ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়ে ফিরে আসার রোমাঞ্চ হাইতির স্বপ্নসারথি ইসিদোর অবসর ভাবনায় কর্তোয়া ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু কানাডার কাতারের সামনে সুইজারল্যান্ড চ্যালেঞ্জ লুকিচের গোলে প্রথমার্ধে এগিয়ে বসনিয়া কানাডার বিশ্বকাপ বরণ অনুষ্ঠান মাতালেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সঞ্জয় ইনজুরিতে বিশ্বকাপ শেষ, ভাঙা হৃদয়ে অবসর ঘোষণা মৃত্যুকে হারিয়ে বিশ্বকাপ হিরো গিমেনেজ আর্জেন্টিনা শিবিরে বড় সুসংবাদ হঠাৎই অবসরে উইলিয়ামসন সিলেটের মাজারে দানের টাকার ‘বেহিসেবী’ ঘোচাতে চান ডিসি সারওয়ার বেলকুচিতে উদ্ভাবননির্ভর দেশ গঠনে বিজ্ঞান মেলা টাঙ্গাইলে এলএসডি ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন চলে গেলেন আধুনিক শিল্পের আইকন ডেভিড হকনি সনকে নিয়ে অস্বস্তিতে দক্ষিণ কোরিয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি এখন শেষ পর্যায়ে? পাকিস্তানের নতুন দাবি নাটকীয় সমাপ্তিতে ১৬ বছর পর চ্যাম্পিয়ন মোহামেডান মন্তব্য ঘিরে আইনি জটিলতা, মমতার বিরুদ্ধে মামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে ইরান: আরাঘচি সিলেটে ফাহিমা হত্যার ১ মাস পর চার্জশিট দিল পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়, ছয় লেন সড়ক, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন; প্রধানমন্ত্রীর কাছে কক্সবাজারবাসীর যত প্রত্যাশা হাম ও উপসর্গে মোট মৃত্যু ৬৪৩ আক্রান্ত ৮৪২৬৬ স্থায়ী নিয়োগসহ ছয় দফা দাবিতে রাজশাহীতে কর্মচারীদের সমাবেশ সোনারগাঁওয়ে আইফোনসহ ১৪৬ মোবাইল চুরি, প্রায় কোটি টাকা ক্ষতি শাহ আমানত বিমানবন্দরে ৬৪৭ কার্টুন সিগারেট জব্দ প্রথম ম্যাচে খেলা হচ্ছে না ডেভিসের নওগাঁয় দুইদিন মাইকিং করেও মেলেনি ব্রাজিল সমর্থক বর্তমান বাজেটে অর্থনৈতিক সংস্কারের সুযোগ নেই: নাহিদ ইসলাম উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন
Nagad desktop

ব্যবসাকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত রাখা জরুরি

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৪:০৬ পিএম
ব্যবসাকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত রাখা জরুরি
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

বাংলাদেশের ব্যবসা ও অর্থনীতির সামনে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সম্ভাবনার দরজা এখনো খোলা। প্রশ্ন শুধু একটাই- আমরা কি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুশাসনের মাধ্যমে সে দরজাটি সত্যিই খুলে দিতে পারব, নাকি আস্থার সংকটের ভারেই তা আবার বন্ধ হয়ে যাবে?...

বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তি ও সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। গত কয়েক দশকে দেশটি দারিদ্র্য হ্রাস, শিল্পায়ন ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় এবং কৃষি উৎপাদনের সমন্বয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা প্রভৃতি মিলিয়ে ব্যবসা পরিবেশে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। দেশের বড় পাইকারি বাজারগুলোর অনেক লেনদেন এখনো বিশ্বাস ও পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই পরিচালিত হয়। ব্যবসায়ীরা একে অপরের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে পণ্য কেনাবেচা করেন। সম্প্রতি নানা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সে আস্থার ভিত্তিই কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বা নতুন উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।

অর্থনীতির ভেতরে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে এবং ঋণ পুনঃতপশিলের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে সমস্যাটি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে এবং প্রবৃদ্ধির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী একটি প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি থেকে নেমে প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক ইঙ্গিত।

বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো রাজনীতি ও ব্যবসার সম্পর্ক। অনেক বিশ্লেষকের মতে, গত কয়েক দশকে দেশে ব্যবসায়ী শ্রেণির রাজনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একটি বড় অংশই ব্যবসায়ী পেশার সঙ্গে যুক্ত। ফলে রাজনীতি ও ব্যবসার মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যা অনেক সময় অর্থনীতির জন্য ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অল্প কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বাজারের ওপর উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। বাজারে সিন্ডিকেট বা কারসাজির অভিযোগও মাঝেমধ্যে আলোচনায় আসে। এতে প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়ে। যখন বাজারে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা থাকে না, তখন ব্যবসা পরিবেশের সুস্থ বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।

রাজনৈতিক প্রভাব শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিনিয়োগ পরিবেশকেও প্রভাবিত করে। সাধারণত রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নির্বাচনি অনিশ্চয়তার সময় বিনিয়োগ কমে যায়। এটি অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হলে বড় বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা প্রায়ই একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবেশের ওপর জোর দেন।

এ বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে দেখা যায়, সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যবসা পরিবেশকে শক্তিশালী করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। বিনিয়োগকারীরা যখন নিশ্চিত হন যে নীতি হঠাৎ পরিবর্তিত হবে না এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ ও ন্যায্য হবে, তখন তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী হন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যবসাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র না বানিয়ে জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক চাপ বা অনিশ্চয়তা থেকে মুক্ত রেখে একটি ন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

তবে সংকটের এ আলোচনার মধ্যেও বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, বড় অভ্যন্তরীণ বাজার এবং উদ্যোক্তা সংস্কৃতির বিকাশ অর্থনীতির জন্য বড় শক্তি। ছোট পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করে সফল হওয়ার বহু উদাহরণ দেশে রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, উদ্যোক্তা সম্ভাবনা এখনো শক্তিশালী।

একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।

তবে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার। দ্বিতীয়ত, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- ব্যবসা ও রাজনীতির সম্পর্ককে এমনভাবে পরিচালনা করা যাতে অর্থনীতি শক্তিশালী হয়, দুর্বল না হয়।

অর্থনৈতিক চাপ শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধীর প্রবৃদ্ধি ও উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্যের হার আবার কিছুটা বেড়ে প্রায় ২১ শতাংশের বেশি হয়েছে।

উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে বাজারে চাহিদাও কমে যায়। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি কমে এবং শিল্প উৎপাদনও ধীর হয়ে পড়ে, যা আবার কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর প্রভাব ফেলে। এ চক্র অর্থনীতির সামগ্রিক গতিশীলতাকে দুর্বল করে দেয়।

বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত জানেন যে, অর্থনৈতিক নীতি হঠাৎ পরিবর্তিত হবে না। ফলে তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে পারেন।

উন্নত দেশগুলোতে ব্যাংকিং খাত, বিচারব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও স্বচ্ছ। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ পায়। এমনকি অনেক উন্নত অর্থনীতিতে বাজারে একচেটিয়া প্রভাব রোধ করতে শক্তিশালী প্রতিযোগিতা আইন রয়েছে। এর ফলে সিন্ডিকেট বা কারসাজির সুযোগ কমে যায়।

বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সুশাসন, নীতি-স্থিতিশীলতা এবং স্পষ্ট রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুধু বাজারের ওপর নির্ভর করে না; তা নির্ভর করে রাষ্ট্রের নীতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সমাজের সামগ্রিক আস্থার ওপর। সে আস্থা যদি পুনর্গঠিত করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের ব্যবসা ও অর্থনীতির সামনে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সম্ভাবনার দরজা এখনো খোলা। প্রশ্ন শুধু একটাই- আমরা কি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুশাসনের মাধ্যমে সে দরজাটি সত্যিই খুলে দিতে পারব, নাকি আস্থার সংকটের ভারেই তা আবার বন্ধ হয়ে যাবে?

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

শিশুর জন্য বাজেট, দেশের জন্য বিনিয়োগ

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম
শিশুর জন্য বাজেট, দেশের জন্য বিনিয়োগ
দীপু মাহমুদ

শিশুদের জন্য বরাদ্দ কোনো অনুগ্রহ নয়, কোনো দয়া নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক সামাজিক দায়বদ্ধতাও নয়। এটা হচ্ছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগ। আর যে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগের গুরুত্ব বোঝে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আসন্ন বাজেটের আলোচনায় তাই শিশুদের আর প্রান্তে রাখা যাবে না। কারণ যাদের হাতে আগামী বাংলাদেশের দায়িত্ব থাকবে, তাদের জন্য বরাদ্দই আদতে ভবিষ্যতের জন্য বরাদ্দ।...

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে কৃষক আছেন, ব্যবসায়ী আছেন, শিল্পোদ্যোক্তা আছেন, সরকারি চাকরিজীবী আছেন, পেনশনভোগী আছেন। বাজেট ঘোষণার আগে তাদের সংগঠনগুলো দাবি জানায়, সংবাদ সম্মেলন করে, স্মারকলিপি দেয়, নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করে। বাজেট-পরবর্তী আলোচনাতেও তাদের লাভক্ষতি নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ হয়। কিন্তু একটি বড় জনগোষ্ঠী আছে, যারা এসব আলোচনায় প্রায় অনুপস্থিত। তারা দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। তারা ভোট দেয় না, কর দেয় না, সংগঠিত চাপ তৈরি করতে পারে না। তাই রাজনৈতিক আলোচনার টেবিলেও তাদের জন্য আলাদা চেয়ার থাকে না। তারা বাংলাদেশের শিশু।

কথাটি কঠোর শোনাতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হলো বাজেট কেবল অর্থনৈতিক দলিল নয়, এটা রাজনৈতিক দলিলও। রাষ্ট্র কাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কাদের প্রয়োজনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে এবং ভবিষ্যৎকে কীভাবে কল্পনা করছে–তার প্রতিফলন ঘটে বাজেটে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাংলাদেশের শিশুদের অবস্থান এক ধরনের বৈপরীত্যের জন্ম দেয়। কারণ যাদের ওপর সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করার কথা, তারা প্রায়ই সবচেয়ে কম দৃশ্যমান।

এখানে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা প্রয়োজন। শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ–এই বাক্যটি আমরা এত বেশি শুনেছি যে অনেক সময় এর গভীরতা অনুভব করি না। কিন্তু অর্থনীতির ভাষায় এর অর্থ অত্যন্ত বাস্তব। আজ যে শিশু জন্ম নিচ্ছে, সে ২০ বছর পরে শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে, ২৫ বছর পরে কর দেবে, ৩০ বছর পরে অর্থনীতির উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত হবে। অর্থাৎ একটি দেশের আগামী তিন-চার দশকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নির্ভর করছে আজকের শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি ও সুরক্ষার ওপর। বিশ্বব্যাপী মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, তার প্রায় সবই একটি বিষয়ে একমত–শৈশবে বিনিয়োগের চেয়ে বেশি মুনাফা আর কোনো সামাজিক বিনিয়োগে পাওয়া যায় না। একজন শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা, তাকে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলও। যে রাষ্ট্র এ কথা বুঝতে পারে, সে রাষ্ট্র উন্নয়নের ভিত্তি মজবুত করে। যে রাষ্ট্র এটা উপেক্ষা করে, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির ভিত দুর্বল করে।

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিশু উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বব্যাপী প্রশংসা পেয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বেড়েছে, মেয়েদের শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এসব অর্জনের আড়ালে এখনো বহু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অপুষ্টি, শিক্ষার মানের সংকট, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, প্রতিবন্ধী শিশুদের বঞ্চনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত–এসব সমস্যা এখনো লাখো শিশুর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে রাখছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিশুদের জন্য ব্যয়কে আমরা প্রায়ই খরচ হিসেবে দেখি, বিনিয়োগ হিসেবে নয়। একটি সেতু নির্মাণের বরাদ্দ সহজেই দৃশ্যমান হয়। একটি উড়ালসড়ক চোখে পড়ে। কিন্তু একজন শিশুর পুষ্টি উন্নত হওয়া বা শেখার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। ফলে রাজনৈতিকভাবেও এসব খাত অনেক সময় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায় না। অথচ দীর্ঘমেয়াদে একটি সেতুর চেয়েও মূল্যবান হতে পারে একটি সুস্থ, দক্ষ ও শিক্ষিত প্রজন্ম।

বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক সুযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি। এই সুযোগকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে আগামী প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার বিকল্প নেই। কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদ বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হয় না, তার ভিত্তি গড়ে ওঠে জন্মের পর থেকেই। জীবনের প্রথম এক হাজার দিন, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেখার পরিবেশ–এসবই পরবর্তী জীবনের সক্ষমতা নির্ধারণ করে।

একজন অপুষ্ট শিশুর শেখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। একজন শিক্ষাবঞ্চিত শিশু পরবর্তী সময়ে দক্ষ কর্মী হয়ে উঠতে পারে না। একজন সুরক্ষাহীন শিশু সহিংসতা, শোষণ বা সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে পারে। অর্থাৎ শিশুদের প্রতি অবহেলা শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতির ওপরই বোঝা হয়ে ফিরে আসে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গেও শিশুদের কথা নতুন করে ভাবতে হবে। বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভব করে শিশুরাই। একটি বন্যা শুধু ফসল নষ্ট করে না, শিশুর স্কুল বন্ধ করে দেয়, অপুষ্টি বাড়ায়, রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে এবং অনেক পরিবারকে এমন সংকটে ফেলে, যেখানে শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে জাতীয় পরিকল্পনায় তাই শিশুবান্ধব বিনিয়োগকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। মূল্যস্ফীতির সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। আর সেই পরিবারের শিশুরাই প্রথমে পুষ্টিকর খাবার হারায়, শিক্ষার সুযোগ হারায়, স্বাস্থ্যসেবার বাইরে চলে যায়। তাই শিশুকেন্দ্রিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে কেবল কল্যাণমূলক প্রকল্প হিসেবে নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো জবাবদিহি। শিশুদের জন্য কত টাকা বরাদ্দ হচ্ছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে। বরাদ্দকৃত অর্থ প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, কর্মসূচিগুলো প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে কি না এবং কোন খাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে–এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। শিশুবান্ধব বাজেটের অর্থ কেবল বেশি বরাদ্দ নয় বরং আরও কার্যকর, আরও লক্ষ্যভিত্তিক এবং আরও জবাবদিহিমূলক ব্যয়।

এখানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজেরও দায়িত্ব আছে। কারণ শিশু নিয়ে প্রশ্ন কেবল নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়, স্থানীয় সরকারের বিষয়, পরিবেশ নীতির বিষয় এবং সর্বোপরি জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের বিষয়। শিশুদের প্রান্তিক কোনো ইস্যু হিসেবে দেখার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।

জাতীয় বাজেট শেষ পর্যন্ত একটি নৈতিক দলিলও বটে। এই দলিল বলে দেয় রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী ভাবছে। একটি সমাজ তার সবচেয়ে শক্তিশালী নাগরিকদের জন্য কত ব্যয় করছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের জন্য কী করছে। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল প্রবৃদ্ধির হার নয়, উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো সেই উন্নয়ন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যৎমুখী।

বাংলাদেশ যখন উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তখন সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে শিশুদের স্থান দিতে হবে। কারণ আগামী দিনের বাংলাদেশ কোনো সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে না, কোনো ভবনের ওপরও নয়। আগামী দিনের বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে থাকবে আজকের শিশুদের কাঁধে। সে কারণেই শিশুদের জন্য বরাদ্দ কোনো অনুগ্রহ নয়, কোনো দয়া নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক সামাজিক দায়বদ্ধতাও নয়। এটা হচ্ছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগ। আর যে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগের গুরুত্ব বোঝে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

আসন্ন বাজেটের আলোচনায় তাই শিশুদের আর প্রান্তে রাখা যাবে না। কারণ যাদের হাতে আগামী বাংলাদেশের দায়িত্ব থাকবে, তাদের জন্য বরাদ্দই আদতে ভবিষ্যতের জন্য বরাদ্দ।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পুনর্বিন্যাস জরুরি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম
মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পুনর্বিন্যাস জরুরি
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

মানবসম্পদ উন্নয়নের দুটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হচ্ছে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্য। একটি অপরটির পরিপূরক এবং দুটোই সত্যিকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দ্রুত আধুনিকীকরণ, উন্নত প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকতর পেশাদারত্ব, নৈতিকতা এবং বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।...

উন্নয়ন বলতে প্রবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বাইরে মানুষের সব পার্থিব এবং অপার্থিব চাহিদা পূরণও বোঝায়। অতএব, এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা হচ্ছে এবং তার দরকার আছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ১৯৭০ সালের শেষের দিকে মানুষের কতগুলো মৌলিক চাহিদা নির্ধারণ করেছে। খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য; সেটা আরও সম্প্রসারিত হয়ে এখন মৌলিক চাহিদা বলতে আমরা খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য; সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি, নির্মল বাতাস এবং সার্বিকভাবে সুস্থ পরিবেশ। সার্বিক উন্নয়নের জন্য শুধু ব্যক্তিগত প্রয়াসই যথেষ্ট নয়, সরকারের বিভিন্ন সহায়তা ও কার্যক্রম অত্যাবশ্যক।  এ যাবৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে যেভাবে শিক্ষাকে মূল্যায়ন করা হয়, জনগণের স্বাস্থ্য এবং সঠিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। উন্নয়নের সূচকে স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশক যা-ই থাকুক, কোভিড-১৯ এর পর আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছি সার্বিক উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন কতটা দরকার। এটি পরিষ্কার হয়ে গেছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা যদি ঠিক না থাকে, সামগ্রিক উন্নয়ন তখন ব্যাহত হয়ে যায়। এর আরেকটা প্রভাব রয়েছে, যা আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। সেটা হলো, স্বাস্থ্য খারাপ হলে মানুষের উৎপাদনশীলতা ও সৃজনশীলতা হারিয়ে যায়। সুতরাং দুই দিক দিয়েই স্বাস্থ্য মূল্যবান।

মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষার ভূমিকা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়, গবেষণা হয়। প্রায়ই শিক্ষার গুণগত মান, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, শিক্ষার উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয় আলোচনা হয়। যখন মানবসম্পদের প্রসঙ্গ আসে, তখন মানবপুঁজি (হিউম্যান ক্যাপিটাল) বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার যে সমস্যাটি চোখে পড়ার মতো, তা হলো স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রের ভূমিকা ধীরে ধীরে কমে যাওয়া। প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকারের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়। অর্থাৎ এটা রাষ্ট্রের বিশেষ কর্তব্য। পৃথিবীর সব দেশেই এ বাধ্যবাধকতা থাকে; কিন্তু বাধ্যবাধকতা থাকার পরও এ বিষয়টিকে আমরা বাস্তবে বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারিনি।

এজন্য আমাদের প্রথম কাজ হলো পাবলিক হেলথ সিস্টেমটিকে উন্নত ও সহজলভ্য করা। অথচ আস্তে আস্তে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভূমিকা হ্রাস পাচ্ছে এবং বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। দেশে স্বাস্থ্য খাতের আরেকটা সমস্যা হলো আমাদের ভালো ওয়ার্ক ফোর্স নেই। ডাক্তার, নার্স, হেলথ টেকনিশিয়ান, প্যারামেডিকস অনেক কম। ফার্মাসিস্টদের ভূমিকাও দেখা যায় না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ডাক্তারদের মূল ভূমিকা হচ্ছে, প্রথমে রোগ ডায়াগনোসিস করা এবং প্রতিরোধ ও নিরাময়ের জন্য নির্দেশনা ব্যবস্থা নেওয়া। বাকি আনুষঙ্গিক কাজগুলো হলো সহযোগী বা পরিপূরক কাজ। সেসব দেশে অপারেশন করার পর সার্জনরা চলে যান। পরে প্যারামেডিকস ও নার্সরাই তার কেয়ার নেন। কিন্তু আমাদের এখানে, বিশেষ করে আমাদের চিকিৎসকের অনুপাত অনুযায়ী স্বাস্থ্য সহযোগীর সংখ্যা খুব কম। স্থানীয় পর্যায়ে আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন (রেভল্যুশন) করিনি। স্বাস্থ্য খাতটা একেবারেই কেন্দ্রীভূত। সবকিছু কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সিভিল সার্জন দায়িত্ব পালন করেন। সিভিল সার্জনের তেমন কোনো ভূমিকা নেই, শুধু প্রশাসনিক ব্যাপার ছাড়া। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য খাত বিকেন্দ্রীকরণ না হলে, একেবারে ইউনিয়ন পর্যন্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত উন্নতি হবে না। শ্রমের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ এর গভীরে অনেকেই যায় না। মনে রাখা দরকার, মানবপুঁজির দুটি দিক রয়েছে- এক. শিক্ষাপুঁজি এবং দুই. স্বাস্থ্যপুঁজি। তাই মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, যা আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে নানা প্রভাব ফেলে; কিন্তু উন্নয়ন ইস্যুতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ভূমিকার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দুটিই সমানভাবে ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর যেসব দেশে উন্নয়ন হয়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে এশিয়ার চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এসব দেশে দেখা যায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দুটি খাতেই তারা অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

মূল সমস্যাটি হলো দুর্নীতি। এ খাতে দুর্নীতিটা বেশি হচ্ছে। যখন কোনো কিছুর কেন্দ্রীকরণ হয়; তখন নানা রকম কেনাকাটা হয়। অনেক সময় যে জিনিসটা যে জায়গায় দরকার সেটাও ঠিকমতো হয় না। বরগুনার একটি উপজেলায় যে জিনিসটার দরকার, দিনাজপুরের একটি উপজেলায় একই জিনিস না-ও লাগতে পারে; কিন্তু এখানে ঢালাওভাবে কেনাকাটা করা হয়। ফলে অনেক সময় কেনা জিনিস পড়ে থাকে। এ কেন্দ্রীকরণের সুযোগেই স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অপচয় বেশি হয়। দ্রুত কোভিড মহামারি থেকে উত্তরণের পথে অবশ্যই উপরোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি সবার নজর দিতে হবে। বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় হলো স্বাস্থ্য খাতের আর্থিক সম্পদ। 

আমাদের আরেকটা সমস্যা হলো দুর্বল স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা। এ সমস্যাটা আমরা এবার খুব বেশি টের পাচ্ছি। করোনা মহামারিতে দেখা গেল, সরকারি সংস্থা থেকে দেওয়া তথ্য অনেক সময় অসম্পূর্ণ। তথ্যগুলো আপডেটও থাকে না। যারা ব্রিফ করেন, তারাও ততটা আপডেট থাকেন না। এ ছাড়া এখানে তথ্য সংগ্রহ থেকে সরবরাহ পর্যন্ত সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় স্বাস্থ্য তথ্যের ওপর মানুষের আস্থাও কম। আমাদের দরকার যথাযথ ও সুষ্ঠু তথ্য ব্যবস্থা এবং ধারাবাহিকতা। মানে, আপনি ছয় মাস পর একটা তথ্য দিলেন, ওটাও অসম্পূর্ণ, অতএব সেটা দিয়ে তেমন কাজ হবে না।

সব সমস্যার কারণগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক অঙ্গীকার। আমরা কিন্তু মুখে মুখে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করি। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, পাবলিক-প্রাইভেট স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সুষ্ঠু মনিটরিং নেই। স্বাস্থ্য সমস্যা ও চিকিৎসার ব্যয়কে আমরা অর্থনীতিতে বলি ইনকাম ইরোডিং ফ্যাক্টর (আয়বিনাশী কারণ), যা দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নিয়ে যায়। বাংলাদেশে এটা মারাত্মক হয়ে উঠেছে। মধ্যবিত্ত, এমনকি উচ্চমধ্যবিত্ত যে কেউ যদি একটা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়, তাহলে অর্থকষ্টে ঘটিবাটি, বাড়িঘর বেচে দেওয়ার ফাঁদে পড়ে যায়।

আমরা যদি স্বাস্থ্য খাত ঠিক না করি, তাহলে অর্থনীতি ও সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্য খাত ঠিক করতে হলে, বিশেষ করে সাতটা জিনিসের ওপর জোর দিতে হবে। একটা হলো স্বাস্থ্যসেবার ডেলিভারি সিস্টেম বা স্বাস্থ্যসেবা যথাযথভাবে উন্নত করা। দ্বিতীয়ত, সঠিক লোকবল বা জানাশোনা লোক নিয়োগ। এ ছাড়া তথ্য ব্যবস্থাপনাকে যথাযথভাবে ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, ইকুইটেবল অ্যাকসেস ধনী-গরিবনির্বিশেষে চিকিৎসার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দেশেও বড়লোকরা বেশি চিকিৎসা পায়, তাদের জন্য কেবিন রিজার্ভ রাখা, আইসিইউ রিজার্ভ রাখা, তাদের আলাদা হাসপাতালে নেওয়া এগুলো দুঃখজনক। আবার তারা বিদেশেও চলে যায়। এগুলো দূর করতে হবে। চতুর্থত, স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন তথা বাজেটে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, সুষ্ঠু স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং ষষ্ঠত, স্বাস্থ্য খাতে গুড লিডারশিপ নিয়ে আসতে হবে। 

মানবসম্পদ উন্নয়নের দুটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হচ্ছে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্য। একটি অপরটির পরিপূরক এবং দুটোই সত্যিকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দ্রুত আধুনিকীকরণ, উন্নত প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকতর পেশাদারত্ব, নৈতিকতা এবং বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে দুর্নীতি করলে অতি দ্রুত, দৃশ্যমান এবং শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এ সাতটি বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে। এগুলো করতে পারলে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভালো হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশে সর্বজনীন আর্থ-সামাজিক উন্নতি হবে এবং আমাদের দেশ দ্রুত সামনে এগিয়ে যাবে।

লেখক: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের বাস্তবতা

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের বাস্তবতা
ড. লিপন মুস্তাফিজ

এপ্রিলে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এটি শুধু বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও একটি সংকেত। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে এই মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।...

দেশের একটি স্বনামধন্য দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান চাপের ইঙ্গিত বহন করছে। এটা একটা দেশের অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। যদিও আমরা জানি যে আমাদের দেশের নতুন সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। তবুও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি। এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছানো শুধু একটি পরিসংখ্যানগত তথ্য নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের প্রতিফলন। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে। ফলে মূল্যস্ফীতির সামান্য বৃদ্ধি হলেও তাদের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

এর আগে আমাদের সবার জানা দরকার মূল্যস্ফীতি বলতে আমরা কী বুঝি? সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে মাঝে মাঝে বিপাকে পড়েন। মূল্যস্ফীতি বলতে বোঝায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য ও সেবার গড় মূল্যস্তরের বৃদ্ধি। যখন মূল্যস্ফীতি বাড়ে, তখন মানুষের হাতে থাকা অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ, একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা ক্রয় করা সম্ভব হয়। এপ্রিলে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি মানে হলো, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গড়পড়তা পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে মানুষের আয় অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে জীবনযাত্রার মান ধীরে ধীরে নেমে আসে। এই মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে খাদ্যপণ্যের ওপর। চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, সবজি, মাছ ও মাংসের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। কিছুদিন আগে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এক লাফে সবকিছুর দাম বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে কোনো খবর চাপা থাকে না। ফলে গ্রামগঞ্জেও এর প্রভাব পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় আগের দামে কেনা পণ্যের দাম হুট করেই বেড়ে যায়। আবার কোনো কোনো স্থান ভেদে একই পণ্য কমবেশি দামে বিক্রি করে। দুই দিন আগে আমি ইস্কাটনে একটা নরমাল হোটেলে মোগলাই অর্ডার করি, যার দাম ছিল ৯০ টাকা। ঠিক একদিন পরে বারডেম হাসপাতালে রোগী দেখার জন্য গিয়ে সেখানে ছাদের ওপরের রেস্টুরেন্টে মোগলাই খেলাম ১২০ টাকা দিয়ে। একই জিনিস স্থানভেদে আমাকে ৩০ টাকা বেশি খেতে হলো। এই চাপ বা অতিরিক্ত খরচ আমি না হয় সামাল দিলাম কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষ কী করবে। তাদের কি মোগলাই খেতে ইচ্ছে করবে না? তারা কি মাসে একবার গোশত খাবে না? নেবে না ইলিশের সুবাস? বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য খাদ্যব্যয়ের চাপ অসহনীয় হয়ে উঠছে। অনেক পরিবার তাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা থেকে পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইদানীং পে-স্কেলের কথা শোনা যায় পত্রপত্রিকার মাধ্যমে। তখন যদি বেতন বৃদ্ধি পায় তাহলে আরেক দফায় পণ্য ও সেবার দাম বাড়বে বৈ কমবে না। আগামী অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আলোচনা চলছে। সুতরাং বাজেট ঘোষণার পরে আবারও পণ্যের দাম বাড়বেই। তখন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কী করবে? কীভাবে জীবন ধারণ করবে।

গ্রামাঞ্চল থেকে শহর–সব জায়গাতেই এ প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একজন নিম্ন আয়ের শ্রমিকের উদাহরণ ধরা যেতে পারে। আগে যে আয় দিয়ে একটি পরিবার মাসের পুরো সময় স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারত, এখন সেই একই আয় দিয়ে মাসের মাঝামাঝি সময়েই টান পড়ছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে কম দামে নিম্নমানের খাদ্য কিনছে বা ঋণের ওপর নির্ভর করছে। এই বাস্তবতা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং লাখো মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। শুধু খাদ্যপণ্যই নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য খাতেও মূল্যস্ফীতির প্রভাব স্পষ্ট। বাসাভাড়া, পরিবহন খরচ, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় সবকিছুই ধীরে ধীরে বাড়ছে। ফলে একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এর ফলে মানুষের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানুষ ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি একটি বড় কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, গম এবং ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। যখন টাকার মান কমে যায়, তখন একই পণ্য আমদানি করতে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। এই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপ হিসেবে পড়ে। অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মূল্যস্ফীতিকে আরও ত্বরান্বিত করে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, মজুতদারি এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন যে বইয়ের শেখা থিওরির সঙ্গে মেলাতে পারি না। এই উচ্চমূল্যস্ফীতি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তখন বাজারে চাহিদা হ্রাস পায়। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, কারণ তাদের পণ্যের বিক্রি কমে যায়। অন্যদিকে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও চাপে পড়ে, যা বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও মূল্যস্ফীতি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশই বর্তমানে উচ্চমূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করছে। তবে উন্নত দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই সুরক্ষাব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় প্রভাবটা বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হয়।

নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন। তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে ব্যয় হয়। ফলে পণ্যের দাম বাড়লে তারা অন্য প্রয়োজনীয় খাতে খরচ কমাতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা চিকিৎসা বা শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও ব্যয় কমিয়ে দেয়। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন ব্যাহত হয় এবং দারিদ্র্যের চক্র আরও গভীর হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে যাতে কোনো ধরনের মজুতদারি বা কৃত্রিমসংকট সৃষ্টি না হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে আমদানি সহজ করতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মুদ্রানীতি কঠোর করা, সুদের হার সমন্বয় এবং বাজারে অতিরিক্ত তারল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে এসব পদক্ষেপ গ্রহণের সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেন ব্যাহত না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণই এখানে সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, এপ্রিলে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এটি শুধু বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও একটি সংকেত। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে এই মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আশার কথা হলো, সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। সরকার, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ সবাই যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তাহলে মূল্যস্ফীতির এই চাপ কমিয়ে একটি স্থিতিশীল, সহনশীল এবং টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট

খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে সাধারণ জনগণ

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে সাধারণ জনগণ
আবু আহমেদ

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু আয়কর রিটার্ন দিচ্ছে না, ফাইভ স্টার হোটেলে ডিনার করছে, অথচ কর দিচ্ছে না, কোম্পানির ডিভিডেন্ট দেয় না, অথচ ওই কোম্পানির এমডি পাজেরো গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ান, তাদের জরিমানাসহ করের আওতায় আনতে হবে। সরকারের আয়-ব্যয়ের সমন্বয়হীন অসম আকার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবেই। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সংস্কার, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।...

আগামী বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে। এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের আয় বাড়াতে হবে। এনবিআরের রাজস্বের আওতা ও লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক-কর-ভ্যাট আরোপ করতে হবে। এতে অনেক পণ্যের দাম বাড়বে। সেবা খাতের  খরচ বাড়বে। যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে। এখনই সাধারণ মানুষ খরচের চাপে আছে। আরও খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে।

রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থসংকটে নিয়মিত খরচ চালিয়ে যাওয়াও সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আগামী বাজেটে খরচ কমানোর প্রত্যাশা করলেও তা বাস্তবায়ন হবে না। বরং বাজেটে সরকার আয় বাড়াতে গিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অনেক জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যবসাবাণিজ্য, শিল্প খাতে খরচ বাড়বে। এরই মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। অন্যদিকে নতুন অর্থবছরে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অন্য সব বাদ দিয়ে শুধু এই দুই কারণেই অনেক কিছুর দাম ও খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এ সবকিছুই জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে ফেলবে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক-কর-ভ্যাটের কারণে বিভিন্ন নিত্যপণের দাম বাড়বে। চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ বাড়বে। শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়বে। আমদানি করা পণ্যের দামও বাড়বে। দেশি পোশাকের দাম বাড়বে। ঠিকাদার ব্যবসায়ের লাইসেন্স ফি বাড়বে। বাজেটে চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্য তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি পর্যায়ে উৎসে কর কিছুটা কমিয়ে বহাল থাকছে। আমদানিকারকরা এই বহাল থাকা করের অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে রাখার সুযোগ পেতে পারেন। এমনও জানা যাচ্ছে যে, আগামী বাজেটে তামাকপণ্যের দাম বাড়বে। কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোয় দেশে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়বে। এমনকি আমদানি করা গুঁড়া দুধ, মাছ ও শুকনা ফলের দাম বাড়বে।

মোটরসাইকেল উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান রাজস্ব বহাল থাকলেও উচ্চ সিসির সম্পূর্ণ মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্ক হার বাড়বে। এতে আমদানি করা বেশি সিসির মোটরসাইকেলের দাম বাড়বে। অন্যদিকে আসন্ন বাজেটে আমদানিকৃত প্লাস্টিক পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। পার্লারের খরচ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনে চলাচল খরচও আসন্ন বাজেটে বেশি থাকবে। আগামী বাজেটে দেশে শিল্প খাতে ব্যবহৃত অনেক কাঁচামালের আমদানি নিরুৎসাহিত করা হবে। বিশেষভাবে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, লোহার রড, স্ক্র্যাব, টেক্সটাইল, চামড়া খাত, পাটশিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হবে। দেশি গরুর দুধ, মসলা ও দেশি শিল্পে বানানো খেলনার দাম বাড়বে না।

আবার, দেশে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, তারল্যসংকট, দেউলিয়া বা অস্তিত্বের জন্য হুমকি, এমন সব ঝুঁকির সময়োপযোগী সমাধান এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে ইতোমধ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। বিগত সময়ে আর্থিক খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে। নজিরবিহীন অপশাসনের মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে প্রায় ধ্বংসের মধ্যে ফেলে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছিল। ব্যাংকগুলো লুটপাটের কারণেই আর্থিক খাতের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের পুঁজিবাজারেও। দেশ থেকে প্রচুর টাকা পাচার হয়েছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র এখন সামনে আসতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালের জুনে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ২০ শতাংশে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এ ব্যাংকগুলোকে প্রায় শেষ করে দিয়েছে মাফিয়া গ্রুপ। এ সরকারের সময় আর সেই সুযোগ নেই। এদের বিচারের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারকে সংস্কারের দিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করে ভালো কিছু আশা করা যায় না। আমাদের রাজস্ব বাজেটের আকার বেড়েছে, যা এডিপির তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ। রাজস্ব নিয়ে আমাদের আগে থেকেই আরও চিন্তাভাবনা করা উচিত ছিল। আগের সরকার নির্বাচনের নামে নানারকম প্রহসন করেছে। ফলে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কাজেই গণতন্ত্রের নামে আমরা এখনো যদি বিভাজন করি, তাহলে কোনোভাবেই সামনে এগোনো সম্ভব নয়। দেশে বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলেই ব্যবসা ও বিনিয়োগ সৃষ্টিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পাবেন। কৃষকের জন্য কোনো কিছুর ভর্তুকি দেওয়ার উদ্যোগ খুবই ভালো দিক।

শেয়ারবাজারকে পুনরায় চাঙা করে তুলতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির মধ্যকার করপোরেট করহারের ব্যবধান বৃদ্ধি এবং ব্রোকারেজ হাউসের লেনদেনের ওপর ধার্য কর কমানো। এসব প্রণোদনার সুবিধাভোগী শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরাসরি বিনিয়োগকারীরা কোনো সুবিধা পাবেন না। যদিও বাজেটের আগে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ আয় থেকে শুরু করে মূলধন মুনাফার ওপর থেকে কর প্রত্যাহারে জন্য দাবি জানানো হয়েছিল। আমরা যে বাজেট প্রণয়ন করি, তার ৭০ শতাংশই রাজস্ব বাজেট। এর কারণ হলো, আমাদের অর্থনীতির তুলনায় বিশাল আকারের সরকার নিয়ে আমরা বসে আছি। এখন এ বিশাল আকারের সরকারকে চালাতে হলে জনগণকে কর দিতে হবে। সরকার দক্ষ না হলে দেশের অর্থনীতিতে গতি আসবে না। বড় অর্থনীতির দেশ অথচ সরকারের পরিধি অনেক ছোট, এমন অনেক দেশ আছে। তারা পারছে, কাজেই আমাদেরও সেটা পারতে হবে। বাজারে কোনো কোম্পানি যখন লাভ করতে পারছে না, সেটাকে ভর্তুকি দিয়ে টিকিয়ে রাখার কোনো দরকার নেই। একটা লোকসানি শিল্পকে কেন সরকারের মধ্যে রাখতে হবে?

কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আমরা বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছি। যতদিন এ ভর্তুকির সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারব, ততদিন আমাদের অর্থনৈতিক দৈন্য থেকেই যাবে। আর এসব কারণেই আমরা কর সংগ্রহ যতটুকুই করি, খরচটা অপব্যয় হচ্ছে এবং সেটা রোধ করতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে যে ক্ষেত্রগুলো করহারের অধীনে আসেনি সেগুলোকে করহারের আওতায় আনতে হবে। সে ক্ষেত্রে অটোমেশনে যেতে হবে। যাদের ঢাকা শহরে অনেক বাড়ি আছে, অথচ তারা সরকারকে কর ফাঁকি দিচ্ছে। এ রকম উদাহরণ বহু আছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু আয়কর রিটার্ন দিচ্ছে না, ফাইভ স্টার হোটেলে ডিনার করছে, অথচ কর দিচ্ছে না, কোম্পানির ডিভিডেন্ট দেয় না, অথচ ওই কোম্পানির এমডি পাজেরো গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ান, তাদের জরিমানাসহ করের আওতায় আনতে হবে। সরকারের আয়-ব্যয়ের সমন্বয়হীন অসম আকার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবেই। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সংস্কার, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। 

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান, আইসিবি 

গণতন্ত্রমুখী বাজেট ও প্রত্যাশার সমীকরণ

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:১০ পিএম
গণতন্ত্রমুখী বাজেট ও প্রত্যাশার সমীকরণ
ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল

কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য–এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই এবারের বাজেট একটি নতুন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করতে পারে। কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই এই গণতন্ত্রমুখী বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে না, সমান্তরালে সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারও নিশ্চিত করতে হবে। স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং জবাবদিহিহীন যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা উপড়ে ফেলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।...

অতীতে দেশের অর্থনীতি যে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা এবং বাহ্যিক চাকচিক্য প্রদর্শনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, তা সবার জানা। স্বৈরাচারী সরকারের আমলে গৃহীত উচ্চাভিলাষী, মেগা-প্রকল্পনির্ভর এবং খাতাকলমে বড় জিডিপি প্রবৃদ্ধির বাজেটগুলো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও নেতিবাচক ধস নামিয়েছিল। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ-সংকট এবং ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর দশা তারই অকাট্য প্রমাণ। বিভিন্ন সূত্রের আভাসে জানা গেছে, এবারের বাজেট হতে যাচ্ছে ‘গণতন্ত্রমুখী’। সাম্যবাদী বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় ‘গণতন্ত্রমুখী বাজেট’ ধারণাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও অপরিহার্য।

গণতন্ত্রমুখী বাজেট বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক দর্শনকে বোঝায়–যেখানে বাজেটের কেন্দ্রে থাকে সাধারণ নাগরিক। এতকাল ধরে যে ‘টপ-ডাউন’ অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করা হয়েছে, তার অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল মানুষের অধিকার ও চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়াই এ বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে। স্বৈরাচারী কাঠামোর প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল কতিপয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পকেট ভারী করা এবং এমন কিছু দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরি করা, যা সাধারণ মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে খুব কমই অবদান রাখে। এর ফলে সমাজে তৈরি হয়েছে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য।

বাজেটকে শুধু মুখে ‘গণতন্ত্রমুখী’ বললেই হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট খাতের পুনর্বিন্যাস এবং কাঠামোগত সংস্কার। একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্ত হয় তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের ওপর। আর এ অধিকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্তম্ভ হলো– কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। বিগত সরকারের আমলে এই তিন খাতের ওপর দিয়ে যে অবহেলার ঝড় বয়ে গেছে, তার ক্ষত এখনো দগদগে। মেগা প্রকল্পের আড়ালে দেশের ফুসফুসখ্যাত এ খাতগুলোকে ক্রমাগত সংকুচিত করা হয়েছে। তাই নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করতে এই তিন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির অন্য কোনো বিকল্প নেই।

যে দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল, মানসম্মত শিক্ষা নতুন প্রজন্মের একমাত্র ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় চিকিৎসার পেছনে, সেখানে এই তিন খাতকে পেছনে ফেলে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এবারের বাজেটকে যদি সত্যিকার অর্থেই একটি ঐতিহাসিক ও রূপান্তরকামী দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে রাষ্ট্রকে তার ব্যয়ের অগ্রাধিকার আমূল বদলে ফেলতে হবে। এই বিনিয়োগই নির্ধারণ করবে আমরা কেমন বাংলাদেশ পেতে যাচ্ছি।

বিগত সরকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষিকে এক প্রকার উপেক্ষাই করেছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উচ্চমূল্যস্ফীতির এই ক্রান্তিকালে খাদ্য নিরাপত্তাই হলো আমাদের সবচেয়ে বড় ঢাল। সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো দেশের মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা। এর জন্য প্রয়োজন কৃষি খাতে ভর্তুকি বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং বীজ ও সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান, সে জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট বাজারজাতকরণ কাঠামোর জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখতে হবে। কৃষি খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও সবচেয়ে বড় উৎস। ফলে কৃষির আধুনিকায়ন ও কৃষিজাতশিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করলে তা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করবে।

কৃষির পর যে খাতটি জাতির মেরুদণ্ড শক্ত করে, তা হলো ‘শিক্ষা’। বিগত আমলগুলোতে শিক্ষা খাতকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ কারিকুলাম, গবেষণায় বরাদ্দের অভাব এবং দলীয়করণের কারণে শিক্ষার গুণগত মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নতুন বাংলাদেশে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বরাদ্দের গুণগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত, অথচ আমাদের দেশে তা বরাবরই উপেক্ষিত ছিল। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই ক্ষতি পূরণে সাহসী পদক্ষেপ দেখতে চায় দেশবাসী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন ও প্রশিক্ষণ এবং উচ্চশিক্ষায় গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সুযোগ আমরা হারাব। শিক্ষা খাতকে বৈষম্যমুক্ত করা না গেলে কোনো দিনই একটি সাম্যবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব নয়।

শিক্ষা ও কৃষির মতোই আরেকটি ভঙ্গুর ও উপেক্ষিত খাত হলো ‘স্বাস্থ্য’ খাত। বিগত দিনগুলোতে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা দেশের মানুষকে কতটা নিঃস্ব করেছে, তা সবার জানা। সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বিশাল অংশ চলে যায় চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে, যা অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে দারিদ্র্যের চরম সীমায় ঠেলে দিচ্ছে। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র কখনোই তার নাগরিকদের চিকিৎসার অভাবে মরতে দিতে পারে না। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির অন্তত ২ থেকে ৩ শতাংশে উন্নীত করা সময়ের দাবি। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর আধুনিকায়ন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা চালুর জন্য বাজেটে পাইলট প্রজেক্টের সূচনা করা যেতে পারে। চিকিৎসাসেবা যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে, তখনই বাজেটের গণতান্ত্রিক চরিত্র সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান হবে।

কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য–এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই এবারের বাজেট একটি নতুন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করতে পারে। কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই এই গণতন্ত্রমুখী বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে না, সমান্তরালে সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারও নিশ্চিত করতে হবে। স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং জবাবদিহিহী যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা উপড়ে ফেলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেটের টাকা যাতে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের পকেটে না গিয়ে সরাসরি মাঠপর্যায়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তার জন্য একটি স্বচ্ছ, আধুনিক ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি খাতের খরচের হিসাব জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখতে হবে, যেন বাজেটের ওপর নাগরিকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই হবে বাজেটের প্রকৃত গণতন্ত্রীকরণ।

এই বিশাল বাজেটের অর্থসংস্থানের ক্ষেত্রেও একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর থেকে নামিয়ে ফেলতে হবে। একটি গণতন্ত্রমুখী বাজেটের নীতি হওয়া উচিত প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দেওয়া। অর্থাৎ, ধনীদের ওপর করের হার বাড়িয়ে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের করের বোঝা কমাতে হবে। কর ফাঁকি রোধ, অর্থ পাচার বন্ধ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে যদি অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি করা যায়, তবে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে আসবে। স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার এ প্রক্রিয়াটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে। যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে প্রণোদনা দেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি আরও সম্প্রসারিত করার মাধ্যমেই এ বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হবে।

লেখক: চিকিৎসক, ছড়াকার ও কলামিস্ট
[email protected]