ইসলামে উত্তরাধিকার বা মিরাস বণ্টন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবশ্যপালনীয় বিধান। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এই বিধান অমান্য করার ভয়াবহ পরিণতির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মিরাসের বিধান মেনে চলা আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত- উভয় জীবনের জন্যই অপরিহার্য। এটি কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি ফরজ বিধান। তাই একজন মুসলিম হিসেবে এ বিষয়ে আমাদের উদাসীনতা বা বিচ্যুতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে মিরাস বণ্টনে নানা ধরনের অসঙ্গতি ও বিচ্যুতি দেখা যায়। এর কিছু উৎস হলো মৃত ব্যক্তির কর্মকাণ্ড, আবার কিছু ওয়ারিশদের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে উদ্ভূত। এ ছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রচলিত কিছু ইসলামবিরোধী নিয়মকানুন ও ধ্যানধারণাও এ সমস্যার জন্ম দেয়।
পালক সন্তানকে ওয়ারিশ করা ও ঔরসজাত পরিচয় দেওয়া: ইসলামে সন্তান বলতে ঔরসজাত সন্তানকেই বোঝায়। তাই পালক সন্তানকে কখনোই নিজের ঔরসজাত সন্তান হিসেবে গণ্য করা যাবে না এবং সে ওয়ারিশ হওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, কারা ওয়ারিশ হবে আর কারা হবে না, তা সুনির্দিষ্টভাবে বিধিবদ্ধ; এখানে কোনো পরিবর্তন বা পরিবর্ধনের সুযোগ নেই। সুতরাং ওয়ারিশ নয় এমন কাউকে ওয়ারিশ বানানোর চেষ্টা করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও গর্হিত কাজ।
এ ধরনের কাজ আল্লাহর নির্ধারিত বিধানের সীমা লঙ্ঘন এবং ওয়ারিশদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার শামিল, যা সুস্পষ্ট জুলুম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমাদের পালক পুত্রদের আল্লাহতায়ালা তোমাদের আপন-পুত্র বানাননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথামাত্র। আল্লাহ সত্য বলেন এবং তিনি কেবল সঠিক পথেরই সন্ধান দেন। (সুরা আহযাব, ৪-৫)
এ কারণে পালক সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে পরিচয় দেওয়া, তার জন্মনিবন্ধন বা আইডি কার্ডে প্রকৃত জন্মদাতা পিতামাতার নাম বাদ দিয়ে লালনপালনকারী দম্পতিকে পিতামাতা হিসেবে দেখানো। যার মাধ্যমে পালক সন্তানের জন্য মিরাস দাবির আইনি সুযোগ সৃষ্টি হয় এসবই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর মাধ্যমে প্রতারণা ও মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া হয়, যা ইসলামে কঠোরভাবে বর্জিত (সুরা বাকারা, ১৮৮, সুরা নিসা, ৫৮)।
মিরাসের প্রসঙ্গ ছাড়াও সন্তানকে তার প্রকৃত পিতার সাথে সম্বন্ধিত না করে অন্য কারও সাথে সম্বন্ধিত করে ডাকা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহতায়ালা সুরা আহযাবের ৫ নম্বর আয়াতে আরও বলেন, (এখন থেকে) তোমরা তাদেরকে ডাকবে তাদের পিতৃপরিচয়ে। আল্লাহর দৃষ্টিতে এটাই অধিক সঙ্গত। তোমরা যদি তাদের পিতৃপরিচয় না জানো, তা হলে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই ও বন্ধু। এ ব্যাপারে তোমরা কোনো ভুল করে ফেললে তোমাদের গুনাহ হবে না। কিন্তু মনে এর সুপ্ত ইচ্ছা থাকলে, ভিন্ন কথা (অর্থাৎ সেক্ষেত্রে গুনাহ হবে)। আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যে ব্যক্তি তার পিতা নয় এমন কাউকে জেনেবুঝে পিতা বলে পরিচয় দেয়, তার জন্য জান্নাত হারাম। (বোখারি, ৬৭৬৬)
অতএব, নিজের সন্তান নয় এমন কাউকে সন্তান বলে পরিচয় দেওয়া বা পিতা নয় এমন কাউকে পিতা বলে ডাকা শরিয়তে জায়েজ নেই। তবে যেখানে ভুল বোঝার সম্ভাবনা থাকে না, সেখানে রূপক অর্থে কাউকে পিতা বা মাতা বলে ডাকা জায়েজ হবে। যেমন- শ্বশুরকে পিতা এবং শাশুড়িকে মা বলে ডাকা। কিন্তু যেখানে ভুল বোঝার সম্ভাবনা থাকবে, সেখানে এটা করা যাবে না।
আমাদের উচিত মিরাসের বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা, যাতে দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক