জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের (জি এম কাদের) নির্দেশনা অমান্য করে পার্টির দশম কাউন্সিল অধিবেশনের চেষ্টা করায় দলটির তিন শীর্ষ নেতার শাস্তির দাবি করেছেন তৃণমূলের নেতারা। জি এম কাদেরও বলেছেন, যারা বিভিন্ন সময়ে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে কেনাবেচার রাজনীতি করেছেন, তাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি আর রাজনীতি করতে চান না।
বুধবার (২৫ জুন) দুপুরে রাজধানীর বনানীতে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা জাতীয় পার্টির জেলা ও মহানগর কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন জি এম কাদের।
এ সভায় তৃণমূলের নেতারা জি এম কাদেরের নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা ব্যক্ত করেছেন। তৃণমূলের নেতারা এ সময় জি এম কাদেরকে বলেন, জাতীয় পার্টির মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, আলমগীর সিকদার লোটন, ইমরান হোসেন মিয়া, লিয়াকত হোসেন খোকা, শেরীফা কাদের, মো. শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, ইকবাল হোসেন তাপসসহ অন্যরা। সভা পরিচালনা করেন জাতীয় পার্টির দপ্তর সম্পাদক মাহমুদ আলম।
জাপার শীর্ষ নেতা সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কো-চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নুর বিরুদ্ধে সভায় তীব্র ক্ষোভ জানান দলের তৃণমূলের নেতারা।
সভায় উপস্থিত একাধিক নেতা অভিযোগ এনে বলেছেন, এই তিন নেতা গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে জাতীয় পার্টির সম্মানহানি করেছেন। আওয়ামী লীগের অধীনে বিগত তিন নির্বাচনে এই তিন নেতা নিজেদের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী বলে প্রচার চালান। জাপার চেয়ারম্যান ও দলীয় প্রতীকও অনেক পোস্টারে দেখা যায়নি। তিন নেতার এমন কাণ্ডে জাতীয় পার্টি ভোটের মাঠে নিজেদের অবস্থান হারিয়েছে।
শুধু তাই নয়, প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেও তারা মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছেন। জাতীয় পার্টিকে যে ‘গৃহপালিত বিরোধী দলের’ তকমা দেওয়া হয়েছে, তার মূলে এই তিন নেতার দায় দেখছে তৃণমূল।
সভায় জেলা পর্যায়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেন, ‘এই তিন নেতা কেবল এমপি ও মন্ত্রী হতে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী নেতাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে গেছেন। দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের যতবার স্বকীয় অবস্থান বজায় রেখে স্বতন্ত্র জাতীয় পার্টি গড়তে চেয়েছেন, ততবারই তারা বাধা দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকার বা অন্তর্বর্তী সরকারের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে চেয়ারম্যান সমালোচনা করলে এই তিন নেতা উল্টো সুরে কথা বলেছেন। আওয়ামী লীগের পতনের পরে এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করছেন, যদি পরের নির্বাচনে এমপি হওয়া যায় কোনোভাবে।’
সভায় আরেকজন নেতা বলেন, ‘দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রওশন এরশাদের সঙ্গে জি এম কাদেরের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটিয়েছেন এই তিন নেতা। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবদ্দশাতেই দল ভেঙে দেওয়ার নানা চক্রান্ত তারা করেছেন। তবে সে তৎপরতা সফল হয়নি। চব্বিশের বিতর্কিত নির্বাচনে জাপার অধিকাংশ নেতা অংশ নিতে না চাইলেও এই তিন নেতা ষড়যন্ত্র করেন। তারা জি এম কাদেরকে বাধ্য করেন নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিতে। যার ফলে এখন জাপাকে ফ্যাসিবাদের দোসর বলে অন্য দলগুলো সমালোচনা করছে।’
এ সময় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘যারা জাতীয় পার্টি নিয়ে এতদিন বেচাকেনার রাজনীতি করেছেন, তাদের সঙ্গে নিয়ে আর রাজনীতি করব না।’
গত ২০ মে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সভায় জি এম কাদের জানিয়েছিলেন, ২৮ জুন দলের দশম জাতীয় সম্মেলন (কাউন্সিল অধিবেশন) আয়োজন করা হবে। সে লক্ষ্যে জাতীয় পার্টি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র বরাদ্দ পেতে আবেদন করে। তারা হলও পেয়ে যায়। কিন্তু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি সভা থাকায় সেই আবেদন পরে বাতিল করা হয়। তখন উপযুক্ত ভেন্যু না পেয়ে জি এম কাদের কাউন্সিল অধিবেশনটি স্থগিত করেন কিছুদিনের জন্য। এ সিদ্ধান্তের কথা নির্বাচন কমিশনকেও চিঠি দিয়ে জানান তিনি।
দলের দপ্তর বিভাগ খবরের কাগজকে জানিয়েছে, জুলাই-আগস্টের মধ্যবর্তী কোনো একটি সময়ে জি এম কাদের দলের কাউন্সিল অধিবেশন আয়োজন করতে চান।
তবে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে নারাজ সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কো-চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নু। । তারা পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ২৮ জুন সকালেই পার্টির কাউন্সিল আয়োজন করতে চান। তারা রাজধানীর কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ওই কাউন্সিল অধিবেশন আয়োজন করতে চান। এ নিয়ে তারা নানা তোড়জোড় শুরু করলেও দলের নেতা-কর্মীদের পক্ষ থেকে সাড়া পাচ্ছেন না।
আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারদের ভরসা এখন জাপার দলছুট ও বহিষ্কৃত নেতারা। জানা গেছে, দলের নিষ্ক্রিয় ও বহিষ্কৃত নেতাদের নিয়ে কাউন্সিল আয়োজন করে তারা দুজনে জাপার চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের পদে বসতে চান। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে রওশন এরশাদের নেতৃত্বাধীন দলটির নেতারাও গা-ঢাকা দেন। জাপার শীর্ষ তিন নেতা কাউন্সিল আয়োজন করতে চাইলে তারা এখন সেই অংশের সঙ্গে ভিড়তে চান।
দলের এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দলে ভাঙনের প্রশ্ন যখন জোরদার হচ্ছে, তখন তৃণমূলের নেতারা ঢাকায় এসে জি এম কাদেরকে তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন জুগিয়েছেন।
এখানেই শেষ নয়। গত ২০ মে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সভায় দলের গঠনতন্ত্রের ২০ (ক) ধারা নিয়ে আপত্তি তোলেন ওই তিন শীর্ষ নেতা। তাদের সঙ্গে দু-একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য সুর মেলান। গঠনতন্ত্রের ওই ধারায় দলের চেয়ারম্যানকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে; যাতে দলের প্রয়োজনে তিনি যেকোনো সময় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
তিন শীর্ষ নেতার অভিযোগ, জি এম কাদের এই ধারার অপব্যবহার করছেন। তিনি যখন-তখন যাকে খুশি তাকে দলে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করছেন। তারা এ ধারা রদ করতে চান।
তবে জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতারা বলছেন, এ ধারা নিয়ে যতই সমালোচনা থাকুক, জি এম কাদের ধারাটির অপব্যবহার করছেন না। জি এম কাদেরকে বিতর্কিত করে তাকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে হটাতে অহেতুক বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে।
জাপার তিন শীর্ষ নেতা দলছুট নেতাদের দলে পুনরায় ফেরাতে জি এম কাদেরকে চাপে রাখলেও তৃণমূল তাদের ফেরাতে নারাজ। তারা জি এম কাদেরকে বলেছেন, বিতর্কিত নেতাদের দলে ফেরানো যাবে না কোনোভাবেই। জি এম কাদের তৃণমূলকে আশ্বস্ত করেন।
জি এম কাদেরের স্বেচ্ছাচারিতার অবসান চান সিনিয়র নেতারা
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের স্বেচ্ছাচারিতামূলক কর্মকাণ্ডের অবসান চান দলটির সিনিয়র নেতারা। বুধবার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও কো-চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে দলের নেতা-কর্মীরা দলীয় অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি জানিয়ে এলেও মাননীয় চেয়ারম্যান সেই চাহিদা এড়িয়ে যাচ্ছেন। এই একতরফা সিদ্ধান্তের পেছনে দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্য আছে বলে আমরা মনে করি।’
তারা বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে আহ্বান জানাই, মাননীয় চেয়ারম্যান যেন অবিলম্বে একগুঁয়েমি ও স্বেচ্ছাচারিতার পথ থেকে সরে এসে পল্লি বন্ধুর আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, অনতিবিলম্বে জাতীয় কাউন্সিলের নতুন তারিখ ঘোষণা করেন। সেই কাউন্সিল প্রেসিডিয়ামের সভা আহ্বান করে পুনরায় সিদ্ধান্ত নিয়ে যথাসময়ে কাউন্সিল অধিবেশন আয়োজনে সহযোগিতা করবেন। জাতীয় পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ, শক্তিশালী এবং গণতান্ত্রিক দল হিসেবে পুনর্গঠনের এটাই উপযুক্ত সময়।’
জি এম কাদেরকে উদ্দেশ করে তারা বলেন, ‘দয়া করে দলকে একক সিদ্ধান্ত, গোপনীয়তা এবং দায়বদ্ধতা বিবর্জিত নেতৃত্বের দিকে নয় বরং অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা এবং যৌথ নেতৃত্বের মাধ্যমে ঐক্যের পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করুন।’