বর্তমানে দুনিয়াব্যাপী মুসলিম সমাজের সংকটের অন্যতম কারণ হলো— জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে কেবল দুনিয়াকেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে ফেলা। অথচ ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। আল্লাহতায়ালা আমাদের আখিরাতমুখী জীবন গড়ার জন্য সৃষ্টি করেছেন, আর আমরা ব্যস্ত হয়ে আছি দুনিয়া উপার্জন করা নিয়ে অথচ দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় সব আখিরাতমুখী জীবন গড়ার সহায়ক উপাদান মাত্র।
দুনিয়া নয়, আখিরাতই মুখ্য। আল্লাহতায়ালা কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের যে কেউ নগদ নগদ পেতে চায়, তাকে আমি এখানেই (দুনিয়াতে) জলদি করে দিয়ে দেই—যাকে যা দিতে ইচ্ছে করি। অবশেষে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করি। তাতে সে জ্বলবে ধিক্কৃত ও রহমতবঞ্চিত অবস্থায়। আর যে ব্যক্তি আখিরাত কামনা করে আর তার জন্য চেষ্টা করে যতখানি চেষ্টা করা দরকার আর সে মুমিনও—এরাই হলো তারা, যাদের চেষ্টা সাধনা সাদরে গৃহীত হবে। তোমার প্রতিপালকের দান থেকে আমি এদেরকে আর ওদেরকে সবাইকেই সাহায্য করে থাকি, তোমার প্রতিপালকের দান তো বন্ধ হওয়ার নয়।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১৮-২০)। এই আয়াতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতের তুলনা করতে শেখানো হয়েছে এবং পরকালকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে ইমাম ইবনে আতাউল্লাহ আল-স্কান্দারি (রহ.) লিখেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা যে বিষয়টি তোমার জন্য নিশ্চিত করেছেন (রিজিক)—তার জন্য অতিরিক্ত চেষ্টা করছ। আর যার দাবি তিনি তোমার কাছ থেকে করেছেন (ইবাদত)—তাতে অলসতা ও সাফলতি করছ। তোমার অন্তরের অন্ধত্বের প্রমাণ এটি।’
জীবিকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি মূল উদ্দেশ্য নয়—হালালভাবে জীবিকা উপার্জন ও জীবনের প্রয়োজন মেটানোকে ইসলাম অস্বীকার করে না। বরং আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘বলো, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব সৌন্দর্যোপকরণ এবং পবিত্র রিজিক সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করেছে? বলো, তা দুনিয়ার জীবনে মুমিনদের জন্য এবং বিশেষভাবে কিয়ামত দিবসে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩২)। আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর যখন নামাজ সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ (রিজিক) থেকে অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো—যাতে তোমরা সফল হতে পার।’ (সুরা জুমা, আয়াত: ১০)
আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের জন্য হালাল জীবিকা বৈধ করেছেন কিন্তু তিনি মুসলিম উম্মাহকে কেবল এ জন্যই দুনিয়াতে পাঠাননি। জীবিকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি মূল উদ্দেশ্য নয় বরং পরকালের সাফল্য আসল। মুসলিমরা যখন তাদের মূল দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে কেবল দুনিয়াবি লেনদেনেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে, তখন আল্লাহ তাদেরকে তীব্রভাবে সতর্ক করেন।
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘বলো, যদি তোমাদের পিতারা, সন্তানেরা, ভাইয়েরা, স্ত্রীরা, তোমাদের গোষ্ঠীর লোকেরা আর তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, আর যে ব্যবসায় তোমরা মন্দার ভয় করো এবং তোমাদের ভালোবাসার বাসস্থান (এসব) যদি তোমাদের কাছে আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তাঁর পথে জিহাদ করা থেকে প্রিয়তর হয়; তা হলে আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। আর আল্লাহ অবাধ্য আচরণকারীদের সঠিক পথ প্রদর্শন করেন না।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ২৪)
আল্লাহ যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাহায্য করলেন এবং দ্বীন ইসলামকে বিজয়ী করলেন, তখন আনসারিরা মনে মনে ভাবলেন—এবার আমরা নিজেদের ধন-সম্পদ দেখাশোনা ও ঠিকঠাকে মনোযোগ দেই। আল্লাহতায়ালা তখন অবতীর্ণ করলেন, ‘তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫)
নিজের হাতকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করার অর্থ হচ্ছে, শুধু ধন-সম্পদ নিয়েই ব্যস্ত থাকা, এর পরিবৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করা এবং জিহাদ ছেড়ে দেওয়া। আবু আইউব আনসারি রাদিয়াল্লাহিু আনহু বলেন, ‘আল্লাহ এ আয়াতের মাধ্যমে আমাদেরকে সতর্ক করেছেন।’ আবু ইমরান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘এর পর থেকে আবু আইউব আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু সর্বদা আল্লাহর পথে জিহাদে শরিক হতেন, অবশেষে তিনি জিহাদ করতে করতে কুস্তনতুনিয়াতে সমাহিত হন। (আবু দউদ, হাদিস নং—২৫১৪; হায়াতুস সাহাবা—১/৪৫৪।)
সুতরাং আমাদের উচিত, জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করা। দুনিয়ার প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করা, তবে মূল হবে আখিরাত। মুসলিম জাতি যদি আবার এ আসল উদ্দেশ্যে ও প্রকৃত দায়িত্বে ফিরে আসে—তা হলে দুনিয়াতে সফল হবে, সফল হবে আখিরাতেও। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘মুমিন পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে তাকে আমি নিশ্চয়ই আনন্দময় জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার প্রদান করব।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৯৭)
লেখক : আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক