চিন রাজ্যের সশস্ত্র দলগুলো আরাকান আর্মির মতো একীভূত হয়ে নিজেরাই তাদের রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিতে আগ্রহী। চিন ও রাখাইনের জনগণের মধ্যে সম্প্রতি ও যোগাযোগ বাড়লে উভয় রাজ্যের মানুষ উপকৃত হবে। এই দুটি রাজ্যে শান্তি ফিরে আসলে ভারতের কালদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ সরকারও লুক ইস্ট পলিসির আলোকে সীমান্তবর্তী এ দুটি অঞ্চলের রাজনৈতিক দল ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও উন্নয়নে কাজ করতে পারে।...
বাংলাদেশের সঙ্গে মায়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যের সীমান্ত রয়েছে। বাংলাদেশ মায়ানমার সীমান্তের ২৭১ কিলোমিটারের মধ্যে রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে ২০৮ কিলোমিটার এবং চিন রাজ্যের সঙ্গে ৬৩ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। মায়ানমারের চিন রাজ্য ও বাংলাদেশের সীমান্ত, পাহাড়ি এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল এলাকা। এ এলাকার কাছেই চিনের পালেতোয়া শহরতলি। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আরাকান আর্মি (এএ) রাখাইনে তাদের আক্রমণ শুরুর আগে, চিন রাজ্যের পালেতোয়া শহরতলি দখল করে। পালেতোয়া এখনো আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এরপর তারা রাখাইনে আক্রমণের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয় এবং পালেতোয়া দিয়ে তাদের সরবরাহ নিশ্চিত করে। রাখাইনের অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যা প্রায় নয় বছর ধরে টেনে যাচ্ছে এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে মায়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। রোহিঙ্গাসংকটের কারণে এখন আমরা মায়ানমার সম্পর্কে কিছু জানতে পারছি। তবে প্রতিবেশী দেশ ও রাজ্যগুলো সম্পর্কে আমাদের আরও বিশদভাবে জানা এবং এ অঞ্চলগুলো সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ করা দরকার।
চিন রাজ্যের সংঘাত
চিন রাজ্য মায়ানমারের ভারত সীমান্তবর্তী একটি খ্রিষ্টান অধ্যুষিত অঞ্চল। চিন রাজ্যে মোট নয়টি টাউনশিপ রয়েছে। চিন মায়ানমারের একটা অনুন্নত রাজ্য এবং এর প্রায় ৭৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এটা পার্বত্য অঞ্চল এবং যোগাযোগের জন্য অল্প কিছু রাস্তাঘাট রয়েছে। চিন রাজ্যে ছয়টি জাতিসত্তার ৫৩টা উপজাতি এবং ছয়টি মূল ভাষা রয়েছে। এটা মায়ানমারের খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য। বিভিন্ন জাতিসত্তার অবস্থানের কারণে এখানে অনেক ছোট ছোট দল ও তাদের সশস্ত্র শাখা রয়েছে।
১৯৮৮ সালে চিন জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর স্বায়ত্তশাসন অর্জনের জন্য সিএনএফ এবং এর সশস্ত্র শাখা চিন ন্যাশনাল আর্মি (সিএনএ) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে তারা সেনাবাহিনীর সঙ্গে ২০১৫ সালের ন্যাশনওয়াইড যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে (এনসিএ) স্বাক্ষর করে। ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ তারা এনসিএর থেকে বেরিয়ে আসে এবং সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করে। ২০২১ সালের পর থেকে জাতিগত চিন যোদ্ধারা রাজ্যের বেশির ভাগ এলাকা থেকে মায়ানমার সেনাবাহিনীকে বিতাড়িত করে। বর্তমানে চিন রাজ্যের ৭০ শতাংশেরও বেশি এলাকা মুক্ত হয়েছে।
চিন রাজ্যের সশস্ত্র দুটি গোষ্ঠীর একটির নেতৃত্বে রয়েছে ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (সিএনএফ) ও তার মিত্ররা এবং অন্যটি হলো চিন ব্রাদারহুড, যা চিন জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী (সিএনডিএফ)-সহ ছয়টি প্রতিরোধ গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত। ২৬ ফেব্রুয়ারি-২০২৫ এ দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী একীভূত হয়ে চিন জাতীয় পরিষদ গঠনের ঘোষণা দেয়, যার লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একটি একক সামরিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের অধীনে একত্রিত করা।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর মায়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য বেসামরিক নাগরিকদের নিয়ে সিএনডিএফ গঠিত হয়। চিন ব্রাদারহুড ২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর মিনদাত ও ফালামে একযোগে আক্রমণের মাধ্যমে ‘অপারেশন চিন ব্রাদারহুড’ শুরু করে। এরপর তারা কানপেটলেট ও মাতুপিও দখল করে। ২২ ডিসেম্বর তারা মায়ানমার সেনাবাহিনীর কাছ থেকে মিনদাতের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।
সিএনডিএফ ফালাম শহর দখলের জন্য ‘মিশন জেরুজালেম সাংকেতিক নামে অভিযান শুরু করে। ২০২৫ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি ফালামের সর্বশেষ সেনাঘাঁটি ঘিরে ফেলে সরবরাহের পথ বন্ধ করে দিলে মায়ানমার সেনাবাহিনী শহরটিকে রক্ষার জন্য ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। ফালাম রাজ্যের রাজধানী হাখার পর চীন রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরতলি। পাঁচ মাসব্যাপী অবরোধের পর ২০২৫ সালের এপ্রিলে চিন ব্রাদারহুড কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক শহর ফালামের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। ফালাম দখলের ফলে স্থলপথে কালে শহরতলি হাখা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সেখানকার মায়ানমার সেনাবাহিনীর অবস্থান হুমকির মুখে পড়ে।
চিন রাজ্য থেকে মায়ানমারের সামরিক শাসনকে সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করাই চিন জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর মূল লক্ষ্য। চিন জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং চিন ব্রাদারহুড জোটের মিত্ররা দক্ষিণে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সহায়তায় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এর আগে বিজয় অর্জন করেছিল।
চিন ন্যাশনাল কনসালটেটিভ কাউন্সিল এবং চিন স্টেট জয়েন্ট ডিফেন্স কমিটি প্রাথমিকভাবে চিন রাজ্যে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য চিন রাজ্যে বিপ্লবী বাহিনীকে সংগঠিত করেছিল। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পরে আইসিএনসিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি একটি বেসামরিক নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সংস্থা এবং এর সশস্ত্র শাখা চিন পিপলস আর্মি। পরবর্তীতে, সামরিক ও রাজনৈতিক উভয় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য চিন ব্রাদারহুড গঠন করা হয়। তারা একত্রে কিন ডুয়ে, মাতুপি, মিন্দাত, কানপেটলেট এবং ফালাম টাউনশিপগুলোকে সামরিক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করেছিল। ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ দক্ষিণ চিন রাজ্যে চারটি সিডিএফ ইউনিটের একীভূতকরণের পর সিপিএ গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের একটি কমান্ড এবং একটি সেনাবাহিনী হিসেবে সিপিএ-তে একীভূত করা চিন পিপলস আর্মির লক্ষ্য। বাণিজ্য, প্রশাসন ও কমান্ড পরিবর্তনের বিষয়ে তারা আরও ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হবে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আরাকান আর্মি পালেতোয়া টাউনশিপটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর আগে চিনল্যান্ড কাউন্সিল বাহিনী আগস্ট ২০২৩ এবং মে ২০২৪-এ টনজাং টাউনশিপ এবং থানলাং টাউনশিপের কিছু অংশ দখল করেছিল। থানটলাং এবং টেডিমের শহুরে অঞ্চলগুলো এখনো মায়ানমার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। চিন প্রতিরোধী গোষ্ঠীগুলো ২০২৪ সালে মায়ানমার-ভারত সীমান্তের চিন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ২০২৫-২৬ সালের নির্বাচনে সাতটি টাউনশিপে ভোট অনুষ্ঠিত হতে বাধা দিয়েছে। কেবলমাত্র হাখা এবং টেডিমে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণ হয়েছিল।
চিন ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সকে একটি একীভূত সশস্ত্র বাহিনীতে রূপান্তরিত করার পদক্ষেপের অংশ হিসেবে চারটি প্রধান প্রতিরক্ষা গোষ্ঠী এবং তাদের নিজ নিজ টাউনশিপ প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে একীভূত হয়ে চিন পিপলস ইউনিয়ন এবং চিন পিপলস আর্মি গঠন করেছে। ১২ জানুয়ারি ২০২৬-এ ঘোষিত এ পদক্ষেপের লক্ষ্য দক্ষিণ চিন রাজ্যের জন্য একটি একক সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি সমন্বিত কাঠামোর অধীনে বিপ্লব পরিচালনা করা। আরাকান আর্মির সঙ্গেও চিন ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
চিন ও আরাকান আর্মি
মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রতিবেশী চিন প্রদেশের পালেতোয়া শহরতলি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে এ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই, স্থানীয় চিন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিশেষ করে চিনল্যান্ড ডিফেন্স ফোর্স খুমি এবং অন্যান্য স্থানীয় গোষ্ঠী আরাকান আর্মির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে চলছে।
মায়ানমারের চিন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পালেতোয়া টাউনশিপের ওপর আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণের কারণে মিজোরাম-ভিত্তিক সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন সেন্ট্রাল ইয়াং লাই অ্যাসোসিয়েশন ২০২৪ সালের জুলাই মাসে চিন রাজ্য-সংলগ্ন ভারত মায়ানমার বাণিজ্য পথ অবরোধ করে রেখেছিল। এর ফলে ভারত-মায়ানমার সীমান্তে বাণ্যিজ ব্যাহত এবং রাখাইনে পণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছিল। পরবর্তীতে আলোচনা-সাপেক্ষে তা পুনরায় চালু হয়। সেন্ট্রাল ইয়াং লাই অ্যাসোসিয়েশন লাই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। লাই জনগোষ্ঠী বৃহত্তর চিন জনগোষ্ঠীর অংশ।
চিন পিপলস ইউনিয়ন চিন ও রাখাইন সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে আলোচনার জন্য ফেব্রুয়ারিতে আরাকান আর্মির নেতা তুন মিয়াত নাইংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। দক্ষিণ চিন রাজ্যে অবস্থিত প্রতিরোধ বাহিনীগুলোর জোট সিপিইউ এবং এর সশস্ত্র শাখা সিপিএ এবং ইউনাইটেড লিগ অব আরাকানের সশস্ত্র শাখা আরাকান আর্মির নেতাদের মধ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ের পাশাপাশি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তারা আঞ্চলিক বাণিজ্যে সম্ভাব্য সহযোগিতা, আরাকান ও চিন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য এবং সামরিক জান্তা আক্রমণ যৌথভাবে করণীয় বিষয়েও আলোচনা করে। তারা চিন ও আরাকান রাষ্ট্রের মধ্যে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক ও পারস্পরিক সুবিধার গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা করে এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার পরিকল্পনায় সম্মত হয়। ইউএলএ এবং আরাকান আর্মি আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং সবাই মিলে পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে চায় যা উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক হবে।
চিন রাজ্যের সশস্ত্র দলগুলো আরাকান আর্মির মতো একীভূত হয়ে নিজেরাই তাদের রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিতে আগ্রহী। চিন ও রাখাইনের জনগণের মধ্যে সম্প্রতি ও যোগাযোগ বাড়লে উভয় রাজ্যের মানুষ উপকৃত হবে। এই দুটি রাজ্যে শান্তি ফিরে আসলে ভারতের ভারতের কালদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ সরকারও লুক ইস্ট পলিসির আলোকে সীমান্তবর্তী এ দুটি অঞ্চলের রাজনৈতিক দল ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও উন্নয়নে কাজ করতে পারে। মায়ানমার সরকার রাজনৈতিকভাবে চলমান সংকট সমাধানে উদ্যোগ নিলে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা, আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
লেখক: মায়ানমার ও রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক


.jpg)