সাধারণত পবিত্র হজ পালনের পর হিজরি সনের প্রথম মাস মুহাররম থেকে নতুনভাবে ওমরা পালন শুরু হয়। সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা মুহাররম মাস থেকেই ওমরা পালনে যেতে শুরু করেন। সৌদি আরব সরকার ২০২৫ সালে নতুন হিজরি বছর ১৪৪৭ সনের মুহাররম মাস থেকে ওমরা পালনে আগ্রহী মুসলিমদের জন্য নতুন একটি ভিসা নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো—ওমরা যাত্রাকে আরও সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা। নতুন এই নীতির ফলে ওমরাযাত্রীদের জন্য যেমন সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে, তেমনি কিছু বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশি হাজিদের সুবিধার্থে সৌদি সরকারের নতুন ভিসা নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরা হলো—
১. অনুমোদিত হোটেল বুকিং বাধ্যতামূলক: ওমরা ভিসার জন্য আবেদন করতে হলে সৌদি সরকার অনুমোদিত হোটেলে থাকার প্রমাণপত্রসহ বুকিংয়ের কাগজ বা ডকুমেন্টস জমা দিতে হবে। হোটেল বুকিং ছাড়া ভিসার কোনো আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তা বাতিল হতে পারে।
২. ভিসা প্রক্রিয়াকরণে কড়াকড়ি: নতুন নিয়ম অনুযায়ী হোটেল বুকিং ও অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে না দিলে ভিসা প্রদান করা হবে না। এতে আবেদনকারীদের ভ্রমণ পরিকল্পনা আগে থেকেই সুসংগঠিত রাখতে হবে।
৩. নিবন্ধন বাধ্যতামূলক: ওমরা সেবায় যুক্ত সব প্রতিষ্ঠান, হোটেল এবং ট্রাভেল এজেন্সিকে সৌদি পর্যটন মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধিত হতে হবে। এর ফলে প্রতিটি সংস্থা ও যাত্রীর নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে।
৪. নুসুক অ্যাপসের বাধ্যতামূলক ব্যবহার: ওমরাযাত্রীদের ‘নুসুক অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাদের রুটিন, হোটেল বুকিং, যাত্রার সময়সূচি ও অন্যান্য তথ্য পরিচালনা করতে হবে।
৫. নারীদের সতর্কতা: নারীরা মাহরাম (নিকটাত্মীয় পুরুষ অভিভাবক) ছাড়া ওমরা পালনে যেতে পারবেন না— এ নিয়ম অপরিবর্তিত রয়েছে।
বি. দ্র. ইহরামের সময় সুগন্ধি ব্যবহার, টাইট-ফিটিং পোশাক, গ্লাভস, মেকআপ বা মেহেদি ব্যবহার নিষিদ্ধ। এ ছাড়া, পশুপাখি হত্যা, উচ্চস্বরে কথা বলা ও গালিগালাজ থেকেও বিরত থাকতে হবে।
ওমরাযাত্রীরা যেসব সুবিধা পাচ্ছেন— নতুন নীতিমালার ফলে ওমরাযাত্রীরা বেশকিছু ইতিবাচক পরিবর্তন ভোগ করতে সক্ষম হবেন। অনুমোদিত হোটেলে থাকার কারণে যাত্রা আগেভাগেই নির্ধারিত ও নিরাপদ হবে। নুসুক অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রীর হাতে থাকবে সমস্ত তথ্য ও সময়সূচি। ফলে সফর হবে ঝামেলাহীন। নিবন্ধিত সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সেবা পেলে প্রতারণার আশঙ্কা কমবে এবং মানসম্মত সুবিধা পাওয়া যাবে।
এজেন্সিগুলোর চ্যালেঞ্জ ও মতামত— নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে কিছু ট্রাভেল এজেন্সি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, হোটেলের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে।
নতুন নীতিমালার একটি বাস্তব প্রভাব পড়েছে হোটেল বুকিংয়ের ক্ষেত্রে। সৌদি সরকার নির্দিষ্ট হোটেলগুলোকেই অনুমোদিত তালিকায় রেখেছে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিটি দেশের এজেন্সিগুলোর জন্য হোটেল কোটা সীমিত করে দিয়েছে। ফলে অনুমোদিত হোটেলগুলোর সিট পাওয়াই কঠিন হয়ে গেছে, বিশেষ করে হারাম শরিফের নিকটবর্তী হোটেলগুলো।
স্বল্পসংখ্যক হোটেলে ব্যাপক চাহিদার কারণে দাম বেড়ে গেছে, যেটি সরাসরি প্রভাব ফেলেছে ওমরা প্যাকেজ মূল্যে। আগে বুকিং ছাড়া ভিসা করা যেত, এখন হোটেল বুকিং না থাকলে ভিসা আবেদনই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া অনেক প্রান্তিক যাত্রী ও ছোট এজেন্সি নুসুক অ্যাপ বা অনলাইন প্রক্রিয়ায় অদক্ষ। ফলে তাদের জন্য বাড়তি ঝামেলা তৈরি হতে পারে।
নতুন ওমরা নীতিমালা সাময়িক কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও, সামগ্রিকভাবে এটি মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। এতে ওমরা যাত্রা হবে আরও নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও মানসম্মত। যাত্রীদের যথাযথ প্রস্তুতি ও সচেতনতা থাকলে এই নতুন ব্যবস্থা ওমরা অভিজ্ঞতাকে আরও স্মরণীয় করে তুলবে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক: পরিচালক, হজ ও ওমরা বিভাগ ডিসকভার হলিডেজ লিমিটেড