জনগণকে সম্পৃক্ত করেই বিদ্যমান জ্বালানি সমস্যার সমাধান করতে হবে। ‘জ্বালানি তেলের মজুত যথেষ্ট রয়েছে’ না বলে সরবরাহ ও মজুতের সঠিক তথ্য তুলে ধরতে হবে। তেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের শুধু ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি নয়, আরও অনেক কিছু লুকিয়ে রয়েছে, তা প্রকাশ করতে হবে। তা হলেই সমাধানের পথ বের হয়ে আসবে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
তেলের সরবরাহ বাড়াতে হবে
অধ্যাপক ড. ম. তামিম
সরকার বলছে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। যথেষ্ট মজুত রয়েছে। তা হলে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে চালকের লাইন দীর্ঘ থেকে ছোট হচ্ছে না কেন? আমার কাছে মনে হচ্ছে, বিপিসি জনগণকে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। তাই এই সংকট দূর হচ্ছে না। অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকছে। তারা বেশি তেল পেলে তো এ রকম অবস্থা হওয়ার কথা নয়। বিপিসি চাহিদামতো তেল দিলে তো ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকার কথা না। পাম্পমালিকরা চালকের চাহিদামতো তেল দিলে বারবার কীভাবে লাইনে আসেন? আমার কাছে মনে হচ্ছে, তাদের (বিপিসি) ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। বিপিসি জ্বালানি তেল কেনা ও বিক্রির কাজ করে। এ কাজে আবার পদ্মা, মেঘনাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সরকারের পক্ষ থেকেও যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে যে সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে, তা মুখে বললে হবে না। সরবরাহের সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে। এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হচ্ছে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানো। বিপিসিকে জনগণকে সঠিক কথা বলতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
সরকারের তথ্যে ঘাটতি রয়েছে
ড. বদরূল ইমাম
বিপিসি জ্বালানি তেল কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। কাজেই তারা কী বলছে তা দেখার বিষয়। তেল বিক্রি করলে তো তাদেরই লাভ হয়। তা হলে চালকদের চাহিদামতো দিচ্ছে না কেন, সেটাও দেখার বিষয়। সরকার বলছে সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তো ভিড় কমছে না। তা হলে সমস্যা একটা আছে। এটা অস্বীকার করা যাবে না। মানে তেল সরবরাহে ঘাটতি আছে। তাই সমাধানের একমাত্র পথ হচ্ছে কৃচ্ছ্রসাধন করতে হবে। এটা কীভাবে হবে সরকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে তা করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় যেটা তা পরিহার করতে হবে।
সবাই যাতে সেই পথে হাঁটে, সরকারকে সেই কাজ করতে হবে। জ্বালানি তেলের সংকট দূর করতে মানুষকেও সচেতন হতে হবে। কারণ সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। তার পরও বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে চালকের লাইন কমছে না। তাই প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করে সরবরাহ বাড়াতে হবে। কারণ বিভিন্ন মন্ত্রী যে বলছেন, তেলের সংকট নেই। তা হলে তেল যাচ্ছে কোথায়? এ প্রশ্ন আমারও। কারণ পাম্পে চালকের লাইন কমছে না। এটাই প্রমাণ করে তেল সরবরাহের ব্যাপারে সরকার যে তথ্য দিচ্ছে তাতে ঘাটতি রয়েছে। প্রকৃত তথ্য জানাতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
অব্যবস্থাপনার কারণে ঘাটতি দূর হচ্ছে না
ড. এম শামসুল আলম
বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে আমরা দেখছি তেল পেতে জনগণের ভোগান্তি বাড়ছে। তারপরও সরকার বলছে তেলের কোনো সংকট নেই। যথেষ্ট সরবরাহ রয়েছে। মজুতও রয়েছে। এসব কাজে সরকার তথা বিপিসি, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা কোম্পানি, জ্বালানি বিভাগ ও মন্ত্রণালয় জড়িত। আমি বলব জনগণের ভোগান্তি দূর করতে তারা সবাই অচল, নিষ্ক্রিয়। তারা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে থেকেও জনগণের চাহিদা মেটাতে সম্পূর্ণ অক্ষম। তারাই সমস্যা সৃষ্টি করেছে। কারণ সেই পুরোনো কাঠামোতেই তারা চলছে। সুরক্ষিত কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। আগের সরকার যে কাঠামোতে ছিল সেই পথেই হাঁটছে তারা। এর ফলে চুরি ও দুর্নীতি ঠেকাতে পারছে না। তাদের অব্যবস্থাপনার কারণেই তেলের ঘাটতি দূর হচ্ছে না। ফলে ভোক্তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।
তেলের সংকট উত্তরণের জন্য সরকারকে অঙ্গীকার করতে হবে¬, এই খাত থেকে কোনো মুনাফা করবে না। কারণ মুনাফা করার কারণেই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। যারা এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালে আদেশ দিতে হবে। জনগণের সমস্যা জনগণকে সম্পৃক্ত করেই সমাধান করতে হবে। বিইআরসিকে গণশুনানির আয়োজন করতে হবে। উপদেষ্টা, কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
কেন সংকট দূর হচ্ছে না সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে
ড. ইজাজ হোসেন
বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে চালকদের দীর্ঘ লাইন অব্যাহত রয়েছে। তারা তেল পাচ্ছেন না। অথচ সরকার বলছে, তেলের কোনো সংকট নেই। এখানেই সমস্যা। শুধু সরবরাহে নয়, অন্য অনেক কিছু জড়িত এর সঙ্গে। এগুলো সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে। তা না হলে কেন সংকট দূর হচ্ছে না। ফুয়েল পাস ভালো সিস্টেম। এটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করতে হবে। শুধু সিস্টেম চালু করলেই হবে না। কারণ অনেক চালকের অভিযোগ, এ সিস্টেমে রেজিস্ট্রেশন করতে পারছেন না। ভোক্তারা যাতে বেশি বেশি তেল পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। বিপিসিকে আরও কার্যকর করতে হবে। এখানে দুই নম্বরি কাজ হয়, তা বন্ধ করতে হবে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব সব জায়গায় পড়লেও অনেক দেশে ফিলিং স্টেশন বন্ধ হয়নি। অথচ আমাদের দেশে দেখছি দিনের অধিকাংশ সময় বিভিন্ন পাম্প বন্ধ থাকছে। চালকরা তেল পাচ্ছেন না। কাজেই আমাদের দেশে শুধু তেলের ব্যবস্থপনায় যে ত্রুটি তা নয়, অন্য আরও কিছু গোপন তথ্য লুকিয়ে আছে, সরকারকে তা জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।
বুয়েটসহ বিভিন্ন বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে তেলের সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে; যাতে তাদের চাহিদা মেটাতে অন্য কারও কাছে দ্বারস্থ হতে না হয়। এটা হয়তো অল্প সময়ে হবে না। তবে তা করতে হবে। এটা করতে পারলে পরে এত সংকট হবে না। আমাদের বুয়েটের তেলের জন্য ফিলিং স্টেশনে যেতে হবে না। এতে চাপ কমবে। অন্য বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানেরও ফিলিং স্টেশন থাকলে তাদের অন্য জায়গায় যেতে হবে না। অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)



