প্রত্যেক মানুষই একেকজন মানবাধিকারকর্মী। প্রত্যেক মানুষ তার নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন, তারা তাদের অধিকার রক্ষা করতে পারে এবং অন্যের অধিকার লঙ্ঘিত হলে তার জন্য প্রতিবাদ করতে পারে। এটিই মানবিক অধিকার, মানবিক দায়িত্ব ও নৈতিক দায়িত্ব।...

বাংলাদেশ হবে সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার দেশ। এর কোনো ব্যত্যয় ঘটতে পারে না। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলেই দেশে শান্তি লঙ্ঘিত হবে। সরকারের দায়িত্ব মানুষ যেন মাথা উঁচু করে শান্তিতে বসবাস করতে পারে, তা নিশ্চিত করা। যে সরকার সেটা করে সে সরকার সুসরকার আর যে সরকার সেটা না করে সে সরকারের আমরা প্রশংসা করব না, সে সরকারের আমরা সমালোচনা করব।
প্রত্যেক মানুষই একেকজন মানবাধিকারকর্মী। প্রত্যেক মানুষ তার নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন, তারা তাদের অধিকার রক্ষা করতে পারে এবং অন্যের অধিকার লঙ্ঘিত হলে তার জন্য প্রতিবাদ করতে পারে। এটিই মানবিক অধিকার, মানবিক দায়িত্ব ও নৈতিক দায়িত্ব। যারা সহিংস শক্তি প্রদর্শন করতে পারছে, তাদের কথায় রাষ্ট্র চলছে। কিন্তু আমরা এটা চাই না। আমরা একটা ন্যায়বিচারের সমাজ চাই। যে সমাজে মানুষ তার অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে পারে। আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
একটি রাষ্ট্র জনগোষ্ঠী তৈরি করে না, জনগোষ্ঠী রাষ্ট্র তৈরি করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এক সময় বাংলাদেশ ছিল না, পাকিস্তান ছিল। ভারত নামেও রাষ্ট্র ছিল না, অন্য নামে ছিল। কিন্তু মানুষ ছিল। মানুষের পরিচয় ছিল। যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় যান, তারা ভুলে যান রাষ্ট্র জনগোষ্ঠীকে তৈরি করে না। জনগোষ্ঠী রাষ্ট্র তৈরি করে। তারা অন্যায়ভাবে বলার চেষ্টা করেন, তুমি বা সে। তুমি, সে, ওই- এসব বলার অধিকার কিন্তু রাষ্ট্রের নেই। যদি আপনাকে কেউ বলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, এটা অন্যায়ভাবে বলে এবং তাদের এটা বলার অধিকার নেই। আপনারা যেভাবে যুগ যুগ ধরে পরিচয় দিয়ে এসেছেন জন্মগতভাবে, সেভাবেই পরিচয় দেবেন।
এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতির অধিকার থাকবে। এ দেশ হবে সাম্যের দেশ, ন্যায়বিচারের দেশ এবং মানবিক মর্যাদার দেশ। দেশে কোনো জনগোষ্ঠী যদি শঙ্কার মধ্যে বাস করে, সেটা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। কোনো মানুষ যদি মনে করে তার মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে না, সেটাও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।
নদী কখনো উৎসমুখে ফেরত যায় না। কিন্তু উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে নদী বাঁচে না। একইভাবে তরুণ প্রজন্মও উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে বাঁচবে না। পরম্পরা বজায় রাখতে হবে। রাজনৈতিক সহিংসতার সামগ্রিক মাত্রা ও হতাহতের সংখ্যা কিছুটা কমলেও, দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও প্রতিপক্ষীয় হামলা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাত পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের তৎপরতার বিপরীতে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীর যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এ মাসে গুরুতর চাপে পড়েছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, সত্য প্রকাশের পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এর ফলে সংবিধান প্রদত্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। ডিজিটাল/সাইবার নিরাপত্তা আইনের ব্যবহার এবং অনেক ক্ষেত্রে অপব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। যদিও আইনটিতে কিছু সংস্কারের কথা বলা হয়, বাস্তবে এর প্রয়োগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা রয়েই গেছে। নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও কিছু উপ-খাতে সামান্য হ্রাস দেখা গেছে, সামগ্রিকভাবে এই গোষ্ঠীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থিতিশীল। সামগ্রিকভাবে, কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও জবাবদিহির অভাবে নাগরিক জীবনে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সহনশীলতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
এ মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে পাঁচজন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অগ্রহণযোগ্য। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া আবশ্যক। গত মাসের তুলনায় এ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা, নিহত ও আহতদের সংখ্যা সামগ্রিকভাবে হ্রাস পেলেও, আধিপত্য বিস্তার এবং দলীয় কোন্দলকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। বিএনপির দলীয় কর্মীদের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে লক্ষণীয়ভাবে দ্বন্দ্ব বেড়ে যাওয়ায় হতাহতের ঘটনা ঘটেই চলেছে। সার্বিকভাবে দেখা যায়, সহিংসতার পরিমাণ কিছুটা কমলেও রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে এখনো অস্থিতিশীল করে রেখেছে। সারা দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সরকারের পতন-সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ৩১ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যার মধ্যে কোটা-সংক্রান্ত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার হয়েছেন একজন ব্যক্তি।
সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে যেভাবে শারীরিক, মানসিক এবং আইনি হয়রানি, আক্রমণ, হুমকি ও লাঞ্ছিত করা হচ্ছে তা শুধু অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, বরং সৎ সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে বাধা দেওয়ারই নামান্তর। এ মাসেও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মাসে ২৭টি ঘটনায় ৪৬ জন সাংবাদিক দেশের বিভিন্ন জেলায় পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় নানাভাবে হামলা, আইনি হয়রানি, হুমকি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আক্রান্ত সাংবাদিকদের মধ্যে ১৪ জন সাংবাদিক তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় আহত এবং হামলার শিকার হয়েছেন। লাঞ্ছিত ও হুমকির শিকার হয়েছেন ২৪ জন, আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন আটজন। ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ রহিত করে ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। সাইবার সুরক্ষা আইন আগের তুলনায় উন্নত হলেও, আইনের কিছু ধারা অস্পষ্ট হওয়া ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কিছু বাধা রয়েই গেছে। ফলে এ আইনে দায়ের করা মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রেপ্তারের সংখ্যাও বাড়ছে। যা উদ্বেগজনক।
ধারাবাহিকতায় গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসে হতাহতের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েই চলেছে। চলতি সময়ে গণপিটুনির ঘটনা কমে না আসায় জনমনে নিরাপত্তা বোধের বিষয়টি প্রশ্নাতীতভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। এ ছাড়া ধর্ষণ এবং ধর্ষণচেষ্টার হার বেড়ে যাওয়ায় ধর্ষণে অভিযুক্তদের ধরে গণপিটুনি দেওয়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। ফলে লক্ষণীয়ভাবে এর প্রভাব থাকায় জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আইন অবজ্ঞা করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা অবশ্যই ফৌজদারি অপরাধ, যা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবেই গণ্য করা হয়ে থাকে। গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও অসাম্প্রদায়িকতা অপরিহার্য বলে মনে করি। সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে থেকে কাঙ্ক্ষিত দেশ গড়তে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শান্তি রক্ষায় যথাযথ দায়িত্ব পালনে তৎপর হওয়ার জরুরি।
লেখক: মানবাধিকারকর্মী


.jpg)