অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অনেকটা চিৎকার দিয়ে জানতে চাইলেন- আজকের এই মহতী সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধা কেউ কি আছেন? থাকলে উঠে দাঁড়ান। প্লিজ… কেউ কি আছেন? মুক্তিযোদ্ধা...
প্রধান অতিথির চিৎকার শুনে সমাবেশস্থলে মৃদু গুঞ্জন শুরু হলো। সমাবেশস্থলে উপস্থিত প্রায় প্রত্যেকেই পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছে। পাশের মানুষকে চেনার চেষ্টা করছে। অনেকে ভীতসন্ত্রস্ত। কারণ প্রধান অতিথির চিৎকারের অনেক মানে দাঁড় করানো যায়। এক. তিনি হয়তো আন্তরিকভাবেই মুক্তিযোদ্ধাকে খুঁজছেন। স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদেরই তো সম্মান পাওয়ার কথা। দুই. তিনি কি মুক্তিযোদ্ধাদের ভয় দেখাতে চাচ্ছেন? কারণ এতদিন মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে তিনি এবং তার দল বলতে গেলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। সাহস করে কথা বলতে পারতেন না। রাজাকার বলে তাদের গালি দেওয়া হতো। বহু বছর পর ভয় কেটে গেছে। আজকের দিনে কেউ রাজাকার বলে দেখুক না। শরীরের হাড়-মাংস একসঙ্গে থাকবে না। ছাতু বানিয়ে ফেলা হবে।
দ্বিতীয় কারণটাই সমাবেশে উপস্থিত কয়েক শ মানুষের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার করেছে। কেউ যদি হঠাৎ মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে উঠে দাঁড়ায়, তাহলে তার পরিণতি কী হতে পারে, সেটা দেখার অপেক্ষায় সমাবেশের প্রায় প্রত্যেকেই পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছে। নিচু লয়ে বাক্য বিনিময় করছে…
প্রধান অতিথি বক্তৃতার এক ফাঁকে আবারও মুক্তিযোদ্ধার খোঁজ করলেন। কণ্ঠে বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, এই সমাবেশে একজনও মুক্তিযোদ্ধা নেই? যদি কেউ উপস্থিত থাকেন তাহলে হাত তুলে উঠে দাঁড়ান। ভয় নেই। আমরা আপনাকে আপনাদের যথার্থ সম্মান জানাব। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর প্রিয় মাতৃভূমি ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্ত হয়েছে। দেশের আপামর জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী আমরা দেশে ইসলামি শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে চাই। এ জন্য হিংসা, বিদ্বেষ নয়। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জোরদার করতে হবে। ১৬ ডিসেম্বরের এই দিনে আসুন সবাই মিলে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর বলেই দীর্ঘ বক্তৃতা শেষ করলেন প্রধান অতিথি আব্দুল্লাহ আল কায়সার। সমাবেশ ভেঙে গেল! কিন্তু সমাবেশ মঞ্চের মাইকে ইসলামি গান বাজছে- শোনো, শোনো মমিন মুসলমান শোনো, স্বাধীনতা নয়কো ফ্যাসিবাদের আদর্শ জেনো…
জনতার ভিড় ঠেলে স্কুলপড়ুয়া নাতি সবুজের হাত ধরে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছেন আবুল কাসেম। সবুজ ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ বছরের দুটি বিশেষ দিনে আবুল কাসেমের হাত ধরে সরকারি অনুষ্ঠানে আসাটা তার অভ্যেসে পরিণত হয়েছে। সে জানে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে মাইকে মুক্তিযুদ্ধের গান বাজে, দেশের গান বাজে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা হয়। কিন্তু এবারের ১৬ ডিসেম্বর যেন অন্য রকম। মুক্তিযুদ্ধের গান বাজল না। প্রধান অতিথি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তেমন কিছুই বললেন না। সবুজের শিশুমনে তাই অনেক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে প্রধান অতিথি যখন মুক্তিযোদ্ধার খোঁজ করছিলেন, তখন আবুল কাসেম কেন নিশ্চুপ ছিলেন? এ প্রশ্নটাই তাকে অস্থির করে তুলেছে। এর আগে আবুল কাসেম যতবারই বিজয় দিবসের সরকারি অনুষ্ঠানে এসেছেন, বসার সুযোগ পেয়েছেন সামনের সারিতে। এবার সামনের সারিতে না বসে একেবারে পেছনের সারিতে, কেউ যেন না দেখে এমন সতর্কতায় সবুজের হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলেন। ব্যাপারটা ভালো লাগেনি সবুজের। তাই আবুল কাসেমকে তাড়া দিয়েছিল, দাদু আমরা এবার সামনের সারিতে বসব না?
না। ছোট্ট উত্তর দিয়েছিলেন আবুল কাসেম।
সবুজ অবাক হয়ে বলেছিল, কেন কেন… আমরা সামনের সারিতে বসব না কেন? অন্যবার তো সরকারি লোকজন তোমাকে ডেকে নিয়ে সামনের সারিতে বসাত। এবার তারা এল না কেন?
আবুল কাসেম এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। প্রধান অতিথির বক্তৃতার সময় সবুজ একটা কঠিন প্রশ্ন করে আবুল কাসেমকে। দাদু এই লোকটা তো স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস বলতেছে না। তুমি না একজন মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবাদ করছ না কেন? আমি প্রতিবাদ করি!
দুই হাত দিয়ে সবুজের মুখ চেপে ধরেছিলেন আবুল কাসেম। সেই থেকে সবুজ চুপ করে আছে। কিন্তু সমাবেশ ভেঙে যাওয়ার পর বাড়ির পথে রওনা দিয়ে হঠাৎ আবুল কাসেমের মুখোমুখি দাঁড়ায় সবুজ।
দাদু আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। আবুল কাসেম এমনটা আগেই আন্দাজ করেছিলেন। মৃদু হেসে বললেন, বাড়িতে চল। তার পর যত প্রশ্ন আছে…
আবুল কাসেমকে থামিয়ে দেয় সবুজ। বাড়িতে নয়, আমি এখনই প্রশ্নগুলোর উত্তর চাই।
আবুল কাসেম এবার হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না। সবুজ তাকে প্রশ্ন করে- তুমি তো একজন মুক্তিযোদ্ধা?
আবুল কাসেম উত্তর না দিয়ে বিব্রত চোখে মৃদু হাসেন। সবুজ আবার প্রশ্ন করে, ১৬ ডিসেম্বর তো বিজয় দিবস? এই দিনে বিজয়ের গান বাজল না কেন! দেশের গান গেল কোথায়? এবারও কোনো জবাব দিলেন না আবুল কাসেম। সবুজ আবার প্রশ্ন করল- প্রধান অতিথি যখন চিৎকার করে জানতে চাইল- এই সমাবেশে কি মুক্তিযোদ্ধা আছেন? থাকলে আওয়াজ দিন। তুমি কেন আওয়াজ দিলে না? তুমি কি ভয় পেয়েছ? কিসের ভয়? দাদু কথা বল…
আবুল কাসেম এবারও কোনো জবাব দিলেন না? হঠাৎ রাস্তায় দাঁড়ানো পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা তৎপর হয়ে উঠল। দূর থেকে বাঁশির সুরে সতর্কসংকেত শোনা গেল। আবুল কাসেমসহ যারা রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটছিলেন তাদের সরিয়ে দিল পুলিশ বাহিনী। নেতার বিরাট গাড়ির বহর এলাকা কাঁপিয়ে চলে গেল সামনের দিকে। সবুজ রাস্তায় পড়ে থাকা এক টুকরো ইট হাতে তুলে নিয়েছে। নেতার গাড়ির বহরের দিকে ইট ছুড়তে যাবে। আবুল কাসেম তাকে জাপটে ধরে বললেন, সবুজ, ও সবুজ করিস কী? সময়টা ভালো না, ইট ফেলে দে।
একজন কিশোরের হাতে প্রতিবাদের ইট দেখে পথচারীরা ঘিরে ধরল তাকে। আবুল কাসেমের মুখে মাস্ক ও মাথায় ক্যাপ থাকায় এতক্ষণ অনেকেই তাকে চিনতে পারেনি। এবার কাছ থেকে দেখে চিনতে পেরে মৃদু গুঞ্জন শুরু করে দিল। নানা জনে নানা কথা বলতে থাকল। কেউ বলল, বাচ্চা ছেলেটা যে প্রতিবাদ দেখাল, বড়দেরও উচিত এ রকম কিছু করা। আবার কউ বলল, এ ধরনের প্রতিবাদ ঠিক নয়। আবুল কাসেমের প্রতি ক্ষুব্ধ তারা। স্লোগান তুলল- ইনকিলাব জিন্দাবাদ। নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর…
হঠাৎ একদল তরুণকে নিয়ে একটি খোলা জিপ ছুটে এল আবুল কাসেমের সামনে। তরুণদের পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। চোখের পাতায় সুরমা লাগানো। তারা ফিল্মি স্টাইলে আবুল কাসেমকে জিপে তুলে নিয়ে বলতে গেলে জাদুর মতো হাওয়ায় মিশে গেল! সবুজ প্রাণভয়ে চিৎকার দিচ্ছে। পথচারীদের মধ্যে কেউ কেউ তাকে সমর্থন জানিয়ে বলল- ধর ধর, ধর…অন্যরা স্রেফ দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো!
নেতা মিটমিটে চোখে শুধুই হাসছেন! এই হাসির অর্থ বেশ ভয়ংকর। নেতা হাসতে হাসতেই আবুল কাসেমকে বললেন, বন্ধু তুমি কি এখন মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে ভয় পাও?
আবুল কাসেম ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ভয় পাব কেন?
নেতা আবারও হাসতে হাসতেই বললেন, তবে আমি যে বারবার মুক্তিযোদ্ধাকে খুঁজছিলাম, সাহস করে উঠে দাঁড়ালে না কেন? নিশ্চয়ই ভয় পেয়েছ। ভয়ের কী আছে? শোনো, তোমরা এত বছর আমাদের ওপর যে অন্যায়-অবিচার করেছ, আমরা তা করব না। আমরা মিলেমিশে থাকতে চাই। শুধু স্বীকার করো একাত্তরে তোমরা ভুল করেছ। একাত্তর ছিল গণ্ডগোলের বছর। ভারত অত্যন্ত সুকৌশলে আমাদের মধ্যে একটা গণ্ডগোল বাধিয়ে দিয়েছিল। ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ সৃষ্টি করেছিল। বহু বছর পর সেই বিরোধ মেটানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এসো বন্ধু হাত মেলাও… বলেই নেতা তার বাম হাত বাড়িয়ে দিলেন।
আবুল কাসেম গর্জে উঠলেন। চিৎকার দিয়ে বললেন- তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ?
নেতা হাসতে হাসতেই বললেন, ভয় দেখাব কেন? তবে হ্যাঁ, সময় বলে একটা কথা আছে। সময় তোমাকে ভয় দেখাচ্ছে। মনে পড়ে বন্ধু! আজ থেকে ৫৪ বছর আগে তোমরা আমাকে এভাবেই ধরে নিয়ে গিয়েছিলে। জুতার মালা পরিয়ে দিয়েছিলে। আমার অপরাধ কী ছিল? আমি তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছি।
নেতার কথা শুনে আবারও চিৎকার দিয়ে প্রতিবাদ করলেন আবুল কাসেম- মুক্তিযুদ্ধ তথাকথিত নয়। মুক্তিযুদ্ধ এই স্বাধীন দেশের শিকড়। এটা ভুলে যেও না। নেতা বললেন, না আমি কিছুই ভুলিনি। ওই যে বললাম সময়, সময় কিন্তু কাউকে ক্ষমা করে না। এতদিন ছিল তোমাদের সময়। এখন সময়টা আমাদের। আমাদের পক্ষে কাজ করো। তোমাকে উপযুক্ত সম্মান দেওয়া হবে। তোমার মতো অনেক মুক্তিযোদ্ধা এখন আমাদের দলে ভিড়েছে। তুমিও আসো। উপযুক্ত সম্মান পাবে!
আবুল কাসেম ক্ষুব্ধ কণ্ঠে দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। এর চেয়ে উপযুক্ত সম্মান আর কী হতে পারে? একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রশ্নে কোনো আপস নেই…
নেতা এবার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, এখনো সময় আছে আবুল কাসেম। আমার কথা শোনো। নিজেকে বদলাও। তা না হলে আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারব না। মব জাস্টিস থেকে তুমিও রেহাই পাবে না।
আবুল কাসেম চেয়ারে বসেছিলেন। নেতার কথা শুনে প্রতিবাদের ভঙ্গিতে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। আবারও দৃঢ়তার সঙ্গে নেতাকে উদ্দেশ করে বললেন, কান খুলে শুনে রাখো। আমি আবুল কাসেম, মহান একাত্তরে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার। তোমরা যদি আমাকে মেরেও ফেল তবু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই কথা বলব। মহান মুক্তিযুদ্ধে তোমরা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছ। আমি তার বিচার চাইব। ওই যে তুমি সময়ের কথা বললে না। সময় আবার পাল্টাবে। মনে রেখ এক মাঘে শীত যায় না।
আবুল কাসেমের কথা শুনে নেতা চরম বিরক্ত হয়ে বললেন, আবুল কাসেম আমি বোধ করি তোমাকে বাঁচাতে পারব না। এখনো সময় আছে আমাদের দলে ভিড়ে যাও। তোমাকে কিছুই করতে হবে না। তুমি শুধু আমাদের সমর্থন দেবে। শুধু বলবে একাত্তরে একটা ভুল করেছি, ব্যস…
নেতার কথা শুনে গগনবিদারি চিৎকার দিলেন মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাসেম। নেতার মুখে এক দলা থুতু ছিটিয়ে দিয়ে বললেন, এই রাজাকার আবারও কান খুলে শুনে রাখ। আমি আবুল কাসেম। একজন মুক্তিযোদ্ধা। এটাই আমার বড় পরিচয়…
মনে হলো একজন মুক্তিযোদ্ধার চিৎকার শুনে একজন রাজাকার ভয় পেয়েছে। অনেক ভয়। মুখোশ মানুষের, মুখোশ খুলে গেছে…