একটুখানি চোখ বুজে কল্পনা করুন, আপনি কয়েকজন বন্ধু বা পরিবার নিয়ে এক কোনায় বসে আল্লাহর প্রশংসা করছেন, আর ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ থেকে ডানা মেলে একদল ফেরেশতা এসে আপনাদের চারপাশে ঘিরে ধরলেন! শুধু কি তাই? তাদের ডানার বিস্তার ছড়াতে ছড়াতে একেবারে প্রথম আসমান পর্যন্ত পৌঁছে গেল এবং স্বয়ং মহাবিশ্বের মালিক আল্লাহর কাছে আপনাদের নাম নিয়ে আলোচনা শুরু হলো! এটি কোনো কাল্পনিক রূপকথা নয়, বরং আধ্যাত্মিক জগতের এক পরম বাস্তব। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের জিকিরের মজলিসের এমন এক অনন্য অদৃশ্যের খবর দিয়েছেন, যা শুনলে যেকোনো মানুষের হৃদয় ঈমানের আলোয় আন্দোলিত হয়ে উঠবে।
মহাবিশ্বে আল্লাহর এমন কিছু বিশেষ ফেরেশতা আছেন, যাদের একমাত্র দায়িত্বই হলো দুনিয়ার বুকে কোথায় আল্লাহর নাম নেওয়া হচ্ছে তা খুঁজে বের করা। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর অতিরিক্ত কিছু ভ্রাম্যমাণ ফেরেশতা আছেন, যারা ঘুরেফিরে জিকিরের মজলিস খুঁজতে থাকেন। যখন তারা এমন কোনো সম্প্রদায় বা মজলিস পেয়ে যান, তখন একে অপরকে ডেকে বলেন, ‘এসো, তোমাদের উদ্দেশ্যের দিকে।’ অতঃপর তারা নিজেদের ডানা দিয়ে তাদেরকে প্রথম আসমান পর্যন্ত ঢেকে ফেলেন। (বুখারি, ৬৪০৮; মুসলিম, ২৬৮৯)
যখন বান্দারা জিকির শেষ করে, তখন ফেরেশতারা আসমানে আরোহণ করেন। তখন আল্লাহতায়ালা সবকিছু জানা সত্ত্বেও ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, ‘আমার বান্দারা কী বলছিল?’ ফেরেশতারা বলেন, ‘তারা আপনার তাসবিহ, তাকবির ও তাহমিদ (প্রশংসা) করছিল।’ তখন আল্লাহ ও ফেরেশতাদের মধ্যে এক চমৎকার প্রশ্নোত্তর পর্ব চলে:
আল্লাহ: তারা কি আমাকে দেখেছে?
ফেরেশতা: না, হে প্রতিপালক! তারা আপনাকে দেখেনি।
আল্লাহ: কেমন হতো যদি তারা আমাকে দেখত?
ফেরেশতা: তারা আপনাকে দেখলে আরও বেশি ইবাদত ও তাসবিহ করত।
আল্লাহ: তারা কী চায়?
ফেরেশতা: তারা আপনার জান্নাত চায় এবং জাহান্নাম থেকে পানাহ (আশ্রয়) চায়।
আল্লাহ: তারা কি জান্নাত বা জাহান্নাম দেখেছে?
ফেরেশতা: না, তারা দেখেনি।
আল্লাহ: কেমন হতো যদি তারা তা দেখত?
ফেরেশতা: দেখলে তারা জান্নাতের জন্য আরও বেশি ব্যাকুল হতো এবং জাহান্নামকে আরও বেশি ভয় করত।
তখন আল্লাহতায়ালা এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন, আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, আমি তাদের সবাইকে মাফ করে দিলাম, তাদের চাওয়া পূরণ করলাম এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলাম। ( বুখারি, ৬৪০৮; তিরমিজি, ৩৬০০)
এই হাদিসের সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং একদম নতুন যে দিকটি আমাদের চোখ খুলে দেয়, তা হলো আল্লাহর ক্ষমার এক পরম উদারতা। ফেরেশতারা তখন আল্লাহকে বলেন, ‘হে প্রতিপালক! ওই মজলিসে অমুক নামের একজন চরম পাপী লোক ছিল, সে আসলে জিকির করতে বসেনি, বরং নিজের একটা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এমনিই তাদের সাথে এসে বসেছিল। আল্লাহতায়ালা তখন উত্তর দেন, আমি তাকেও ক্ষমা করে দিলাম! কারণ তারা এমন এক দল, যাদের পাশে যে এসে বসে, সেও কখনো বঞ্চিত বা হতভাগা হয় না। (মুসলিম, ২৬৮৯; মুসনাদে আহমাদ, ৭৩৭৬)
এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে, ভালো মানুষের পাশে বসার মূল্য আল্লাহর কাছে কত বেশি। আপনি হয়তো নিজে অনেক বড় ইবাদতকারী নন, কিন্তু যারা আল্লাহকে ভালোবাসে, তাদের সান্নিধ্যে থাকলে আপনার অজান্তেই আপনার জীবনের পাপের খাতা শূন্য হয়ে যেতে পারে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক