আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনা বারবার উপেক্ষা করেছেন ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। ২০২১-২২ সালে সম্মেলন হলেও এখনো থানা ও ওয়ার্ড কমিটি ঘোষণা করতে পারেননি তারা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কঠোর নির্দেশনার পর মহানগর উত্তরের অন্তর্গত থানা ও ওয়ার্ড কমিটি দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের মতৈক্য না হওয়ায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আওতাভুক্ত থানা ও ওয়ার্ড কমিটি জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। যদিও ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগরের বর্তমান কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে।
মহানগর সূত্র জানিয়েছে, ২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি করা হয় শেখ বজলুর রহমানকে এবং সাধারণ সম্পাদক করা হয় এস এম মান্নান কচিকে। অন্যদিকে দক্ষিণের সভাপতি হন আবু আহমেদ মন্নাফী ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মো. হুমায়ুন কবিরের নাম ঘোষণা করা হয়। এই চার নেতা ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে সময় নেন প্রায় এক বছর। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর মেয়াদের এ কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২২ সালের নভেম্বরে।
ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের অন্তর্গত থানা ও ওয়ার্ডগুলোর কমিটি গঠনের কার্যক্রম শুরু হয় ২০২১ সালের শেষ দিকে। কিন্তু গত আড়াই বছরেও এই কার্যক্রম শেষ করতে পারেনি উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নগর উত্তরের সাংগঠনিক থানা ২৪টি থানা ও ৬৪টি ওয়ার্ড এবং দক্ষিণের ২৪টি থানা ও ৫৭টি ওয়ার্ডের কমিটি এখনো ঘোষণা হয়নি।
আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম বলেছেন, ‘অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে সব কমিটি জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নিয়েছে। দক্ষিণ আওয়ামী লীগ নেতারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে কমিটি চূড়ান্ত করবেন। যাচাই-বাছাই শেষে এসব কমিটি ঘোষণা করা হবে। আগামী ২৩ জুন দলের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পরে এসব কমিটি ঘোষণা হতে পারে।’
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে মহানগরের সব থানা ও ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ কমিটি চূড়ান্ত করে জমা দিতে ২০২৩ সালের ২০ মার্চ পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। কিন্তু সে সময়ের মধ্যে কমিটি কেন্দ্রে জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। পরে চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয় দলের উচ্চপর্যায় থেকে। তখন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবিরের দ্বন্দ্বের কারণে দুই নেতা আলাদাভাবে কমিটি করে কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দেন। যা গ্রহণ না করে ক্ষিপ্ত হন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি মন্নাফী ও হুমায়ুনকে একমত হয়ে একটি করে কমিটি কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেন।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী খবরের কাগজকে বলেন, “আমার পছন্দ হলে ওনার (সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির) পছন্দ হয় না। ওনার হলে আমার পছন্দ হয় না। কমিটি নিয়ে এভাবে টানাহেঁচড়া চলছে। আমি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কথা বলব। না হলে আমি আগের কমিটি জমা দিয়ে দেব। কোনো খারাপ নেতার পক্ষে আমার ‘সই’ দিতে পারব না। হাইব্রিড কাউকে নয়, ত্যাগী নেতাদের পদে রাখতে চাই। না হলে আমি দায়িত্ব ছেড়ে দেব।”
কমিটির বিষয়ে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা খুব দ্রুতই থানা ও ওয়ার্ডের কমিটি কেন্দ্রে জমা দিয়ে দেব। আসলে সভাপতি সাহেব (মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ) অসুস্থ। এ জন্য কমিটি জমা দিতে দেরি হচ্ছে। তবে কমিটি গঠনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।’
এদিকে গত ৪ জুন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ তাদের থানা, ওয়ার্ড, ইউনিটের কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শেষ করেছে বলে এক অনুষ্ঠানে জানান দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘দেরিতে হলেও এই কাজটি অনেক দিন ধরে নেতা-কর্মীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। মহানগর দক্ষিণও আমাকে জানিয়েছে কমিটি জমা দেবে। কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে আছে বলে জানিয়েছে। আর উত্তর আগেই কমিটি গঠন-প্রক্রিয়া শেষ করেছে।’
আওয়ামী লীগের মহানগর উত্তরের নেতাদের কাছ থেকে জানা গেছে, চলতি (জুন) মাসে সব কমিটি জমা দেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার অনুমোদনের পর এসব কমিটি ঘোষণা করা হবে। অবশ্য কমিটি জমা দেওয়ার পরই দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের কেউ কেউ অনুসারীদের ‘গ্রিন সিগনাল’ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রস্তাবিত ঢাকা মহানগর উত্তরের অন্তর্ভুক্ত তুরাগ থানা আওয়ামী লীগের পদপ্রত্যাশীরা কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতাদের কাছে অভিযোগ করেছেন। ওই থানার একাধিক নেতা জানান, কমিটিতে কারা থাকছেন তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো না হলেও দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মাধ্যমে সবাই জেনে গেছেন। প্রস্তাবিত ওই কমিটিতে সভাপতি হিসেবে আছেন নুরুল ইসলাম মোল্লা সুরুজ ও সাধারণ সম্পাদক পদে আছেন মুহিবুল হাসান। দুজন একই মহল্লায় থাকেন।
প্রস্তাবিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুহিবুল হাসানের পেছনে আছেন তার ছোট ভাই যুবলীগ নেতা নাজমুল হাসান। এই নাজমুলের বিরুদ্ধে জমি দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একাধিক মামলা রয়েছে। নিজের বদলে টাকা দিয়ে আরেকজনকে জেল খাটতে পাঠিয়ে আলোচিত নাজমুল। বর্তমানে তিনি জেলে আছেন। তুরাগ থানা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু আমাকে আউট করে থানা কমিটি দেওয়া হচ্ছে বলে শুনতে পেয়েছি। যাদের দেওয়া হচ্ছে, তারা অযোগ্য। থানা কমিটি সামলানোর সক্ষমতা তাদের নেই। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সবাই অবাক হয়েছেন। হাসিঠাট্টা হয়েছে এলাকায়।’
মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিতর্কিত কেউ কমিটিতে ঢুকলে আমরা যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেব।’ তুরাগ থানার কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনারা যা শুনছেন, আমাদের কানেও তা এসেছে। তবে কমিটি ঘোষণা হওয়ার আগে কিছু বলা যাবে না।’