শিক্ষা নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট নয়। শিক্ষায় চলমান অস্থিরতা, বহুমাত্রিক দ্বন্দ্ব, চরম সিদ্ধান্তহীনতা আর প্রতিহিংসা এখানে মূল সমস্যাকে উসকে দেয়। এ প্রবণতা চলমান থাকায় দিনের পর দিন সমস্যা দূরীভূত না হয়ে হয়ে ওঠে ঘণীভূত। বিগত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে একাধিক রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। দুঃখের বিষয় কোনো শাসন সংগঠনই শিক্ষা নিয়ে টেকসই পরিবর্তনের জন্য কিছু করেনি। দেশের পরিবর্তনের সঙ্গে চলমান বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারেনি। শিক্ষাকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করাতে পারেনি। এটাকে অদূরদর্শী রাজনীতির ফল বললেও আপাতদৃষ্টিতে ভুল বলা হবে না। দুর্বল পরিকল্পনা ও দুর্বল আর্থিক সামর্থ্যে বিনিয়োগ এ সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলেছে বহু গুণ। বিশ্বায়নের এ যুগে আমরা আমাদের শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা নিয়ে যেভাবে এগিয়েছি তাতে জোর গলায় বলা যায়, এটা পরিবতর্নের জন্য আমাদের জন্য শাপেবর হয়ে উঠেছে।
যেখানে শাসন সংগঠনই রাষ্ট্রের শিক্ষাসহ সামগ্রিক সমস্যা সমাধানের মেকানিজম ঠিক করে, সেখানে রাষ্ট্রই সমস্যাগুলোকে বাড়িয়ে তুলেছে। সরকার পরিবর্তনের ফলে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও শক্তি এখন শিক্ষার জন্য বিষফোঁড়া। ক্ষমতায় গেলেই সবাই আগে শিক্ষাকে আক্রমণ করে পোস্টমর্টেম করে। কাটাছেঁড়া করার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সব সমস্যাকে লেজেগোবরে করে ফেলে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে এই বিষফোঁড়া পেকে টনটনে হয়ে আছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতা অনেক। অন্তর্বর্তী সরকার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে শিক্ষার জন্য অনেক কিছু করতে গিয়ে আদতে কিছুই করতে পারেনি। দেশের জাল সনদধারী শিক্ষক চিহ্নিত করে তাদের অপসারণ করে শূন্য পদ পূরণের সিদ্ধান্ত ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের কাজের অংশ। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আটকে গেছে সে প্রক্রিয়া।
গত জানুয়ারিতে যাচাই-বাছাই শেষ করে সরকার ১৭৮৩টি প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় সুবিধার আওতায় আনার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটাও এখন অন্ধকারে। এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওর জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে প্রতিশ্রুত অর্থও ছাড় করেছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঘটে যায় উল্টো ঘটনা। এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওর নামে বরাদ্দকৃত অর্থ সরকার অন্য খাতে খরচ করেছে। ১৭৮৩টি প্রতিষ্ঠানকে এমপিও না দেওয়ার কারণ হিসেবে সরকার জোর গলায় বলেছে, বিগত সরকারের শেষ সময় এসে শিক্ষা দপ্তর ও আমলারা মিলে তড়িঘড়ি করে উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান বাছাই করে এমপিওর তালিকা করেছে বলে এগুলো নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বিগত কয়েক সপ্তাহে ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের এসব নিয়ে নানা টালবাহানা ইতোমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে চোখে পড়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যাচাই করার এ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাপেক্ষই নয়, এটা সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তহীনতা ও সমন্বয়হীনতার চূড়ান্ত ফল। এতে সরকারের শিক্ষার প্রতি বিদ্বেষ অনাগ্রহের চিত্র ফুটে ওঠে। শুধু এটাই নয়, প্রতিটি দপ্তরে নিজেদের সমর্থিত দলীয় লোক বসানোর নীল নকশা শুরু করেছে সরকার। ঔপনিবেশিক আমলে দেশ দখলের চেয়ে চেয়ার দখলের এ প্রবণতা ভয়ংকর।
২৬ এপ্রিল বিকেলে হঠাৎ এনটিআরসির চেয়ারম্যানকে বদলি করা হয়েছে। রাতে সরকার আটকে দিয়েছে ১৪৩৮৪ জন প্রাইমারি শিক্ষকের যোগদান প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জটিলতার কারণে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে পুরো প্রক্রিয়াটি। এখানে সরকার কারণ হিসেবে পুরোনো কাসুন্দিকেই বারবার সামনে আনছে। সরকার এখানে স্পষ্ট অবস্থান তুলে না ধরলেও তারা আপেক্ষিক অর্থে বলছে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে অন্তর্বর্তী সময়ে এতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি উৎকোচ, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব বিস্তারের সুযোগ ছিল বিধায় সরকার এটা নিয়ে নতুন করে তদন্ত কমিটি করে বিষয়টি খতিয়ে দেখবে, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সুপারিশের ওপর ভর করে সরকার যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করে শিক্ষকদের যোগদান করাবে বলে জানিয়েছে সরকার। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত সব সময় শিক্ষার জন্য অনুকূলে না গিয়ে প্রতিকূলে কাজ করে।
সরকার যায় সরকার আসে কিন্তু রাজনৈতিক কালচারের কোনো পরিবর্তন আসে না। সরকার ক্ষমতারোহণের আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একজন মন্ত্রী জোর গলায় বলেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে শিক্ষকদের রাস্তায় আসতে হবে না। অথচ বাস্তবতা হলো শিক্ষকরা আগেও ছিল রাস্তায়, এখনো আছে রাস্তায়। সরকার শিক্ষার সমস্যা সমাধানের জন্য যতটুকু আন্তরিক তার চাইতে সমস্যা সৃষ্টিতে অনেক বেশি সিদ্ধহস্ত। শুধু এটুকুতেই শেষ নয়, ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিগত ৩৪ বছর ধরে বেতনবঞ্চিত বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্সের ৩৫০০ জন শিক্ষক-কর্মচারী। চলতি বছরের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মান্থলি পেমেন্টের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্তমান সরকারের চোখ রাঙানিতে থমকে আছে সে প্রক্রিয়া। এবং দীর্ঘ বঞ্চনা ও বৈষম্যের মুখে কর্মরত এসব শিক্ষকের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
অবস্থাদৃষ্টিতে মনে হয়, শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি কোনো সরকারের জন্য সুখকর না হলেও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সেটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রতিহিংসাপরাণয়তার কারণেই এ অনিশ্চয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতা। যার কারণে থমকে গেছে পুরো শিক্ষা কার্যক্রমের উন্নয়ন প্রক্রিয়া। দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তা ও কার্যকর পরিকল্পনাই আমাদের শিক্ষা নিয়ে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দেবে, এমন প্রত্যাশা সবার।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও শিক্ষা গবেষক
[email protected]