রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আমাদের জন্য রয়েছে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ। নবিজি (সা.) ছোট-বড় সব বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। ২৪ ঘণ্টা যাপিত জীবন আমরা কীভাবে কাটাব তা সবিস্তারে বলে দিয়েছেন। সালমান ফারসি (রা.) বলেন, ‘একবার তাকে বলা হলো, তোমাদের নবি (সা.) তোমাদের সব কাজই শিক্ষা দেন; এমনকি প্রস্রাব-পায়খানার পদ্ধতিও! তিনি বললেন, হ্যাঁ, তিনি আমাদের নিষেধ করেছেন পায়খানা বা প্রস্রাবের সময় কিবলামুখী হয়ে বসতে, ডান হাত দিয়ে শৌচকার্য করতে, তিনটি ঢিলার কম দিয়ে শৌচকার্য করতে এবং গোবর বা হাড় দিয়ে শৌচকার্য করতে।’ (মুসলিম, ৪৯৯)
বসে প্রস্রাব করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানবীয় প্রয়োজন পূরণে শরীর ও স্বাস্থ্যের আরামের প্রতি লক্ষ রেখেছেন। তাঁর অন্যতম একটি সুন্নাহ হচ্ছে, বসে প্রস্রাব করা। আমাদের সমাজের অনেকের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার প্রবণতা রয়েছে। তারা দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে নিষেধ করেছেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘কেউ যদি তোমাদের বলে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতেন, তবে তোমরা তা সত্য বলে বিশ্বাস করো না। তিনি বসা ছাড়া প্রস্রাব করতেন না।’ (তিরমিজি, ১২)
বসে প্রস্রাব করাই স্বাস্থ্যসম্মত
অনেকেই মনে করে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করাই সভ্যতা ও ভদ্রতা। কিন্তু আমাদের নবি (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন বসে প্রস্রাব করার জন্য। তাহলে আমি দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা সভ্যতা বা ভদ্রতা কীভাবে মনে করি। আর বর্তমান বিজ্ঞানও এ কথা স্বীকার করে যে, দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। ডাক্তাররাও বলেন, বসে প্রস্রাব করাই স্বাস্থ্যসম্মত।
চিকিৎসকরা বলছেন, দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার ফলে প্রস্রাবের থলি সরু ও লম্বা হয়ে ঝুলতে থাকে। এর কারণে প্রস্রাবের দূষিত পদার্থগুলো সেই থলির নিচে জমা হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি বসে প্রস্রাব করে তাহলে বসার কারণে সেই থলিতে চাপ লাগে, ফলে সহজেই সেই দূষিত পদার্থগুলো বের হয়ে যায়।
জটিল রোগে আক্রান্ত
যারা নিয়মিত দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে তারা বার্ধক্যে নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হন। কারণ, দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার কারণে পেটের ওপর কোনো ধরনের চাপ পড়ে না। আর এই চাপ না পড়ার কারণে পেটের ভেতরে যদি কোনো দূষিত বায়ু থাকে তা ওপরের দিকে উঠে যায় এবং এটি রক্তচাপ হৃদযন্ত্রের স্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। এভাবে সবসময় যদি চলতে থাকে, শেষ বয়সে জটিল রোগে আক্রান্ত হতে হয়।
তাছাড়া প্রস্রাব হলো রোগ-জীবাণু দ্বারা পরিপূর্ণ একটি পদার্থ। কখনো এর মধ্যে রোগের কারণে মূত্রদ্বারে জ্বালাপোড়া, পুঁজ, রক্ত নির্গত হওয়া ও কিডনিতে ইনফেকশন ইত্যাদি বিদ্যমান থাকার কারণে তা প্রস্রাবের সঙ্গে বিদ্যমান থাকে। অতএব দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করলে এর ছিটা শরীর ও কাপড়ে লেগে যায়।
কখন দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা যাবে
অসুস্থতার দরুন কিংবা বসার মতো সুন্দর জায়গা না থাকলে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করার অনুমতি রয়েছে। তবে এটি অভ্যাসে পরিণত করা যাবে না। শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য কোনো কারণ ছাড়া দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা মাকরুহ; আর এটাই হানাফি মাজহাবের মত। (ফতোয়ায়ে শামি, ১/৩৪৪; ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ১/৫০)। হুজাইফা (রা.) বলেন, ‘নবি (সা.) একবার গোত্রের আবর্জনা ফেলার স্থানে এলেন। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করলেন। তারপর পানি চাইলেন। আমি তাঁকে পানি নিয়ে দিলাম। তিনি অজু করলেন।’ (বুখারি, ২২৪)
বসে প্রস্রাব করাই ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অভ্যাস। এই একটি মাত্র স্থানেই তাঁর অভ্যাসের ব্যতিক্রম পাওয়া যায়। এর কারণ সম্পর্কে আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোমর ব্যথার কারণে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করেছেন। (বায়হাকি, হাকেম) সুতরাং প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের উচিত সচেতনভাবে যেকোনো পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা থেকে বিরত থাকা।
লেখক: আলেম ও মাদরাসা শিক্ষক