, ডানপন্থি নির্বাচন করতে পারবেন না, বামপন্থির নির্বাচনে জেতা উচিত, এগুলো নির্বাচনি আমেজকে সংকুচিত করে। তাহলে তো গণতন্ত্র থাকল না। জনগণের উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সবারই কাম্য।
খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
শাহদীন মালিক: মূল্যায়ন ভালো বলতে পারছি না। আমি যদি আমার ভাষায় বলি, একটি পরীক্ষার মূল্যায়ন যেমন ফার্স্ট ডিভিশন, সেকেন্ড ডিভিশন, থার্ড ডিভিশন দিয়ে হয়। এ সরকারের মূল্যায়ন করতে আমি থার্ড আর সেকেন্ড ডিভিশনের মাঝামাঝিই বলব। ফার্স্ট ডিভিশন দেব না। আবার ফেলও করাব না। অর্থাৎ, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়ন সেকেন্ড ডিভিশন আর থার্ড ডিভিশনের মাঝামাঝি বলতে হবে।
খবরের কাগজ: ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার নিশ্চিতে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা কেমন?
শাহদীন মালিক: আমি মনে করি, এ সময়ে দুটি বড় কাজ হয়েছে। প্রথম কাজটা হলো বিচার বিভাগের পৃথকীকরণে সেক্রেটারিয়েটের কাজটা শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তিন মাস আগে যে বিচারপতিদের নেওয়া হয়েছে, তা আইনানুযায়ী নেওয়া হয়েছে। এ দুটি ভালো কাজ হয়েছে। এ ছাড়া এ সরকার শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করেছে, যার বেশির ভাগই ত্রুটিপূর্ণ। আমাদের আইনজীবীদের জন্য মামলা বেড়েছে; বিচারপতি নিয়োগের ব্যবস্থা হয়েছে; পৃথক সচিবালয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এগুলো দির্ঘমেয়াদি বা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আইনি সহায়তা কার্যক্রমের বিস্তৃতি ঘটানোর কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ লাঘব হয়নি। দেশে বেশির ভাগ বিচারপ্রার্থী দরিদ্র অথবা নিম্নবিত্ত। তাদের সহায়তা করার জন্য খুব একটা ভালো কাজ করা হয়নি।
খবরের কাগজ: নির্বাচনের আগে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না?
শাহদীন মালিক: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টা প্রকৃতপক্ষে যারা সরাসরি আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত তারা ভালো বলতে পারবেন। সাম্প্রতিক সময়ে দু-একটি ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো অবশ্যই উদ্বেগজনক। এর খেসারত আমাদের অনেক দিন দিতে হবে। তবে আমি একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অর্থাৎ সুষ্ঠু নির্বাচন এবং জনগণের অংশগ্রহণের জায়গাটা দেখতে পাচ্ছি। এর বাইরে বড় রকমের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোনোরকম হুমকির মুখে আছে বা জনগণের জন্য বিপজ্জনকভাবে আছে, নির্বাচনের আবহ বিশ্লেষণে এমনটা মনে করছি না।
খবরের কাগজ: এবার সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে প্রচার চালাচ্ছে। এ বিষয়ে কী বলবেন?
শাহদীন মালিক: সংবিধানের জটিলতম বিষয়ে গণভোট করা হচ্ছে। সংবিধানের এ জটিল ব্যাপারগুলো জেলা আদালতের একজন আইনজীবীও হয়তো বোঝেন না। এ জটিলতম সাংবিধানিক প্রশ্নে গণভোটে জনগণের মতামত চাওয়া হবে। এটা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা বেশ কঠিন। গণভোটের প্রচলিত দুই ধাপ অর্থাৎ আগে সংসদে পাস হবে, তার পর গণভোটে যাবে- এটা না করে এভাবে জটিল প্রশ্নে সরাসরি গণভোটে যাওয়াটা আইনিভাবে অবাস্তব। দ্বিতীয় কথা হলো, এ গণভোটের সিদ্ধান্ত সংসদ মানতে বাধ্য কি না। সংসদের সার্বভৌমত্বের মানে হলো একটি সংসদের ওপর কেউ কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারবে না। তাহলে ১৮০ কার্যদিবস সময় দিয়ে সংসদকে গণভোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংস্কার সম্পন্ন করার যে কথা বলা হয়েছে, সেটি সাংবিধানিক ও আইনিভাবে কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে ভিন্নমতসহ প্রশ্ন রয়েছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আমাদের প্রত্যাশা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো কাজ করবে। নির্বাচনের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করবে বা সব পক্ষের জন্য সমান সুবিধা নিশ্চিত করবে। তবে ভোটের ব্যাপারে সরকার ইতোমধ্যে পক্ষ নিয়ে নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জন্য প্রচার চালাতে পারে না। এটা করে সরকার আরেকটি ভুল করছে। এটা ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে। দেশে দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহি ও সুশাসনের যে অভাব ছিল, সে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। ‘না’ জয়ী হলে তো সংস্কারের সব পরিকল্পনা বাদ হয়ে যাবে। অন্যদিকে ‘হ্যাঁ’ কত শতাংশ ভোটে জয়ী হবে, সেটির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। যদি ফলাফলটা এমন হয় যে সংসদ নির্বাচনে ৬০ শতাংশ লোক ভোট দিলেন, আর গণভোটে ২০ শতাংশ লোক অংশগ্রহণ করলেন, তাহলে কিন্তু এই গণভোটের নৈতিক যে বাধ্যবাধকতা, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হবে।
খবরের কাগজ: নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
শাহদীন মালিক: সরকারের কাছে জনসাধারণের প্রত্যাশা অনেক। প্রধান যে দলগুলো আছে, কমবেশি হলেও সবার এ উপলব্ধিটা হয়েছে। অতএব, জনগণের চাওয়া-পাওয়াকে তোয়াক্কা না করে নিজের স্বার্থে দেশ চালাবে, এটা বোধ হয় তারা পারবে না। মোটামুটিভাবে জনগণের প্রত্যাশার কাছাকাছি থেকেই তাদের কাজ করতে হবে। যে স্বপ্ন নিয়ে তরুণরা বিজয় এনেছে, আমরা যেন সে স্বপ্নকে ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নিতে পারি। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
নতুন বছরে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে হোক। দেশে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। বাংলাদেশ আমাদের সবার। রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তাদের কাজ করে যাক। সর্বোপরি, আমাদের সবার সহযোগিতা নিয়েই দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সবাই সবার আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করবে। জনগণ নিজেদের পছন্দ ও উপযোগিতা নিয়ে ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, সেটাই প্রত্যাশা।
খবরের কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ।
শাহদীন মালিক: আপনাকেও ধন্যবাদ।
.jpg)
.jpg)
