কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান হয়। গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা।
বৃহস্পতিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সরকার পতনের এক মাস পূর্ণ হচ্ছে।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল হাইকোর্টের দেওয়া একটি রায়কে ঘিরে। যদিও সরকারের কাছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের দাবি নিয়েই আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের নানা রকম মন্তব্যের কারণে এই আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। শেষে কোটা সংস্কার আন্দোলন সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। সরকার আন্দোলন দমাতে কঠোর হলে সাধারণ জনতা এই আন্দোলতে যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত আন্দোলন দমাতে সরকার সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করলেও টিকতে পারেনি। অবশেষে ৫ আগস্ট পতন ঘটে।
এদিকে নতুন সরকার গঠনের পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সর্বোচ্চ আদালতে নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়। একপর্যায়ে জুডিশিয়াল ক্যু প্রক্রিয়া শুরু হলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা সেই ক্যুর ষড়যন্ত্র রুখে দেন। ছাত্রদের বিক্ষোভের মুখে ষড়যন্ত্রকারী তৎকালীন প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতি পদত্যাগ করেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রথম শুরু হয় ২০১৮ সালে। তখন সরকার ছাত্রদের কিছু দাবি মেনে নিয়ে আন্দোলন থামাতে সক্ষম হয়। তবে চলতি বছরের ৫ জুন সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। এতে দেশে সব কোটা পুনর্বহাল হয়।
ফলে কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুনভাবে দানা বাঁধে। তবে কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা আন্দোলনে নামেন ৫ জুলাই।
এ সময় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার পক্ষ ৯ জুলাই আপিল বিভাগে আবেদন করলে হাইকোর্টের রায় স্থগিত না করে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি ধার্য করেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। পরদিন ১০ জুলাই শুনানিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ছাত্রদের উদ্দেশে কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি, রাজপথে আন্দোলন করে আদালতের রায় পরিবর্তন করা যাবে না। ছাত্রছাত্রীদের স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়ে নিজ নিজ কাজে, অর্থাৎ পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে বলা হলো। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রক্টর ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা তাদের শিক্ষার্থীদের স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে নিয়ে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করবেন বলে আদালত মনে করেন।’
এতে আন্দোলন আরও জোরালো হয়। এরপর কোটা নিয়ে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয় ১৪ জুলাই। ১৫ জুলাই তীব্র আন্দোলন এবং সরকারের দমন-পীড়ন চলতে থাকে। এরপর ১৬ জুলাই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আদালত শুনানির তারিখ পিছিয়ে ৭ আগস্ট নির্ধারণ করেন। তখন সারা দেশে ব্যাপকভাবে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এদিন আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপকভাবে গুলি চালানো শুরু করে পুলিশ। পুলিশের গুলিতে নিহত হন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ ৬ শিক্ষার্থী। ১৮ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষ আরেকটি আবেদন করে শুনানি এগিয়ে আনার জন্য। আন্দোলনের তীব্রতায় ওই শুনানি ২১ জুলাই ধার্য করেন আদালত। সারা দেশে কারফিউ ঘোষণা করা হয়।
এদিকে রংপুরের সাঈদসহ ছয় শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় হাইকোর্টের বিচারপতি খন্দকার দিলীরুজ্জামানকে দায়িত্ব দিয়ে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করে সরকার। ২১ জুলাই কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায়, কোটা বাতিলসংক্রান্ত সরকারের প্রজ্ঞাপন বাতিল ও ৯৩ শতাংশ সাধারণ কোটা রেখে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। কিন্তু ততদিনে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সরকার পতনের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। সেই দাবিতেই ৫ আগস্ট সরকারের পতন ঘটে।
জুডিশিয়াল ক্যুর চেষ্টা: নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ৮ আগস্ট রাতে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা নিয়োগের আগে এই সরকারের বৈধতা প্রশ্নে সর্বোচ্চ আদালতের মতামত চান রাষ্ট্রপতি। নিয়োগের আগেই অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে মত (রুলিং) দেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। এ বিষয়ে বিচারপতিরা ভার্চূয়ালি শুনানিতে অংশ নেন।
এরপর ১০ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করতে এবং জুডিশিয়াল ক্যুর চেষ্টা করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। তিনি সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করেই সংক্ষিপ্ত নোটিশে ১০ আগস্ট সকাল ১০টায় ফুলকোর্ট সভা ডেকেছিলেন। ভার্চুয়ালি এ সভা হওয়ার কথা ছিল। সভা ডাকার খবরে ওই দিন সকালেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের মদদপুষ্ট ও নানা অপকর্মে জড়িত সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সরকারের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা না করে ফুল কোর্ট মিটিং ডেকেছেন। পরাজিত শক্তির কোনো প্রকার ষড়যন্ত্র বরদাশত করা হবে না।’
এরপর ওই দিন ৯টা ১৪ মিনিটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে একই কথা লিখে হাইকোর্ট ঘেরাওয়ের ঘোষণা দেন। এরপর ফেসবুকে লাইভে এসে সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ‘জুডিশিয়ারি ক্যু’ রুখে দিতে হাইকোর্ট ঘেরাওয়ের আহ্বান জানান।
এসব পোস্ট থেকেই সামনে আসতে থাকে তৎকালীন প্রধান বিচারপতির ‘জুডিশিয়াল ক্যু’র পরিকল্পনার কথা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাবেক প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে জুডিশিয়াল ক্যু করার কথা ছিল। অবশেষে বিস্তারিত পরিকল্পনাই ফাঁস হয়ে যায়। এ অবস্থায় সকাল ১০টার আগেই সুপ্রিম কোর্টের সর্বত্র অবস্থান নেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। বেগতিক দেখে ফুল কোর্ট সভা স্থগিত করা হয়। বিক্ষোভের মুখে ওই দিনই প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অব্যাহতি নেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। এ ছাড়া আপিল বিভাগের আরও পাঁচ বিচারপতি পদত্যাগ করেন।
কী ছিল ক্যুর পরিকল্পনায়: সাবেক প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে জুডিশিয়াল ক্যু করার যে ষড়যন্ত্র ছিল তা ফাঁস করে দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অফিশিয়াল ফেসবুক গ্রুপ। ১০ আগস্ট রাতে সহ-সমন্বয়ক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মুহাম্মদ ‘ষড়যন্ত্র ফাঁস’ শিরোনামে গ্রুপে একটি পোস্ট দেন। পোস্টটি হলো- ‘প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের পদত্যাগের নেপথ্যে কঠিন ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেছে। শেখ হাসিনাকে এক্স প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা যেভাবে অবৈধ ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন, ঠিক তেমনি ষড়যন্ত্র করেছিলেন ওবায়দুল হাসানসহ কয়েকজন।’
ছয় বিচারপতি পদত্যাগের পর হাইকোর্টের বিচারপতি থাকা অবস্থায় সরাসরি প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। এরপর হাইকোর্টের আরও চার বিচারপতি আপিল বিভাগে নিয়োগ পান। হাইকোর্টের বেঞ্চ গঠনেও ভিন্নতা আসে। অনেককেই জামিন আবেদন, রিট ও মোশন শুনানির এখতিয়ার থেকে সরিয়ে দেওয়ানি ও অন্যান্য মোকদ্দমার একক বেঞ্চ অথবা দেওয়ানি মোকদ্দমার শুনানির এখতিয়ারসংক্রান্ত বেঞ্চে দেওয়া হয়।
এদিকে সরকার পতনের পর সুপ্রিম কোর্টসহ বিচার বিভাগসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক রদবদল হয়। অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ থেকে ইস্তফা দেন এ এম আমিন উদ্দিন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলরা গণহারে পদত্যাগ করেন। সারা দেশে নিম্ন আদালতগুলোতে বিগত সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত জিপি, পিপি, এপিপিদের সিংহভাগ পদত্যাগ করেন বলে জানা গেছে।