নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে ঘোর আপত্তি থাকলেও জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতাদের ‘গলায় ফাঁস লাগিয়ে’ আওয়ামী লীগ বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করেছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের।
তিনি বলেছেন, নির্বাচনে অংশ না নিলে জাতীয় পার্টি অস্তিত্বসংকটে পড়ত।
রবিবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজধানীর বনানীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
দশম-একাদশ-দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা সমালোচনা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে তাদের দোসর হিসেবে জাতীয় পার্টির ভূমিকা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
এ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্নের জবাবে জি এম কাদের বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ সব দলই অংশ নিয়েছিল। আমরাও নির্বাচনে ছিলাম। ২০২৪ সালের নির্বাচন থেকে আমরা বারবার চলে আসতে চেষ্টা করেছি। আমাদের দেশের মিডিয়া এবং সচেতন মানুষ জানে, জাতীয় পার্টির গলায় ফাঁস লাগিয়ে নির্বাচনে নিয়েছে আওয়ামী লীগ।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জনের জন্য সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন সংস্থা আমাদের নেতা-কর্মীদের সেই সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে দেয়নি। মূল জাতীয় পার্টি সব সময় জনগণের সঙ্গে ছিল, জনগণের সঙ্গে থাকবে। আমরা নির্বাচনে না গেলেও নির্বাচন হতো। আওয়ামী লীগের পতন হয়েছে, আওয়ামী লীগের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের জন্য।’
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতীয় পার্টির অবস্থান নিয়ে জি এম কাদের বলেন, ‘২০২৪ সালের নির্বাচনে না যাওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো অপশন ছিল না। এতে আমাদের দল হয়তো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু দলটি বেঁচে গেছে। দল না থাকলে আমাদের রাজনীতি থাকবে না। তাই দল বাঁচানো আমাদের কাছে জরুরি ছিল। নির্বাচনের দিন ও নির্বাচনের পরেও আমরা বলেছি, নির্বাচন সঠিক হয়নি। তবে আমরা সংসদে সত্যিকারের বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করেছি। আমরা সরকারের যেভাবে সমালোচনা করেছি, তা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি করেনি।’
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজের নির্বাচনি এলাকা রংপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগ সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করেননি উল্লেখ করে জি এম কাদের বলেন, ‘কোনো কোনো আসনে সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি। যেমন আমার নির্বাচনি এলাকায়। কোথাও কোথাও সরকারের নির্দেশনা ছিল যে যেভাবে পার জিতে আস। সেখানে কালো টাকা বা পেশিশক্তি কোনো বিষয় ছিল না। তৃতীয় নির্দেশনা ছিল, নির্বাচনে যে যাই করুক, তাদের তালিকা অনুযায়ী বিজয়ী ঘোষণা করা হোক।’
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে জাতীয় পার্টির কর্তৃত্ব নিতে শুরু করেন রওশন এরশাদ। আওয়ামী লীগ ঘেঁষা রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদেরও বিরাগভাজন হয়েছেন একাধিকবার।
এ নিয়ে দেবর জি এম কাদেরের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে বারবার। এরশাদের মৃত্যুর পরে রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টিতে ভাঙন ধরিয়ে নতুন দল গঠনের উদ্যোগ নেন গত বছর। এক দশক পরে বড় ভাঙনের পরে জাতীয় পার্টির রুগণদশা আরও প্রকট হয়ে উঠে।
এ প্রসঙ্গে জি এম কাদের বলেন, ‘২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আমরা আওয়ামী লীগের হাতে নির্যাতিত হয়েছি। আমাদের দলকে রাজনীতি করতে দেয়নি স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ। আমাদের দল ও সংসদীয় দলকে সব সময় আওয়ামী লীগ ডিস্টার্ব করেছে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের বিচারের পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদের বিচারে একটি ট্রুথ কমিশন গঠনের পরামর্শ দেন জি এম কাদের। তিনি বলেন, ‘ট্রুথ কমিশন গঠন করে স্বীকৃত দুর্নীতিবাজদের অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। আমরা চাই, সরকার রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার করে নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণা করবে।’
সংবাদ সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের পাশাপাশি ও দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অনুরোধ জানান তিনি।
নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে জানতে চাইলে জি এম কাদের বলেন, ‘সাধারণ মানুষের যদি পেটের ভাত ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় তা হলে, তারা নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে রাজি আছে। সরকার যেভাবে চাইবে আমরা সংস্কারের জন্য সহায়তা দিতে প্রস্তুত আছি। শুধু নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই হবে না, পরবর্তীতে নির্বাচিতরা যেন গণতান্ত্রিকভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। জনগণের কাছে সরকারের যেন জবাবদিহিতা থাকে এবং জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার যেন মূল্য থাকে। মানুষকে যেন আর ভোটাধিকারের জন্য আন্দোলন করতে না হয়।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু, প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আব্দুস সবুর আসুদ, মোস্তফা আল মাহমুদ, মনিরুল ইসলাম মিলন, মাসরুর মওলাসহ আরও অনেকে।