নেতৃত্বের টানাপোড়েনে দল ছেড়ে এসে প্রথমে বিতর্কিত কাউন্সিলের আয়োজন করেছিলেন জাপার দলছুট নেতা-কর্মীরা। পরে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের মালিকানা পেতে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। সেখানেই থেমে থাকেননি তারা। গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) গঠন করে নির্বাচনি হাঁকডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সব লড়াই থেমে গেছে। রাজনৈতিক কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়ে এখন কেবল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার নেই দলছুটদের
গত বছরের জুলাই মাসে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের দলের তৎকালীন সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কো-চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নুসহ প্রভাবশালী নেতাদের বহিষ্কার করেন। পদ-পদবি ধরে রাখতে তারা আদালতের দ্বারস্থ হন। কিন্তু আইনি লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হেরে যান তারা।
পরে বহিষ্কৃত অংশের নেতা-কর্মীরা আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে চেয়ারম্যান করে আলাদা দল গঠনের উদ্যোগ নেন। তারা রাজধানীর গুলশানে একটি কাউন্সিল অধিবেশনের আয়োজন করেন নিজেদের ‘আসল জাতীয় পার্টির’ নেতা হিসেবে দাবি করে। ‘আসল জাতীয় পার্টি’ হয়ে উঠতে গেলে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং রুহুল আমিন হাওলাদারকে ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের কর্তৃত্ব পেতে হবে। তাই উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন তারা। সে লড়াই এখনো চলছে।
আনিসুল ইসলাম মাহমুদের আশা ছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই আইনি লড়াইয়ে জিতবেন তিনি, পাবেন লাঙ্গল প্রতীকের কর্তৃত্ব। তবে সে আশা পূরণ হয়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বে এনডিএফ গঠিত হয়েছিল ডিসেম্বরে। এই জোট ঘোষণার কিছু দিনের মধ্যেই এই জোট থেকে ১১৯টি আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে সংকটের শুরু।
নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী, জাপা প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করার এখতিয়ার কেবল জি এম কাদের এবং জাপা মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর। কিন্তু নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সেই আইন অগ্রাহ্য করেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার। জাতীয় পার্টির দলছুট নেতা-কর্মীদের মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করেন তারা। পরে নির্বাচন কমিশন সবার মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেন, আপিলেও যা ফেরত পাননি তারা।
মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পর জাপার দলছুটরা ভোটের মাঠ থেকে ছিটকে পড়েন। এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই তাদের।
এ নিয়ে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে প্রতীক বরাদ্দের বিষয়টি নিয়ে আমরা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি। আদালত শুনানির দিনক্ষণও নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু আমরা জানতে পেরেছি, নির্বাচন কমিশন আদালতকে অনুরোধ করেছেন ভোটের আগে যেন এই শুনানি না হয়। তাদের এই অনুরোধে আদালত লাঙ্গল প্রতীকের বরাদ্দ নিয়ে মামলার শুনানি আরও ছয় সপ্তাহ পিছিয়ে দিয়েছেন। কার্যত আমরা আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের আইনি লড়াই কিন্তু শেষ হয়নি। আমরা লাঙ্গল প্রতীকের আশা ছাড়ছি না। আপাতত আমরা রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যাব।’
এনডিএফ জোট নিয়ে অনেক প্রশ্ন
জুলাই অভ্যুত্থানের পর চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন হঠাৎ জনতা পার্টি বাংলাদেশ নামে রাজনৈতিক দলের জন্ম দেন। এই দল গঠনের নেপথ্যে ছিলেন বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদ। বিভিন্ন দল ভেঙে আসা নেতারা এই দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু ছয় মাস পেরোতে না পেরোতেই রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে শওকত মাহমুদ গ্রেপ্তার হন। এরপর দলটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। এই দলের নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা গোলাম সারওয়ার মিলন তখন নতুন রাজনৈতিক মোর্চা গঠনের আভাস দেন। এরশাদ সরকারের শিক্ষা উপমন্ত্রী মিলন জাপা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টিতেও (রওশন) যোগ দিয়েছিলেন। বারবার দল বদলানো এই নেতা রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয় থাকতে ফের জাপা নেতাদের দ্বারস্থ হন। জাপার দলছুটরা ভরসা জোগান তাকে। গঠিত হয় এনডিএফ। পরে এই জোটে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জেপি, সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটসহ তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (বিএনএম) দলছুট নেতাদের যুক্ত করা হয়। এনডিএফ জোটে জাতীয় পার্টির সাবেক এমপিদের পাশাপাশি বিভিন্ন দলের সাবেক এমপিদেরও দেখা গেছে। এনডিএফ জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়া বিভিন্ন দলের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজনীতির ময়দানে ক্রমেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া সাবেক এমপিরা জনবিচ্ছিন্নও হয়ে পড়েছেন। কেবল আলোচনায় থাকতে নতুন রাজনৈতিক মোর্চা গঠন করেছেন।
১৪ দলের শরিক জেপির অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি আওয়ামী লীগঘেঁষা জাপা নেতাদের নির্বাচনকেন্দ্রিক সক্রিয়তায় প্রশ্ন ওঠে রাজনৈতিক অঙ্গনে। ১৪ দলের শরিক ও জাপা নেতারা যখন প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রয়েছেন, তখন এনডিএফ নেতারা রাজধানীর গুলশানে প্রকাশ্যেই সভা করছিলেন। তারা যখন নির্বিঘ্নে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন তখন কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় অফিসে কয়েক দফায় আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা, চলে ভাঙচুর ও লুটপাট।
এ সময় গুঞ্জন ওঠে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অংশ এনডিএফ নেতাদের সমর্থন জোগাচ্ছে। অনেকে অভিযোগ করেন, সরকারের সমালোচনায় মুখর জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে দমিয়ে রাখতে চেয়েছিল সরকারের এই অংশ। দলছুট ও বহিষ্কৃত নেতাদের জোটকে ‘আর্থিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার’ অভিযোগও আসে নানা মহল থেকে। সরকারের ওই অংশটি এনডিএফ নেতাদের ভোটের প্রচারণায় সহযোগিতা, এমপি হিসেবে জিতিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে এনডিএফ নেতারা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমীকরণ মেলাতে পারেননি।
এনডিএফ জোটের ১৮টি দলের মধ্যে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টি (জেপি) এবং আবু লায়েস মুন্নার সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট নিজস্ব প্রতীকে আলাদা আলাদাভাবে নির্বাচন করছে। জোটের অনিবন্ধিত কয়েকটি দলের নেতারা এ দুটি দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন।
শেষ পর্যন্ত এনডিএফ কী করবে, এ নিয়ে যখন অনেক শঙ্কা; তখন জোটের চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘আমরা না হয় নির্বাচন করতে পারছি না। কিন্তু জোটের অন্য দলগুলো তো নির্বাচন করছে। তারাই আমাদের জোটের প্রতিনিধিত্ব করছে। আর এনডিএফ কি শুধু এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠন করা হয়েছে? এটি ভবিষ্যতের রাজনীতির কথা ভেবেই গঠন করেছি আমরা। নির্বাচনের পরে আমরা নানা কার্যক্রম নিয়ে সক্রিয় থাকব।’
অনেকে ফিরছেন মূল দলে
জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কারের পর সাবেক সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ ভিড়েছিলেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদের দলে। তারা এখন নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে মূল দলে ফিরে আসছেন। জাপার আলোচিত নেতা জিয়াউল হক মৃধা ফিরে এসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জাপার মনোনয়ন পেয়েছেন। ফিরে এসে ময়মনসিংহ-৮ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন এই আসনের সাবেক এমপি ফখরুল ইমাম। কুড়িগ্রাম-২ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন পনির উদ্দিন আহমেদ।
এ বিষয়ে জাপা মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘দল থেকে চলে যাওয়া কেউ যদি ফিরে আসেন, তবে তার অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনা করা হবে। দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা তাদের ফিরিয়ে নিতে বললে তা আমরা বিবেচনা করব। দল থেকে চলে যাওয়া নেতা-কর্মীরা বুঝতে পারছেন, জাতীয় পার্টির রাজনীতি করতে হলে জি এম কাদেরের নেতৃত্ব তাদের মেনে নিতে হবে।’