১৮৮৬ সাল থেকে ২০২৫। বছরের হিসাবে ১৩৯ বছর। এই সময়কালে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত যে দিনটা স্বপ্নের বার্তা আর সংগ্রামের পতাকা নিয়ে শ্রমজীবী মানুষ পালন করে তা হলো মে দিবস। গোটা পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি নিয়ে কত পার্থক্য। কিন্তু মে দিবস তাদের অধিকারের চেতনায় ঐক্যের বাঁধনে বেঁধেছে।
এমন কোনো দিনের কথা পৃথিবীর কোথাও কেউ ভাবতেই পারবেন না যে, দিনটা শ্রমিকের সহায়তা ছাড়া তিনি কাটিয়ে দেবেন। শ্রম যারা দেন বা শ্রম করে জীবন নির্বাহ করেন যারা, তাদের শ্রমিক বলা হয়। এই শ্রমিকরাই গড়ে তুলছেন সম্পদ ও সভ্যতা। কিন্তু দেশে দেশে সম্পদ বাড়লেও সম্পদ তৈরির অন্যতম কারিগর শ্রমিকরা কি তার সুফল পান? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই শ্রমিক আন্দোলনের জন্ম।
মে দিবসের দাবি ছিল ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম আর ৮ ঘণ্টা জীবন বিকাশের জন্য বিনোদন চাই। মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য কাজ যেমন দরকারি, জীবনের ও সমাজের সর্বাঙ্গীন বিকাশের জন্য অবসরটাও তেমনি প্রয়োজন। শিল্পবিপ্লব উৎপাদন বৃদ্ধির নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে, প্রয়োজন হয়েছে বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের। জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য হতে লাগল শ্রমজীবী মানুষ।
মালিকরা মুনাফা বাড়াতে শ্রমঘণ্টা বাড়ানোর জন্য শ্রমিকদের ওপর যে চাপ প্রয়োগ করত তা শ্রমিকদের জীবন একেবারে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা সর্বত্রই কর্মঘণ্টা কমানোর দাবিতে বড় বড় শ্রমিক আন্দোলনে শ্রমিকরা রাজপথে নেমে এসেছিল।
১৮৮৬ সালে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি তাই কোনো তাৎক্ষণিক দাবিতে গড়ে ওঠা আকস্মিক আন্দোলন ছিল না। ৮ ঘণ্টা কর্মসময়ের দাবিতে ১৮৮৬ সালের ১ মে ও ৪ মে আন্দোলন এবং শ্রমিক নেতাদের ফাঁসির ঘটনায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কংগ্রেস ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালনের ঘোষণা দেয়। ১৯১৯ সালে আইএলও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস এবং ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে মে দিবসে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয় এবং তা জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
একটা প্রশ্ন বারবার জেগে ওঠে, শ্রমিকের শ্রমে উৎপাদিত হয় ব্যবহার উপযোগী দ্রব্যসামগ্রী কিন্তু তা ভোগ করার অধিকার শ্রমিকের কতটুকু? অর্থনীতির প্রতিটি সূচকের উন্নতি ঘটানোর পেছনেই থাকে শ্রমিকের ঘাম। কিন্তু সবচেয়ে কম পুষ্টি, কম শিক্ষা, কম স্বাস্থ্য সুবিধা, কম বিশ্রাম, কম নিরাপত্তা যেন শ্রমিকদের জন্যই বরাদ্দ।
অথচ সারা বিশ্বেই খাদ্য উৎপাদনসহ ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন বাড়ছে। বাংলাদেশেও জিডিপি বৃদ্ধির হার, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পরিমাণ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ উন্নয়ন যত বাড়ছে তার সঙ্গে এ কথাটাও যুক্ত হয়ে আছে- বাংলাদেশ সস্তা শ্রমিকের দেশ। শ্রমিকের মজুরি কম, তার কারণ নাকি বাংলাদেশের শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা কম।
কিন্তু উৎপাদনশীলতা শুধু শ্রমিকের শ্রমশক্তির ওপর নির্ভর করে না। মেশিন, ম্যানেজমেন্ট এবং ম্যানপাওয়ার- এই তিন ‘এম’ যুক্ত আছে উৎপাদনশীলতার সঙ্গে। একটি সহজ উদাহরণ থেকেও বিষয়টা বোঝা যাবে। রিকশাচালক অনেক পরিশ্রমী কিন্তু তার চেয়ে কম পরিশ্রম করেও সিএনজিচালকের উৎপাদনশীলতা অনেক বেশি। শিক্ষিত শ্রমিক, প্রশিক্ষিত শ্রমিক, দক্ষ শ্রমিক যাই বলি না কেন, শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন শ্রমিকের আয় এবং অবসর।
আয় বাড়লে খাদ্য ও পুষ্টি গ্রহণ বাড়বে এবং অবসর সময় পেলেই তো শ্রমিক তার দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পাবে। তা যেমন সমাজের অগ্রগতি সৃষ্টি করবে তেমনি বৈষম্য কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে। কিন্তু শোষণ থাকলে তা তো সম্ভব নয়। এর ফলে একদল মানুষ যারা উৎপাদন যন্ত্র যেমন কারখানা ও পুঁজির মালিক তারা দিন দিন ফুলেফেপে ওঠে আর শ্রমশক্তির মালিক শ্রমিক হারায় তার কর্মশক্তি। শোষণমূলক সমাজ যেমন বঞ্চিত করে শ্রমজীবীকে তেমনি জন্ম দেয় বিক্ষোভ ও বিদ্রোহের। মে দিবসের সংগ্রাম ছিল তেমনি এক বিদ্রোহ, যা শুধু শ্রমিকদের দাবিতে নয়, সমাজের বিকাশের প্রয়োজনে সংঘটিত হয়েছিল। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে অগাস্ট স্পাইস যে ঐতিহাসিক উক্তি করেছিলেন তা আজও আমাদের আলোড়িত করে। তিনি বলেছিলেন, ‘The time will come when our silence will be more powerful than the voices you strangle today.’
একটা বিষয় স্পষ্ট যে, অর্থনীতির প্রতিটি সূচকের উন্নতি ঘটানোর পেছনেই থাকে শ্রমিকের ঘাম। কিন্তু সবচেয়ে কম পুষ্টি, কম শিক্ষা, কম স্বাস্থ্য সুবিধা, কম বিশ্রাম, কম নিরাপত্তা যেন শ্রমিকদের জন্যই বরাদ্দ। বাংলাদেশেও জিডিপি বৃদ্ধির হার, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পরিমাণ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ উন্নয়ন যত বাড়ছে তার সঙ্গে এ কথাটাও যুক্ত হয়ে আছে, বাংলাদেশ সস্তা শ্রমিকের দেশ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন সত্ত্বেও শ্রম শোষণ বন্ধ না হলে মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে বিপুল সম্পদের পাহাড় জমতে থাকবে। আটজন অতি ধনীর হাতে বিশ্বের অর্ধেক মানুষের সম্পদের সমান সম্পদ দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না শোষণ কত আন্তর্জাতিক রূপ নিয়েছে। আফ্রিকার কয়লা, লোহা, মধ্যপ্রাচ্যের তেল, লাতিন আমেরিকার কফি আর এশিয়ার শ্রমিক সবই তো শোষণ-লুণ্ঠনের জালে আবদ্ধ। করোনা মহামারির সংক্রমণ আর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নামে রোবটনির্ভর শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সবই বৈষম্যকে প্রকট করে তুলছে। বাংলাদেশ ৭ কোটি ৪০ লাখ শ্রমজীবীর দেশ। এ দেশে শ্রমিকের জীবনমান উন্নত না করে কোনো উন্নয়ন স্থায়ী ও মানবিক হবে না।
পৃথিবীতে যুদ্ধ হয় প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের জন্য। বাজার দখলের জন্য হয়েছিল দুটি ভয়ংকর বিশ্বযুদ্ধ। সম্পদ তৈরি করে শ্রমিক, যুদ্ধের অস্ত্রও তৈরি করে শ্রমিক আবার যুদ্ধে জীবন দেয় শ্রমিকের সন্তান। যুদ্ধে ধ্বংস হয় সম্পদ, ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থনীতি। তেমনি ঘটনা ঘটে মহামারির সময়। যুদ্ধ অথবা মহামারির পর পৃথিবী যে ঘুরে দাঁড়ায় তা আবার শ্রমিকের শ্রমের ফলেই। যুদ্ধের বলি হয় শ্রমজীবী মানুষ, দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে জর্জরিত হয় শ্রমজীবীরাই বেশি। বর্তমানেও যে নতুন শ্রম পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে তাতে উৎপাদন বাড়বে বিপুল কিন্তু এর ফলে বেকারত্বের সংখ্যাও বাড়বে পাল্লা দিয়ে।
নতুন ধরনের কাজে নতুন দক্ষতার দরকার হবে। প্লাটফর্ম ইকোনমি এবং গিগ ইকোনমি নামক নতুন ধরনের কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ৪৫০ ধরনের কাজ আছে এবং আরও নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র ও কাজের ধরন তৈরি হচ্ছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজের ধরন ও শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে, দেশের ৪৬ সেক্টরের মজুরি বোর্ড দিয়ে সব শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। নতুন নতুন যেসব কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে শ্রম আইন ও বিধি দ্বারা, সেসব খাতের শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, গিগ ইকোনমি, প্লাটফর্ম ইকোনমির যুগে শ্রমিকের সংজ্ঞা, কাজের নিশ্চয়তা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, কর্মসময় আর ন্যায্য মজুরি, মজুরি বৈষম্য, পেনশন, মাতৃত্বকালীন অধিকারের সাম্যসহ নতুন নতুন বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে হলে মে দিবসের চেতনায় নতুন করে ভাবতে হবে সমস্যাগুলোকে।
বাংলাদেশ এক অর্থে আন্দোলনের দেশ। আর এ দেশের প্রতিটি আন্দোলনে জীবন ও রক্ত দিয়েছে শ্রমিকরা। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান- কোথায় নেই শ্রমিকের অংশগ্রহণ ও জীবনদানের ঘটনা? বৈষম্যের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শ্রমিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রমাণ করে বৈষম্যের বেদনা শ্রমিকদের জীবনে কত তীব্র। মে দিবসের চেতনায় শ্রমিকদের জীবন থেকে এ বৈষম্য দূর করার অঙ্গীকার ঘোষিত হোক।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]