আল্লাহতায়ালা পৃথিবীতে মানুষকে পাঠিয়েছেন তাঁর দাসত্ব ও গোলামি করার জন্য। মানবসৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যও এটা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি জিন এবং মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ৫৬) তবে সব মানুষের সব ধরনের ইবাদত আল্লাহতায়ালার নিকট পছন্দনীয় হয় না। বরঞ্চ যাদের ইবাদতে নিম্নোক্ত চারটি শর্ত পাওয়া যাবে, তাদের ইবাদতই আল্লাহতায়ালা পছন্দ করেন। শর্তগুলো হলো—
একনিষ্ঠতা: ইখলাস বা একনিষ্ঠতা ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত। ইখলাস ছাড়া ইবাদত অগ্রহণযোগ্য। এর কোনো প্রতিদান আল্লাহতায়ালার নিকট পাওয়া যাবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তাদের এ ছাড়া আর কোনো নির্দেশ প্রদান করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে, নামাজ কায়েম করবে এবং জাকাত দেবে। এটাই সঠিক দ্বীন। (সুরা বায়্যিনাহ, আয়াত: ০৫)
হাদিস শরিফে হজরত আবু উমামা বাহিলি (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলল, যে ব্যক্তি নেকি ও সুনামের আশায় জিহাদ করে, তার সম্পর্কে আপনার কী অভিমত? কেমন প্রতিফল রয়েছে তার জন্য? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তার জন্য কিছুই নেই। লোকটি তিনবার এ কথাটি জিজ্ঞেস করল। আল্লাহর রাসুল প্রত্যেকবারই বললেন, তার জন্য কিছুই নেই। তার পর তিনি বললেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং একনিষ্ঠতা ব্যতীত কোনো ইবাদত আল্লাহতায়ালা কবুল করেন না।’ (নাসায়ি, হাদিস: ৩১৪০)
সুন্নাতের অনুসরণ: যাবতীয় ইবাদত সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) যে কাজটি যেভাবে করেছেন কিংবা যেভাবে করতে বলেছেন, ইবাদতের জন্য তার বিকল্প কোনো পন্থা-পদ্ধতি আবিষ্কার করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। আর বিদআত প্রত্যাখ্যাত। হাদিস শরিফে হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেউ আমাদের শরিয়তে সংগত নয়, এমনকিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যান করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ২৫১৭) অন্য হাদিসে দ্বীনের মধ্যে যাবতীয় নবসৃষ্ট বিষয়কে বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআতকেই পথভ্রষ্টতা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (মুসলিম, হাদিস: ১৮৭৮)
হারাম পরিহার: ইবাদত কবুলের অন্যতম শর্ত হালাল খাদ্য গ্রহণ ও হারাম পরিহার করে চলা। পবিত্র কোরআনে নবি-রাসুলগণকেও হালাল খাবার খেয়ে ইবাদত করতে আদেশ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে রাসুলগণ! পবিত্র বস্তু খাও এবং সৎকাজ করো।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৫১)
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত সাদ (রা.)-কে লক্ষ্য করে বলেন, ‘হে সাদ! হালাল খাবার খাও, তা হলে তুমি ‘মুসতাজাবুদ দাওয়া’ (যার দোয়া আল্লাহতায়ালা তাৎক্ষণিক কবুল করেন) হয়ে যাবে। ওই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মদের জীবন! বান্দা (যদি) এক লোকমা হারাম খাদ্য খেয়ে ফেলে, তা হলে এ কারণে তার চল্লিশ দিনের আমল কবুল হবে না।’ (আত তারগিব ওয়াত তারহিব, হাদিস: ২৬৭৪)
ধারাবাহিকতা: পরিমাণে অল্প হলেও সে ইবাদত আল্লাহতায়ালার নিকট সবচেয়ে বেশি পছন্দনীয়, যা ধারাবাহিকভাবে নিয়মিত আদায় করা হয়। আমলের ধারাবাহিকতা তাই ঠিক রাখা উচিত সবার জন্য। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ঠিকভাবে ও মধ্যপন্থায় নেক আমল করতে থাকো। আর জেনে রেখো যে, তোমাদের কাউকে তার আমল বেহেশতে নেবে না। আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় আমল হলো, যা নিয়মিত করা হয়। যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪৬৪)
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা