বাংলাদেশের ব্যবসা ও অর্থনীতির সামনে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সম্ভাবনার দরজা এখনো খোলা। প্রশ্ন শুধু একটাই- আমরা কি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুশাসনের মাধ্যমে সে দরজাটি সত্যিই খুলে দিতে পারব, নাকি আস্থার সংকটের ভারেই তা আবার বন্ধ হয়ে যাবে?...

বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তি ও সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। গত কয়েক দশকে দেশটি দারিদ্র্য হ্রাস, শিল্পায়ন ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় এবং কৃষি উৎপাদনের সমন্বয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা প্রভৃতি মিলিয়ে ব্যবসা পরিবেশে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। দেশের বড় পাইকারি বাজারগুলোর অনেক লেনদেন এখনো বিশ্বাস ও পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই পরিচালিত হয়। ব্যবসায়ীরা একে অপরের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে পণ্য কেনাবেচা করেন। সম্প্রতি নানা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সে আস্থার ভিত্তিই কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বা নতুন উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
অর্থনীতির ভেতরে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে এবং ঋণ পুনঃতপশিলের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে সমস্যাটি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে এবং প্রবৃদ্ধির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী একটি প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি থেকে নেমে প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক ইঙ্গিত।
বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো রাজনীতি ও ব্যবসার সম্পর্ক। অনেক বিশ্লেষকের মতে, গত কয়েক দশকে দেশে ব্যবসায়ী শ্রেণির রাজনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একটি বড় অংশই ব্যবসায়ী পেশার সঙ্গে যুক্ত। ফলে রাজনীতি ও ব্যবসার মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যা অনেক সময় অর্থনীতির জন্য ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অল্প কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বাজারের ওপর উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। বাজারে সিন্ডিকেট বা কারসাজির অভিযোগও মাঝেমধ্যে আলোচনায় আসে। এতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়ে। যখন বাজারে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা থাকে না, তখন ব্যবসা পরিবেশের সুস্থ বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।
রাজনৈতিক প্রভাব শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিনিয়োগ পরিবেশকেও প্রভাবিত করে। সাধারণত রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নির্বাচনি অনিশ্চয়তার সময় বিনিয়োগ কমে যায়। এটি অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হলে বড় বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা প্রায়ই একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবেশের ওপর জোর দেন।
এ বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে দেখা যায়, সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যবসা পরিবেশকে শক্তিশালী করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। বিনিয়োগকারীরা যখন নিশ্চিত হন যে নীতি হঠাৎ পরিবর্তিত হবে না এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ ও ন্যায্য হবে, তখন তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী হন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যবসাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র না বানিয়ে জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক চাপ বা অনিশ্চয়তা থেকে মুক্ত রেখে একটি ন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
তবে সংকটের এ আলোচনার মধ্যেও বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, বড় অভ্যন্তরীণ বাজার এবং উদ্যোক্তা সংস্কৃতির বিকাশ অর্থনীতির জন্য বড় শক্তি। ছোট পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করে সফল হওয়ার বহু উদাহরণ দেশে রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, উদ্যোক্তা সম্ভাবনা এখনো শক্তিশালী।
একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।
তবে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার। দ্বিতীয়ত, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- ব্যবসা ও রাজনীতির সম্পর্ককে এমনভাবে পরিচালনা করা যাতে অর্থনীতি শক্তিশালী হয়, দুর্বল না হয়।
অর্থনৈতিক চাপ শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধীর প্রবৃদ্ধি ও উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্যের হার আবার কিছুটা বেড়ে প্রায় ২১ শতাংশের বেশি হয়েছে।
উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে বাজারে চাহিদাও কমে যায়। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি কমে এবং শিল্প উৎপাদনও ধীর হয়ে পড়ে, যা আবার কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর প্রভাব ফেলে। এ চক্র অর্থনীতির সামগ্রিক গতিশীলতাকে দুর্বল করে দেয়।
বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত জানেন যে, অর্থনৈতিক নীতি হঠাৎ পরিবর্তিত হবে না। ফলে তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে পারেন।
উন্নত দেশগুলোতে ব্যাংকিং খাত, বিচারব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও স্বচ্ছ। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ পায়। এমনকি অনেক উন্নত অর্থনীতিতে বাজারে একচেটিয়া প্রভাব রোধ করতে শক্তিশালী প্রতিযোগিতা আইন রয়েছে। এর ফলে সিন্ডিকেট বা কারসাজির সুযোগ কমে যায়।
বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সুশাসন, নীতি-স্থিতিশীলতা এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুধু বাজারের ওপর নির্ভর করে না; তা নির্ভর করে রাষ্ট্রের নীতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সমাজের সামগ্রিক আস্থার ওপর। সে আস্থা যদি পুনর্গঠিত করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের ব্যবসা ও অর্থনীতির সামনে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সম্ভাবনার দরজা এখনো খোলা। প্রশ্ন শুধু একটাই- আমরা কি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুশাসনের মাধ্যমে সে দরজাটি সত্যিই খুলে দিতে পারব, নাকি আস্থার সংকটের ভারেই তা আবার বন্ধ হয়ে যাবে?
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]


