রাসুলুল্লাহ (সা.) ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসে পৃথিবীতে শুভাগমন করেন। তাঁর জন্মের প্রাক্কালে ও জন্মের পরে অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। এখানে ১০টি ঘটনা তুলে ধরা হলো—
মুহাম্মাদ (সা.)-এর জন্মের আগে আরবে বেশ কয়েক বছর দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। তাঁর জন্মের বছর আরবের সেই দুর্ভিক্ষ কেটে যায়।’ (আস-সিরাতুল হালাবিয়া, ১/৭৮)নবি (সা.)-এর জন্মের ৪০/৫০ দিন আগে আবরাহার হস্তীবাহিনীর ধ্বংসের ঘটনা ঘটে। আল্লাহতায়ালা তাদের ক্ষুদ্র কিছু পাখির মাধ্যমে নাশ করে দেন।’ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৩২৪)
তাঁর জন্মের সময় পারস্যের কিসরার রাজপ্রাসাদে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। এই ভূমিকম্পে রাজপ্রাসাদের ১৪টি গম্বুজ ভেঙে যায়। পারস্যের যে অগ্নিকুণ্ড এক হাজার বছরব্যাপী বিরতিহীনভাবে জ্বলছিল, তা নিভে যায়। বুহায়রা সাওয়া নামক বিশাল জলাশয় আচমকা শুকিয়ে যায়।’ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৩২৮)
মুহাম্মাদ (সা.) গর্ভে আসার পর মা আমেনা বিনতে ওয়াহাব স্বপ্নে দেখেন, ‘তার কাছে কোনো এক অপরিচিত আগন্তুক এসে বলেন, ‘তুমি যাকে গর্ভে ধারণ করেছ তিনি এ যুগের মানবজাতির মহানায়ক। তিনি যখন জন্ম নেবেন তখন তুমি বলবে, ‘সকল হিংসুকের অনিষ্ট থেকে এ শিশুকে এক ও অদ্বিতীয় প্রভুর আশ্রয়ে সমর্পণ করছি। তাঁর নাম রাখবে মুহাম্মাদ।’ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ২/৩২৩)
আমেনা বিনতে ওয়াহাব বলেন, ‘মুহাম্মাদ আমার গর্ভে আসার পর থেকে প্রসব পর্যন্ত আমি কোনো কষ্ট অনুভব করিনি। প্রসবের সময় তার সঙ্গে একটি নুর বা আলো বের হয়, যা পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সব আলোকিত করে তোলে। আমার গর্ভ থেকে বের হওয়াকালে তিনি মাটিতে হাত দেন। অতঃপর এক মুঠো মাটি নিয়ে আসমানের দিকে উঁচু করেন।’ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৩২৩)
ফাতেমা বিনতে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের সময় আমি মা আমেনার কাছে ছিলাম। আমি দেখলাম, আমেনার ঘরটি আলোয় আলোকিত হয়ে গেল। আকাশের সব তারকা নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ল। আমার মনে হতে লাগল, তারকাগুলো যেন আমার ওপর এসে পড়বে।’ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৩২২)
মুয়াবিয়া ইবনে সালিহ (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মানিত মা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শুভজন্মক্ষণে এক নুর দেখেন, যা দিয়ে সিরিয়া এলাকার প্রাসাদগুলো উজ্জ্বলভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।’ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৩৭৫)
হাসসান বিন সাবেত (রা.) বলেন, ‘আমি সাত বা আট বছরের শিশু ছিলাম। আমি যা দেখতাম ও শুনতাম তা অনুধাবন করতে পারতাম। একদিন সকালে এক ইহুদি চিৎকার করে বলতে লাগল, হে ইহুদি সম্প্রদায়, তোমাদের জন্য ধ্বংসের কথা হলো যে আহমদের তারকা উদিত হয়েছে, আজ রাতেই তার শুভাগমন ঘটেছে।’ (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস: ৪১৭৭)
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘বিশ্বনবি (সা.)-এর জন্মগ্রহণের সময় এক ইহুদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে মক্কা নগরীতে বসবাস করত। যে রাতে নবি পৃথিবীতে আগমন করেন, সে রাতপরবর্তী সকালে সে কুরাইশদের কাছে জিজ্ঞেস করল, গত রাতে এ এলাকাতে কোনো শিশুর জন্ম হয়েছে কি? উপস্থিত কুরাইশের লোকেরা বলল, এ বিষয়ে আমরা কিছু জানি না। লোকটি বলল, তোমরা এ বিষয়টির অনুসন্ধান করো। কেননা এই রাতে বর্তমান উম্মতের নবি ভূমিষ্ঠ হয়েছেন। তার কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বিশেষ নিদর্শন (মোহরে নবুয়ত) রয়েছে। জন্মের পরপর শিশুটির মুখে জিন আঙুল পুরে রাখার দরুন শিশুটি দুই দিন ধরে কারও দুধ পান করবে না। কুরাইশের লোকেরা সন্ধান করে জানতে পারল, আবদুল মুত্তালিবের প্রিয় পুত্র আব্দুল্লাহর এক পুত্রসন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। ইহুদিকে এ সংবাদ জানানো হলে সেও শিশুটিকে দেখার আগ্রহ ব্যক্ত করে বলল, চলো। আমিও শিশুটিকে দেখব। ইহুদি শিশুটির দুই কাঁধের মাঝে মোহরে নবুয়তের নিদর্শনও দেখতে পেল। তখন সে চিৎকার দিয়ে বেহুঁশ হয়ে গেল। হুঁশ ফিরে আসার পর লোকটি বলল, নবুয়তে বনি ইসরাইল আজ থেকে শেষ হয়ে গেল। হে কুরাইশ সম্প্রদায়, ভবিষ্যতে এই শিশু তোমাদের প্রতি এমন এক আক্রমণ পরিচালনা করবে, যার সংবাদ পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।’ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৩২৬)
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া মিফতাহুল উলুম, নেত্রকোনা