প্রথম দফার ভোট মোটের ওপর শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় দফাও একইভাবে শান্তিপূর্ণ করতে কমিশন বদ্ধপরিকর। পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের প্রথম চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছিল কমিশন। তার পর থেকে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এবার ট্রাইব্যুনালে সোমবার পর্যন্ত যে আবেদনগুলোর নিষ্পত্তি হয়েছে, তার ভিত্তিতে একটি তালিকা প্রকাশ করেছে কমিশন।...

রাত পোহালেই দ্বিতীয় এবং শেষ দফার ভোট পশ্চিমবঙ্গে। প্রথম দফা অবাধ এবং শান্তিপূর্ণভাবেই মিটেছে। দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে জেলায় জেলায় নজরদারি আরও জোরদার করেছে কমিশন। ইতোমধ্যেই বিক্ষিপ্ত কিছু গোলমালের অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যেই কমিশন জানিয়েছে, সোমবার রাতে মোট ৮০৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বুধবার রাজ্যের সাতটি জেলায় ১৪২টি আসনে ভোট গ্রহণ হবে। প্রথম দফার ভোট মোটের ওপর শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় দফাও একইভাবে শান্তিপূর্ণ করতে কমিশন বদ্ধপরিকর। দ্বিতীয় দফার ভোট হতে চলা এলাকাগুলোতে ইতোমধ্যেই কিছু বিক্ষিপ্ত অশান্তির অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। সোমবার সকালে গোঘাটে বিজেপি প্রার্থী প্রশান্ত দিগারের গাড়িতে হামলার অভিযোগ ওঠে। পরে দুপুর প্রায় ১২টা নাগাদ আরামবাগে তৃণমূল সাংসদ মিতালি বাগের গাড়িতেও হামলার অভিযোগ সামনে আসে। একই দিনে পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলীর নাদন ঘাট এলাকায় মারপিটের ঘটনাও অভিযোগ হিসেবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় দফার ভোট শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশি ধরপাকড় শুরু হয়েছে। রবিবার দুপুর থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত ১০৯৫ জন তথাকথিত ‘ঝামেলাবাজ’কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
প্রথম পর্বেই ভোটদানের হার ছুঁয়েছে ৯৩ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোট নিয়ে একের পর এক নজিরবিহীন কড়াকড়ি জারি ছিল কয়েক মাস আগে থেকেই। একাধিক প্রশাসনিক পদে রদবদল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে কমিশন। তাই শেষ দফায় ভোটদানের হার আরও বাড়বে বলেই আশা করছে নির্বাচন কমিশন। দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে যে দুটি ঘটনা বারবার এ রাজ্যের সামনে চলে এসেছে, তার প্রথমটি হলো চোরা সন্ত্রাস।
তৃণমূল ও বিজেপি, যার যেখানে শক্তি বেশি, তারা সেসব জায়গায় হিংসাত্মক ঘটনা ঘটিয়েছে। আর দ্বিতীয়টি হলো, বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীদের নির্বাচনি বক্তৃতায় উঠে এসেছে বিজেপি-তৃণমূলের অন্তঃসলিলা সেটিং তত্ত্ব। গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকটি জনসভায় রাহুল স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকার বিজেপি এবং আরএসএস-এর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই কাজ করেছে। তাই পশ্চিমবঙ্গ আজ বহুমুখী সমস্যার মুখে। আর সে কারণেই নির্বাচনের আগে চাকরিবাকরি, শিল্প, স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো নিয়ে আলোচনা না হয়ে, কথা হচ্ছে রাজ্যে সীমাহীন দুর্নীতি নিয়ে। আর সে দুর্নীতিতে আজ পর্যন্ত তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের কোনো সাজাই হয়নি। রাহুলের মতে, বিজেপি ও তৃণমূলের এই নিবিড় যোগাযোগের আসল সূত্রধর আরএসএস-প্রধান মোহন ভাগবত। তিনিই নাকি মধ্যস্থতা করে ঠিক করে দিয়েছেন কংগ্রেস এবং বামপন্থিরা যেন একটিও ভোট না পায়। পশ্চিমবঙ্গের ভোট ভাগাভাগি করে নিক বিজেপি ও তৃণমূল।
একই সুরে অভিযোগ করেছেন মালদহ থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস সাংসদ ঈশা খান চৌধুরী। বিধাননগর কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী রণজিৎ মুখোপাধ্যায়ের সমর্থনে নির্বাচনি প্রচারের একেবারে শেষলগ্নে তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, এসআইআর করে মালদহে ২ লাখ সংখ্যালঘু ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এমনকি দুজন প্রার্থীর নামও বাদ পড়েছে ওই প্রক্রিয়ায়।
দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে যখন উত্তর থেকে দক্ষিণ শহরতলি নিরাপত্তার চাদরে মুড়েছে, ঠিক তখনই খাস কলকাতায় হানা দিয়ে বড়সড় সাফল্য পেয়েছে পুলিশ। সোমবার বিকেলে বিটি রোড-সংলগ্ন এলাকার অভিযানে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে শামিম আলম নামে এক ব্যক্তিকে, যিনি বিহারের বাসিন্দা। বিপুল অস্ত্রের হদিশ মেলায় কপালে ভাঁজ গড়েছে দুঁদে গোয়েন্দাদেরও। গোয়েন্দা সূত্রে খবর আসে এক ভিন রাজ্যের ব্যক্তির গতিবিধি নিয়ে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই চিৎপুর থানার অন্তর্গত বিটি রোড এলাকায় ওত পেতে ছিল পুলিশ। বছর চল্লিশের এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে সেখানে ঘোরাঘুরি করতে দেখে আটক করা হয়। তাল্লাশি চালাতেই বেরিয়ে আসে অস্ত্রের ভাণ্ডার।
এদিকে দ্বিতীয় দফা ভোটের আগে প্রচারের শেষলগ্নে রক্ত ঝরল উত্তর চব্বিশ পরগনার হালিশহরে। শনিবার সন্ধ্যায় এক তৃণমূল কর্মীকে লক্ষ্য করে শুটআউটের ঘটনায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে বীজপুর বিধানসভা এলাকায়। সক্রিয় তৃণমূল কর্মী প্রসেনজিৎ মৌলিক ওরফে রাজাকে লক্ষ্য করে চলেছে তিন রাউন্ড গুলি। গুরুতর জখম অবস্থায় বর্তমানে তিনি কল্যাণী জেএনএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভোটের মুখে উত্তর চব্বিশ পরগনায় বিজেপি-তৃণমূল সংঘাত চরম আকার নেয়।
শনিবার সন্ধ্যা তখন সবে ঘনিয়েছে। হালিশহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মিলি পুকুর রোডে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলেন রাজা। অভিযোগ, সেই সময় আচমকাই বাইকে করে একদল মুখঢাকা দুষ্কৃত সেখানে হাজির হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাজাকে লক্ষ্য করে তিন রাউন্ড গুলি চালায় তারা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, একটি গুলি রাজার পেটে বিঁধলেও, বাকি দুটি গুলি তার পকেটে থাকা মোবাইল ফোনে আটকে যায়। মোবাইল ফোনটি না থাকলে বড়সড় বিপদ ঘটতে পারত বলে মনে করা হচ্ছে। রক্তাক্ত অবস্থায় রাজা মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই চম্পট দেয় দুষ্কৃতরা। রাজ্যে দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে জায়গায় জায়গায় রাজনৈতিক হিংসা দেখা গেছে। আর প্রচার শেষ হওয়ার পরে হালিশহর সাক্ষী থাকল শুটআউটের।
তৃণমূল ক্ষমতায় আসার আগে মমতা বন্দোপাধ্যায় বলেছিলেন বদলা নয়, বদল চাই। সেই শান্তির বাণী ও প্রচার শুনে বাংলার মানুষ দুহাত ভরে ভোট দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জিতিয়েছিল। মমতা কার্যত বিরোধীদের শূন্য করে বাংলায় সরকার গঠন করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে এবার উল্টো সুর শোনা গেছে আরামবাগে তৃণমূলের প্রচারে।
আরামবাগে তৃণমূল-বিজেপির সংঘর্ষে সাংসদ মিতালি বাগকে হাসপাতালে দেখে আসার পর বিজেপি ও সিপিএমকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন তিনি। তার ঘোষণা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উদারতা অনেক দেখিয়েছেন। এবারের তৃণমূল ক্ষমতায় এলে আরামবাগের স্টিয়ারিং তারই হাতে থাকবে। বিজেপি যে ভাষায় বোঝে, সেই ভাষায় উত্তর দেবেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাড়ি থেকে বেরোতে পারেনি সিপিএম। যেই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে, সিপিএমের হার্মাদদের অক্সিজেন দিয়ে নেতা তৈরি করেছে। আরামবাগের মানুষ ক্ষমা করবে না। যারা আরামবাগে এসে আরামবাগের মাটিকে অশান্ত করতে চেয়েছে, তাদের সুদে-আসলে আগামী দিনে জবাব দিতে হবে ৪ মে ভোটের ফল ঘোষণার পর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতই উদার হোক আরামবাগের স্টিয়ারিং আমার হাতে থাকবে।
বুধবার রাজ্যে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন রয়েছে। সাত জেলার মোট ১৪২টি আসনে হবে ভোট গ্রহণ। নতুন প্রকাশিত অতিরিক্ত তালিকায় দ্বিতীয় দফার ভোটকেন্দ্রগুলোয় যে ভোটারদের নাম জুড়ল, তারাও ভোট দিতে পারবেন। নিয়ম অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা আগেই ‘ফ্রিজ’ হয়ে গিয়েছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল, ভোটের দুই দিন আগেও ট্রাইব্যুনাল যেসব নামের নিষ্পত্তি করবে এবং যাদের ভোটার হিসেবে ছাড়পত্র দেবে, তারা ভোট দিতে পারবেন। শীর্ষ আদালতের সেই নির্দেশ মোতাবেক এবার পদক্ষেপ করল কমিশন। জানা যাচ্ছে, সোমবার পর্যন্ত যে আবেদনগুলোর নিষ্পত্তি হয়েছে ট্রাইব্যুনালে, তার ভিত্তিতে এই অতিরিক্ত তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
এর আগে প্রথম দফার ভোটের আগেও আদালতের নির্দেশমতো একটি অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করেছিল কমিশন। তখন প্রথম দফার ১৩৯ জন ভোটারের নাম তালিকায় যুক্ত করা হয়। আগের তালিকা থেকে মুছেও দেওয়া হলো আটজনের নাম। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পর বিবেচনাধীন তালিকায় ছিল ৬০ লক্ষাধিক নাম। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা সেই বিবেচনাধীন তালিকার নামগুলোর নিষ্পত্তি করেন। তাতেও অনেক ভোটার ‘অযোগ্য’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলেন। এ অবস্থায় আদালত জানিয়েছিল, চাইলে ওই ভোটাররা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানাতে পারবেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের প্রথম চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছিল কমিশন। তার পর থেকে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এবার ট্রাইব্যুনালে সোমবার পর্যন্ত যে আবেদনগুলোর নিষ্পত্তি হয়েছে, তার ভিত্তিতে একটি তালিকা প্রকাশ করেছে কমিশন। বুধবার কলকাতার পাশাপাশি দুই চব্বিশ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, নদিয়া এবং পূর্ব বর্ধমানে ভোট রয়েছে।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক


.jpg)