মিসরের চরম দক্ষিণপন্থী থেকে অতি বাম–সবাই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সমীকরণকে গুরুত্ব দেয়নি, বরং একে গুরুত্বহীন মনে করেছে। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারককে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর জন্য কেবলমাত্র অস্ত্র ও সন্ত্রাসকে রেজিম পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে তারা। রাষ্ট্রকে দুর্বল করে শাসনপদ্ধতিকে উপড়ে ফেলার কথা বলেছেন। তারা সুস্পষ্টভাবে সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছিলেন।...

পনের বছর আগে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে মিসরে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। কিন্তু যে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান হয়েছিল, তা এখনও টিকে আছে।
অভ্যুত্থানটি বিচ্ছিন্ন কোনো আন্দোলন ছিল না। রাজনৈতিক ধাবাহিকতায় আন্দোলনটি ২০১১ সালের জানুয়ারিতে তুঙ্গে ওঠে এবং সাফল্য পায়। আন্দোলনটি ছিল অনেকটা ভূকম্পনের মতো। এই আন্দোলন ডিপ স্টেটের প্রতিষ্ঠানগুলোকে একেবারে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। চিড় ধরিয়েছিল রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে, যার চিহ্ন আজও রয়ে গেছে। শাসকরা ভয় পেয়েছিল, জানুয়ারির সেই আন্দোলনে হয়তো সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্বের অবসান ঘটবে। সাধারণ মানুষের হাতে শাসনক্ষমতা চলে আসবে। অভ্যুত্থানকারীরা তখন সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন, এই স্লোগান দিয়ে রাজপথ কাঁপিয়েছেন।
আন্দোলন চলাকালে মিসরের সেই সময়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান ওমর সুলায়মান বলেছিলেন, যদি সরকারের সঙ্গে বিপ্লবীদের ‘ডায়ালগের (সংলাপ) মাধ্যমে’ সংকটের সমাধান না হয়, তাহলে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটবে। কিন্তু বিপ্লবীরা তখন সামরিক বাহিনীকে হুমকি মনে না করে বন্ধু মনে করেছিলেন। মিসরের চরম দক্ষিণপন্থী থেকে অতি বাম–সবাই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সমীকরণকে গুরুত্ব দেয়নি, বরং একে গুরুত্বহীন মনে করেছে। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারককে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর জন্য কেবলমাত্র অস্ত্র ও সন্ত্রাসকে রেজিম পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে তারা। রাষ্ট্রকে দুর্বল করে শাসনপদ্ধতিকে উপড়ে ফেলার কথা বলেছেন। তারা সুস্পষ্টভাবে সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
পরিণামে, অবিস্মরণীয় এক বিপ্লবকে সর্বজনীন রাজনৈতিক রূপকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে পারেননি। এ কারণে ২০১১ সালের জানুয়ারি বিপ্লবের লক্ষ্য অর্জনে তারা ব্যর্থ হন। লক্ষ করলে দেখা যাবে, সাতটি ভুল করেছিলেন বিপ্লবীরা আর সেই ভুলের সুড়ঙ্গ পথে সামরিক শাসন পুনরায় মিসরে জেঁকে বসে।
এভাবেই বিদ্রোহের প্রথম মুহূর্ত থেকেই বিপ্লবীরা ভুলের গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাদের প্রথম ভুল ছিল, হোসনি মোবারকের পদত্যাগের পর ভবিষ্যতের কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ না করে বিপ্লবের কেন্দ্রস্থল তাহরির স্কয়ার ত্যাগ করা। সে সময় যদি বিদ্রোহীরা সেখানে থেকে যেতেন তাহলে পরবর্তী দৃশ্যপট ভিন্ন হতো। তখন যাদের হাতে ক্ষমতা, মিসরের সেই সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ পরিষদ লাখ লাখ মানুষের সামনে দাঁড়াতে সাহস করত না। আমার এখনও মনে আছে, বিভিন্ন সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি একমত না হয়েই কীভাবে তাহরির স্কয়ার ছেড়ে গেল!
তাহরির স্কয়ার ত্যাগ করার অগ্রভাগে ছিল মুসলিম ব্রাদারহুড। এর পর ডিপ স্টেটের সঙ্গে যেসব রাজনৈতিক দলের ঐতিহাসিকভাবে গভীর মিত্রতা ছিল, তারাও সেখান থেকে চলে যায়।
মূলকথা হলো, বিপ্লবীরাই চরম সুবিধাবাদী অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তাদের সবার নির্বিশেষ অভিমুখ ছিল মুবারকের শাসনব্যবস্থাকে উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করার দিকে। তারা তাড়াহুড়ো করে লুণ্ঠিত সম্পদ ভাগাভাগি করে আত্মসাৎ করেছিলেন।
সেই সময় যারা ক্ষমতার মালিক ছিলেন, তারা এই লুটপাটের ঘটনাকে ব্যবহার করে বিপ্লবীদের রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও গভীর করে তোলেন। সব দলের মধ্যে রাজনৈতিক যুদ্ধ-সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। সেই বিভাজন আজও রয়ে গেছে এবং শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য একে কাজে লাগাতে ক্রমশ পারদর্শী হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয় গুরুতর ভুল ছিল এমন একটি প্রকল্প প্রণয়নে ব্যর্থ হওয়া যেখানে সবাই অবদান রাখতে পারছেন, এমনটা মনে করতে না পারা। অথচ মুবারক-পরবর্তী যুগের জন্য এর ভীষণ প্রয়োজন ছিল।
মুবারকের পদত্যাগের পর বিপ্লবী শক্তিগুলো বৌদ্ধিক শূন্যতার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। তারা বুঝে উঠতে পারছিল নতুন কী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তারা সামনের দিকে এগোবেন। এ থেকেই তৃতীয় ভুলটা তারা করে।
দৃষ্টিভঙ্গির লক্ষ্যহীন শূন্যতার ফলে রাজনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ না করে তারা মতাদর্শ বা ‘আইডিলজি’ সম্পর্কে অনেক বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার মতো মৌলিক বিষয়গুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং তত্ত্বের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। বামপন্থীরা বাম-মতাদর্শে সমাধান দেখতে পাচ্ছিলেন, ইসলামপন্থীরা ইসলামি আদর্শে।
মৌলিক যেসব দাবি–স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র দৃশ্যপট থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। এর ফলে, চতুর্থ ভুলটি ঘটে। জনসাধারণকে প্রাণিত করতে পারে এরকম রাজনৈতিক ডিসকোর্সের অভাব দেখা দেয়। বিপ্লবী বা রাজনীতিকদের সক্রিয় ভূমিকার পরিবর্তে প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা বড়ো হয়ে ওঠে। এখন দেখা যাচ্ছে, মানে এই সময়ে দেখা যাচ্ছে, যা কিছু ঘটছে তার সবই ঘটছে শাসকগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান দমন-পীড়নের প্রতিক্রিয়ায়, এর বেশি নয়। রাজনীতি আটকে গেছে প্রতিক্রিয়ার চক্রে।
২০১১ সালের মিসরীয় জানুয়ারি বিপ্লব ছিল আসলে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্মূল করার জন্য বিরোধীরা ডিপ স্টেটের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গঠন করেছিল। ন্যাশনাল স্যালভেশন ফ্রন্ট দক্ষতার সঙ্গে এই ভূমিকা পালন করে। মুসলিম ব্রাদারহুডকে উৎখাত করা ছাড়া এর আর কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল না। মুবারক শাসনের একটা অংশ এবং ডিপ স্টেটের মিত্ররা এই ফ্রন্ট গঠন করেছিল।
গত পাঁচ বছরে রাজনৈতিক বিভাজন এবং নানা ভুলের কারণে বিরোধী দলগুলো নিজেরাই নিজেদের পরাজয় ডেকে এনেছেন। সেনাবাহিনী সেই সুযোগে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ এবং নির্বাচন না দিয়ে নিজেরই আবার ক্ষমতা দখল করে।
ষষ্ঠ ভুল ছিল, রাবা আল-আদাউইয়ার অবস্থান ধর্মঘট ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হলে ন্যূনতম প্রতিরোধ গড়ে না তোলা। বিরোধীরা শাসকগোষ্ঠীর এই বক্তব্যকে মেনে নিয়েছিল যে, অবস্থান ধর্মঘট রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। সামরিক বাহিনী এই প্রচারণা চালায় যে, মুসলিম ব্রাদারহুডের ক্ষমতা থাকলে তাদের নেতাদের ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা যেত না। এই প্রচারণা ছিল আসলে গণহত্যাকে ন্যায্যতা দেওয়ার ভূমিকা মাত্র। সবার চোখের সামনে সমাবেশ ছত্রভঙ্গের সরাসরি সম্প্রচার তখন শাসকগোষ্ঠীর হত্যাকাণ্ডের পথ প্রশস্ত করে। সমাজের মধ্যে সুপ্ত সহিংসতা তীব্রভাবে জমতে থাকে এবং সহিংসতা বহুমাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে।
সপ্তম ভুল হলো, ভুল স্বীকার না করে স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের দাবিকে সর্বজনীন করতে না পারার অক্ষমতা। গত পাঁচ বছরে রাজনৈতিক সংহতি ও আদর্শ, সমানাধিকার, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার হওয়া উচিত ছিল সব কিছুর ভিত্তি। কিন্তু তা হয়নি, বরং বিরোধীদের মধ্যেকার রাজনৈতিক বিভাজন গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।
এখন এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে বৃহত্তর পরিসরে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিষয়গুলোকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ জন্যই দরকার বিরোধে লিপ্ত পক্ষগুলোর মধ্যে জাতীয় পুনর্মিলন (ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন) অথবা সংঘাত নির্মূলের পথে হাঁটা। তবে সবার সম্মিলিত যৌথ দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা পরিচালিত গঠনমূলক সংলাপ (ডায়ালগ) ছাড়া এই সমস্যার সমাধান হবে না।
২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য যেমন আছে, তেমনি আছে ব্যর্থতাও। ব্যর্থতা হচ্ছে, মিসরীয় সমাজকে তা বিভাজিত করেছে। প্রজন্মগত ব্যবধান অনেক গভীর হয়েছে। সংগঠিত মধ্যবিত্ত বলতে তেমন কিছু নেই, অর্থাৎ এর অভাব ঘটেছে। সোস্যাল মিডিয়া বিভ্রম সৃষ্টি করেছে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্বও বেড়েছে। বিপ্লবের ঢেউ গণমানুষের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোকেও তছনছ করে দিয়েছে।
মিসরের গণঅভ্যুত্থান ছিল প্রকৃতপক্ষে রাজপথের আন্দোলন। কিন্তু এতে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক সমাজ হিসেবে রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারেনি। তবে এই আন্দোলন রাজনীতিকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। শিখিয়েছে, ভয়কেও জয় করা যায়। আরও ব্যর্থতা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো টেকসই পরিবর্তন ঘটেনি। রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র এলিটদের হাতেই রয়ে গেছে।
তরুণরা স্বপ্ন দেখিয়েছিল, কিন্তু তাদের এবং রাজনীতিকদের ভুলের কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবু বলব, এই আন্দোলন পুরোপুরি পরাজিত হয়নি আবার এর স্বপ্নদ্রষ্টারা যেমন আশা করেছিলেন, তেমন জয়লাভও ঘটেনি।
(সংক্ষেপিত)
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় এবং জার্মানির বার্লিন ফ্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি স্কলার। মিশরীয় গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন দলের মধ্যে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছিলেন
মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান
.jpg)
.jpg)
.jpg)