আশির দশকের শুরুর দিকের কথা। স্বামী শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হারিয়ে খানিকটা দিশেহারা গৃহবধূ খালেদা জিয়া। দুই সন্তান নিয়ে সংসার সামলাচ্ছিলেন। স্বামীর প্রতিষ্ঠা করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তখন কান্ডারিশূন্যতায় দোদুল্যমান। জ্যেষ্ঠ নেতারা নানাভাবে বুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে দলের দায়িত্ব নিতে রাজি করালেন। তিনি হাল ধরলেন বিএনপির। কাঁটাযুক্ত রাজনীতির মাঠে তাকে পথ চলতে বারবার বেকায়দায় পড়তে হয়। কিন্তু দমে যাননি তিনি। ভয় পেয়ে থমকে দাঁড়াননি। গৃহবধূর আবরণ ঝেড়ে দ্রুতই তিনি হয়ে ওঠেন মাঠের লড়াকু রাজনীতিক। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন শেষ দিন পর্যন্ত। এ জন্য বারবার আটক-গ্রেপ্তার বা জেলে যেতে হয়েছে তাকে। রাজনৈতিকভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে দীর্ঘ সময় অসুস্থতায় ভুগেছেন। বারবার এভাবে চরম প্রতিকূলতার মাঝে পড়লেও শেষনিশ্বাস পর্যন্ত প্রিয় মাতৃভূমিকে আগলে বেঁচে ছিলেন আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে আখ্যায়িত হন খালেদা জিয়া। তিনি বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪৩ বছর। তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য হিসেবে, তিনবার প্রধানমন্ত্রী, আর দুবার বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন।
ওয়ান-ইলেভেনের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়াকে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আরেকবার গ্রেপ্তার করা হয়। এক বছরের বেশি সময় কারাবাসের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি হাইকোর্টের আদেশে মুক্তি পান। তিনি আইনি লড়াই করে সব মামলায় জামিনে মুক্তি পান। কারাগারে থাকাকালে তাকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি যেতে অস্বীকার করেন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে কঠিন সময় আসে বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে। ওই সরকারের আমলে দুটি মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাকে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তাকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ওই বাড়িটিতে ২৮ বছর বসবাস করেছিলেন বেগম জিয়া। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার সেনানিবাসের বাড়িটি তার নামে বরাদ্দ দিয়েছিলেন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। ছোট ছেলে কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় মারা যান। তখন থেকেই বেশ ভেঙে পড়েন খালেদা জিয়া। এরপর ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হলে খালেদা জিয়াকে কারাগারে বন্দি করা হয়। এ নিয়ে মোট ছয়বার গ্রেপ্তার হন বা কারাবন্দি হন খালেদা জিয়া। পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে যাওয়ার আগে গাড়ি থেকে হাত নেড়ে আন্দোলন-সংগ্রামে পাশে থাকা নেতা-কর্মীদের সাহস জুগিয়েছিলেন। শুরু হয় তার দীর্ঘ কারাবাস। ছোট একটি কক্ষে তার সঙ্গে থাকতেন শুধু গৃহকর্মী ফাতেমা। কারাগারে শারীরিক জটিলতা ধীর ধীরে বাড়তে থাকে। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার আবেদন করা হলেও তাতে আওয়ামী লীগ সরকার সাড়া দেয়নি। ২০১৮ সালের ৬ অক্টোবর তাকে প্রথম কারাগার থেকে পিজি হাসপাতালে নেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য দলের পক্ষ থেকে বারবার আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে আবেদন করা হলেও আইনি নানা ব্যাখ্যা-অজুহাত দিয়ে অনুমতি দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে নির্বাসিত হয়ে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে থাকায় মায়ের পাশে থাকতে পারছিলেন না। এরপর করোনা মহামারি দেখা দিলে খালেদা জিয়া ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে কারাগারের বাইরে নিজ বাসায় থাকার অনুমতি পান। কিন্তু এ সময় নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় তার ওপর। যার মধ্যে রাজনীতিতে অংশ নিতে না পারা, বিদেশ যেতে না পারা ইত্যাদি। শেষ দিনগুলোতে শারীরিক নানা জটিলতায় হাসপাতাল থেকে বাসা আবার বাসা থেকে হাসপাতালেই কেটেছে তার সময়। উন্নত চিকিৎসার অভাবে তার শারীরিক জটিলতা ক্রমেই বেড়ে যায়। এর মধ্যে ২০২১ সালের ১১ এপ্রিল করোনা পজিটিভ হন। এরপর তিনি করোনার তিন ডোজ টিকা নেন। ২০২১ সালের ২৫ অক্টোবর তার প্রথম অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের ২৩ জুন তার হার্টে পেসমেকারও বসানো হয়। অনেকবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট নির্বাহী আদেশে সব মামলা থেকে খালাস পান খালেদা জিয়া। এরপর ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান বেগম জিয়া। ১১৭ দিন লন্ডনে অবস্থান ও চিকিৎসা শেষে গত বছরের ৬ মে দেশে ফেরেন তিনি। দৃঢ় মনোবল, দেশপ্রেম ও গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে দেশের মানুষকে ছেড়ে তিনি কখনোই বিদেশ পাড়ি জমাতে চাননি। তাই চরম প্রতিকূলতার মাঝেও দেশের মাটিতেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
স্বাধীনতাযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চৌকস সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে সাধারণ বাঙালি গৃহবধূর মতো জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে নিয়েই বেশির ভাগ সময় ব্যয় করছিলেন। এমনকি তার স্বামী জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হলে তখনো খালেদা জিয়া দেশের রাজনীতি বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে সেভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সামরিক অভ্যুত্থানে শাহাদতবরণ করেন জিয়াউর রহমান। এরপরই বিএনপি এক সংকটময় পরিস্থিতিতে পড়ে। একপর্যায়ে দলের নেতাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগ দেন।
বিএনপির দায়িত্ব নেওয়ার পরই নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়েন খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালে তিনি সাতদলীয় ঐক্যজোট গঠন করে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’র এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। দল ঐক্যবদ্ধ রেখে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন আন্দোলন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনকালে ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া। জেল-জুলুমের পরও আন্দোলন থেকে সরে যাননি বিএনপি চেয়ারপারসন।