মাওলানা তকি হাসান—অর্পণ প্রকাশনের প্রকাশক। জন্ম ঢাকায়। গৃহশিক্ষকের কাছে আরবি প্রথম পাঠের মাধ্যমে পড়াশোনার শুরু। দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) পড়েছেন ঢাকার জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ মাদরাসায়। তিনি কেন প্রকাশক হলেন, কোন ধরনের বই প্রকাশে আগ্রহী তিনি, মানসম্মত বই প্রকাশে তার ভূমিকা, লেখক-প্রকাশকের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ
খবরের কাগজ: আপনি প্রকাশক হলেন কেন?
তকি হাসান: বইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই মূলত প্রকাশনা জগতে আসা। এক সময় প্রচুর বই পড়তাম। তখন থেকেই বইয়ের জগৎ নিয়ে আমার আলাদা কৌতূহল ছিল। লেখকদের অতিমানবীয় শক্তির অধিকারী মনে হতো। যারা লেখালেখির মাধ্যমে মানুষের জ্ঞানের জগৎকে প্রসারিত করেন, বিশুদ্ধ বিনোদন উপহার দেন, সেসব লেখকের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, সেই চিন্তা থেকেও প্রকাশনা জগতে কাজ করার অনুপ্রেরণা পাই।
ছাত্রজীবন থেকেই কারও অধীনে চাকরি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ব্যবসার ইচ্ছা ছিল। ব্যবসা যেহেতু করব, ভালো জিনিসের ব্যবসা করাই শ্রেয়। বইয়ের ব্যবসাকে আমার জ্ঞানের সওদাগরি মনে হয়। আমার লাইফস্টাইলের সঙ্গেও এটাকে জুতসই মনে হয়েছে বিধায় আমি প্রকাশনা জগতে নিজেকে সমর্পণ করেছি।
খবরের কাগজ: আপনার প্রকাশনী সম্পর্কে কিছু বলুন। কী ধরনের বই প্রকাশে আপনারা আগ্রহী?
তকি হাসান: মাকতাবাতুল ইসলাম ও অর্পণ প্রকাশনের প্রতিষ্ঠাকালে আমাদের স্বপ্ন ছিল, বিশুদ্ধ জ্ঞান সর্বাধিক বিশুদ্ধভাবে উপস্থাপন করব আভিজাত্যের মোড়কে। একটা বই প্রস্তুতকালে আমাদের চিন্তা থাকে বইটির কনটেন্ট যেন বিশুদ্ধ হয়, ভাষা যেন নির্ভুল থাকে এবং সর্বোপরি বইটির প্রচ্ছদ, কাগজ, ছাপা ও বাঁধাই এতটাই অভিজাত ও দৃষ্টিনন্দন হয়, পাঠক দেখামাত্রই যেন বইটি হাতে তুলে নেন। আমাদের কাজ যেন পাঠককে মুগ্ধ করে।
আমরা মূলত আকাবির-আসলাফদের লিখিত ও অনূদিত বই প্রকাশ করতেই বেশি আগ্রহ বোধ করি। ইসলামি ইতিহাসের মহানায়কদের জীবনী, জীবনঘনিষ্ঠ মাসয়ালা-মাসায়েল, মোটিভেশনাল বক্তব্য এবং ইসলামি শিশু-সাহিত্যও আমাদের প্রকাশনার বিষয়বস্তু।
খবরের কাগজ: মানসম্মত বই প্রকাশে আপনাদের ভূমিকা কেমন?
তকি হাসান: আমি আগেই বলেছি আমাদের স্বপ্ন হল, আভিজাত্যের মোড়কে বিশুদ্ধ জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া। বইকে মানসম্পন্ন করার জন্য দুইটি বিষয় লাগে—১. কনটেন্ট নির্ভুল ও বিশুদ্ধ হওয়া। ২. প্রচ্ছদ, কাগজ ছাপা ও বাঁধাই মানসম্মত হওয়া। আমরা দুটো বিষয়েই সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করি। আমাদের বই হাতে নিয়ে পাঠকমাত্রই সেটা অনুধাবন করতে পারেন।
ইসলামি প্রকাশনা জগতে ৮০ গ্রাম ক্রিম কালার অফসেট কাগজে আমরাই প্রথম ইসলামি বই প্রকাশ করি। যখন বাংলাদেশেই ক্রিম কালার কাগজ উৎপাদন হতো না। আমরা মিশরীয় শামওয়া কাগজে অনুপ্রাণিত হয়ে অর্ধশতাধিক কাগজের দোকান ঘুরে ইন্দোনেশিয়ান একটা কাগজ পেয়েছিলাম, যেটা মিশরীয় শামওয়া কাগজের কাছাকাছি। সেই কাগজে বই ছাপা ছিল ইসলামি প্রকাশনা জগতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা। আপনি লক্ষ্য করবেন, এখন প্রায় ৯০ ভাগ ইসলামি সৃজনশীল বই ক্রিম কালার কাগজে ছাপা হচ্ছে, যার সূচনা আমরা করেছিলাম।
আরও পড়ুন: বইয়ের মাধ্যমে ইসলামের আদর্শ মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাই
খবরের কাগজ: ইসলামি বইয়ের জাগরণের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
তকি হাসান: ইসলামি বইয়ের জাগরণের ক্ষেত্রে আমার কাছে যে পদক্ষেপটা জরুরি মনে হয় সেটা হলো, জনসাধারণের মাঝে দাওয়াতের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে পরিচালনা করে মানুষের মনে দ্বীনি সচেতনতা তৈরি করা। দ্বীনি সচেতনতা তৈরি হলে ইসলামকে জানার আগ্রহ তৈরি হবে। সেই আগ্রহ থেকেই নতুন নতুন পাঠক সৃষ্টি হবে। নতুন পাঠকরাই ইসলামি বইয়ের জাগরণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবেন ইনশাআল্লাহ।
খবরের কাগজ: লেখক-প্রকাশকের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
তকি হাসান: একটি প্রকাশনী দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার জন্য আমরা মনে করি, প্রকাশকের সঙ্গে লেখকের এবং লেখকের সঙ্গে প্রকাশকের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। লেখকরা প্রকাশনা জগতে ফুয়েলের কাজ করেন। লেখকরা আমাদের কাছে অত্যন্ত সম্মানীয়। লেখকদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা আমাদের অন্যতম একটি কর্তব্য।