মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং আমাদের উত্তম পন্থায় ব্যবসা পরিচালনা করার পদ্ধতি জানিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ব্যবসার নেতিবাচক ও ক্ষতিকর বিষয়গুলো থেকে সতর্ক করেছেন। এর মধ্যে অধিক মুনাফার লোভে পণ্য বা মাল অপকৌশলে গুদামজাত করে রাখা অন্যতম। বর্তমানে বাংলাদেশে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি কেবল অনৈতিক নয়, বরং সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম কাজ।
বাজারে যখন তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে, তখন অসাধু ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে বাজার থেকে তেল সরিয়ে ফেলে। ফলে বাজারে ঘাটতি দেখা দেয় এবং হুহু করে দাম বাড়তে থাকে। সাধারণ মানুষ যখন এক লিটার তেলের জন্য হাহাকার করে, তখন এই সিন্ডিকেট চড়া মূল্যে পণ্য ছেড়ে পকেট ভারী করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মানসিকতাকে অভিশপ্ত ঘোষণা করেছেন। হাদিসে এসেছে, ‘আমদানিকারক রিজিকপ্রাপ্ত, আর মজুতদার বা গুদামজাতকারী অভিশপ্ত।’ (ইবনে মাজাহ)।
ইসলামি শরিয়ত মতে, স্বাভাবিক অবস্থায় সরকার দাম নির্ধারণ করবে না। কিন্তু যখন ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে জুলুম শুরু করে, তখন রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হয়। আনাস (রা.) বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, নবিজি (সা.) জুলুমের বিপক্ষে ছিলেন।
বর্তমানে তেলের বাজারে যা ঘটছে, তা সাধারণ মানুষের ওপর সুস্পষ্ট জুলুম। এই জুলুম প্রতিরোধে প্রশাসনের কড়া নজরদারি ও অসাধু ব্যবসায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান সময়ের দাবি।
তেল বা নিত্যপণ্য মজুত করে যারা মানুষকে কষ্টে ফেলে, তাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে লাঞ্ছনা অবধারিত। হজরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করবে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগ বা দারিদ্র্যে আক্রান্ত করবেন।’ (ইবনে মাজাহ)।
অনেকে মনে করেন, মজুতদারি করে কোটি টাকা আয় করার পর কিছু অংশ সদকা বা দান করে দিলেই গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। এটি একটি ভুল ধারণা। হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ৪০ দিন পণ্য মজুত রাখার পর তা সদকা করে দিলেও সেই গুনাহের কাফফারা হবে না।
হজরত ইউসুফ (আ.)-এর শস্য জমার উদাহরণ দিয়ে অনেকে মজুতদারিকে জায়েজ করতে চান। কিন্তু সেটি ছিল জনকল্যাণে রাষ্ট্রীয় ‘সঞ্চয়’, যাতে দুর্ভিক্ষের সময় মানুষ না খেয়ে মারা না যায়। আর বর্তমানের তেল সংকট হলো অধিক লাভের জন্য ‘মজুতদারি’। দুটির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বিপরীত।
ইমাম নববি (রহ.)-এর মতে, বাজারের কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে পণ্য মজুত করা এবং পণ্যের দাম বাড়লে আনন্দিত হওয়া একজন প্রকৃত মুমিনের কাজ হতে পারে না।
ভোজ্যতেল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য উপাদান। সামান্য কিছু বাড়তি মুনাফার লোভে কোটি কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস নেবেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মূল্যবৃদ্ধির আশায় পণ্য মজুত রাখে, আল্লাহ তার ওপর থেকে দায়ভার তুলে নেন।
আমরা হালাল উপায়ে ব্যবসা করি। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী লাভের মোহে পড়ে পরকাল বরবাদ না করি। বিশেষ করে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা চলছে, তা নিরসনে ব্যবসায়ীরা সততার পরিচয় দিন। ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহ করে মানুষের দোয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই হোক আমাদের লক্ষ্য।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক