আজকের শিশু আগামীদিনের ভবিষ্যৎ। কথাটি বহুল প্রচারিত এবং বাস্তবেও সত্য। আবার গত শতকের বাঙালি কবি গোলাম মোস্তফা বলেছেন, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’। অর্থাৎ প্রতিটি শিশুই একদিন বাবা হবে এবং পরিবার ও দেশের দায়িত্ব বুঝে নেবে। ফলে দেশ ও জাতিকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য শিশুদের নৈতিক জ্ঞানসমৃদ্ধ সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আগেকার শিশু এবং বর্তমান শিশুর মধ্যে রয়েছে চিন্তাচেতনা এবং মনোজগতে বেশ পার্থক্য। আগের শিশুরা লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিকচর্চা এবং ধর্মচর্চায় যথেষ্ট মনোযোগী ছিল। এ ছাড়া কৃষি ও গৃহস্থালির কাজে বাবা-মাকে শিশুরা দারুণভাবে সহযোগিতা করত। বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অনুশাসনের কারণে শিশুরা পড়ালেখায় ছিল অত্যন্ত মনোযোগী। পড়ালেখার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে খেলাধুলা এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার অবারিত সুযোগ ছিল। বিকেলে খেলাধুলা শেষে সন্ধ্যা হলে প্রত্যেক শিশু বাড়ি ফিরে এসে পড়ালেখায় মনোযোগ দিত। শিশুরা ছিল বাবা-মায়ের ভীষণ অনুগত।
পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত সুদৃঢ় থাকার কারণে শিশুরা আগে বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া ছিল বাঙালি সংস্কৃতির একটি বিরাট ঐতিহ্য। এর ফলে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে শিশুদের একটা সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে। আগের শিশুরা বড়দের এবং শিক্ষকদের অত্যন্ত সমীহ করতে।
অতীতে অধিকাংশ পরিবারে আর্থিকসংকটের কারণে শিশুদের পোশাক-পরিচ্ছদে তেমন বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়নি। মাদকের থাবা এবং অতিরিক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার না থাকার কারণে আগের শিশুরা মানসিকভাবে খুব শক্ত ছিল। বলতে গেলে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত শিশুরা পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বলয় বা সুরক্ষার মধ্যেই ছিল। তখনকার শিশুরা বাঙালি সংস্কৃতি ধারণ করে বড় হয়েছে। শিক্ষক, অভিভাবক এবং সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অনুশাসন শিশুদের অনুসরণ করতে দেখা গেছে। ফলে ওই সময়ের শিশুরা যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে তখন সুস্থ-সবল নাগরিক হিসেবে তারা দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়েছে। সে সময় কিশোর গ্যাং তেমন পরিলক্ষিত হয়নি এবং কিশোর অপরাধের সংখ্যাও ছিল কম। তাই শিশুদের নিয়ে পরিবারের বাড়তি কোনো চিন্তা বা চাপ ছিল না।
কিন্তু বর্তমান সমাজব্যবস্থায় বিভিন্ন অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং দেখা দিয়েছে নানা ক্ষেত্রে অসম প্রতিযোগিতা। অতিরিক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাদকের কালো থাবা শিশুদের মানসিক অবস্থাকে অস্থির করে তুলছে। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার যথেষ্ট সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকা, ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা এবং পরীক্ষায় হরহামেশাই পাস করে দেওয়ার কারণে অধিকাংশ শিশু পড়ালেখার মধ্যে নেই বললেই চলে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে দেখা দিয়েছে অসম্ভব রকমের অসঙ্গতি। শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে বিভিন্ন খেলার মাঠে শিশুদের আগের মতো খেলাধুলা করতে দেখা যায় না। রয়েছে খেলার মাঠেরও সংকট। বলতে গেলে হারিয়েই গেছে গ্রামীণ খেলাধুলা এবং সংস্কৃতিচর্চা। ফলে শিশুরা পড়ালেখা, খেলাধুলা এবং সংস্কৃতিচর্চার পরিবর্তে মোবাইলে আসক্ত হয়ে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে মোবাইল নিয়েই সময় পার করছে। বাসার খাবারের পরিবর্তে বাইরের ফাস্টফুডের দিকে ঝুঁকে পড়েছে অধিকাংশ শিশু।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অতিমাত্রায় দুর্বৃত্তায়নের কারণে রাষ্ট্র শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান শিশুরা তথ্যপ্রযুক্তি এবং মাদকে অতিমাত্রায় আসক্ত হওয়ার কারণে বাব-মা, শিক্ষক এবং সমাজের মুরব্বিদের সঙ্গে সম্পর্কের দারুণ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বেড়েছে কিশোর গ্যাং এবং কিশোর অপরাধ। শিশুদের মানসিক বিপর্যের কারণে অনেক শিশু তাদের বাবা-মাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মধ্যে রেখেছে। এমনকি শারীরিকভাবে নির্যাতনও করছে। মানসিকভাবে অসুস্থ শিশুর নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক বাব-মা নিজ সন্তানের হাতেই জীবন দিচ্ছেন। এমন ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে।
বর্তমান শিশুরা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় কোনো বিধিনিষেধের মধ্যে নেই বললেই চলে। অবাধে চলাফেরার সুযোগ পাচ্ছে। সে কারণে পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে শিশুদের সম্পর্কের অসম্ভব রকমের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে রাখার জন্য রাষ্ট্রের তেমন কোনো গ্রহণযোগ্য উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। বরঞ্চ এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের এক ধরনের গাফিলতি এবং গা-ছাড়া ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। অভিভাবকরা প্রতিনিয়ত শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং চিন্তিত। শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্য তেমন কোনো উদ্যোগ না থাকার কারণে অভিভাবক মহল খুবই চিন্তিত এবং শঙ্কিত। অতি দ্রুত পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্র শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সামাজিক সুরক্ষা বলয় গড়ে না তুললে আমরা একটি অসুস্থ মেধাহীন জাতি পেতে যাচ্ছি, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকার জন্য নীতিবান বিজ্ঞানমনস্ক জনগোষ্ঠীর কোনো বিকল্প নেই। শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। অতিমাত্রায় প্রযুক্তির ব্যবহার কমাতে হবে এবং শিশুদের খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চায় মনোযোগী করে তুলতে হবে। মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শিশুশ্রম রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। পথশিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।
অভিভাবক, শিক্ষক এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শিশুদের বাঙালি সংস্কৃতির আদলে গড়ে তুলতে হবে। তাই রাষ্ট্রের সর্বাগ্রে উচিত শিশুদের নৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মনোযোগী হওয়া। অন্যথায় জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠন কখনো সম্ভব হবে না।
লেখক: কবি ও লেখক
[email protected]