প্রথমে একটু দার্শনিক কথাবার্তা বলি, পাঠকদের ঘাবড়ে দেওয়ার জন্য। শুনেছি পাঠকদের কাছে পাত্তা পাওয়ার জন্য এ ধরনের কথা দিয়েই প্রবন্ধ শুরু করতে হয়। কথাটা এই যে- এই সময় ব্যাপারটা প্রাকৃতিক, না সাংস্কৃতিক সেটা আমি এখনো বুঝে উঠতে পারি না। প্রাকৃতিক, মানে মানুষ আসার আগে থেকেই ছিল, মানুষ পৃথিবী থেকে মুছে গেলেও থাকবে। মানুষের আগে যেসব পশুপাখি এসেছে, বা এখনো আছে, তারা কি সময় ব্যাপারটা বোঝে? হ্যাঁ, তারা হয়তো পরিবর্তনটা বোঝে। এই গরম চলছে, তার পর বৃষ্টি চলবে কিছুদিন, তার পরে বৃষ্টি কমবে, আস্তে আস্তে গরম সরে গিয়ে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব আসবে, তার পর প্রবল ঠাণ্ডা, কোথাও বরফও পড়বে, গাছপালা সব ঢেকে যাবে, ফলমূল পাওয়া যাবে না। সেই সময়ের জন্য অনেক পশুপাখি খাবার সঞ্চয় করে রাখে আমরা জানি। তার পর এক সময় বরফ গলবে, গাছপালায় সবুজ ফিরে আসবে, গরমের মধ্যে ফুল ফুটবে, ফল ধরবে। এভাবে চলবে পৃথিবীটা, ঘুরে ঘুরে, বারবার।
পশুরা পারেনি, কারণ তাদের ভাষা নেই, মানুষই এসে প্রথম এই বদলকে চিহ্নিত করল সময়ের ধারণা দিয়ে। সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস বছর। যা ঘুরে ঘুরে আসে। এর কিছুটা প্রাকৃতিক। আবার ঘুরে ঘুরে আসে না অনেক কিছু, সেখানে সময় একমুখো, শুরু কখন হয়েছে, শেষ কখন হবে কেউ জানে না। প্রাকৃতিক ঋতুগুলো ঘুরে ঘুরে আসে, তার সঙ্গে বছরের ধারণাটা মিলিয়ে দিল মানুষ। কিন্তু যাকে সাল বা অব্দ বলে, তা আর ঘুরে ঘুরে আসে না, তা বাড়তেই থাকে। সে সময়, একমুখো সময়, দ্রুত অতীত হয়, বর্তমানকে মুহূর্তে অতীতে ঠেলে দিয়ে অনন্ত ভবিষ্যতের দিকে দৌড়াতে থাকে।
দৌড়াতে থাকে বলেই বেঁচে গেছি। তাই আমরা প্রতি বছর একটা করে ‘নববর্ষ’ পাই।
দুই
যাই হোক, এবার ছেঁদো দার্শনিকতা বাদ দিয়ে আসল কথায় আসি। বাংলা নববর্ষ প্রত্যেকবারই আসে, আর প্রত্যেকবারই বাঙালির জীবনে একটা বিরোধের জায়গায় খোঁচা দেয়। এতে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান উভয়কে যে সংকটের মধ্যে পড়তে হয়েছে সে কথাটা আগে বলি। সেটা হলো, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে তারাও অন্য সবার মতো ঔপনিবেশিকতায় আক্রান্ত আর আপ্লুত হয়েছে ব্রিটিশ শাসনে এবং অর্থনীতিতে পাশ্চাত্য প্রণালি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে, পয়লা জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বরের পশ্চিমি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে। তাদের স্কুল-কলেজ-অফিস-আদালত চলে বিলিতি ক্যালেন্ডারে, মাইনে, ছুটিছাঁটা সব হয় ওই ক্যালেন্ডার অনুসারে। তবে হিন্দুদের ক্ষেত্রে হিন্দু পার্বণের প্রচুর ছুটিও মূলত বাংলা হিন্দু পঞ্জিকার আক্রমণে। সেই ক্যালেন্ডার তারা মেনে নিতে বাধ্য হয়ছে। সেখানে বিলিতি ক্যালেন্ডার বাংলা পঞ্জিকাকে সসম্ভ্রমে জায়গা ছেড়ে দিয়েছে, বিয়ে, অন্নপ্রাশন, উপনয়ন, শুভযাত্রা, একাদশী অমাবস্যার উপবাস ইত্যাদির ওপর প্রশাসন চালানোর জন্য। এবং নবমীতে লাউ খেতে আছে কি না আর চতুর্দশীতে টোম্যাটো। বিলিতি ক্যালেন্ডার জানে যে কবে পূর্ণিমা বা অমাবস্যা হবে, কিন্তু তাতে কী কী আচার-অনুষ্ঠান করতে হবে সধবা বা বিধবাদের, সে সম্বন্ধে কিছুই জানে না। ফলে বাঙালি হিন্দুদের দু-নৌকোয় পা দিয়ে চলতে হয়। ইংরেজি ক্যালেন্ডারকেও আমরা ছাড়তে পারি না, বাংলা পঞ্জিকাকেও না। যেমন বড়র মধ্যে পুজোর ছুটি, আর ছোটর মধ্যে জন্মাষ্টমী থেকে শিবরাত্রি সবই বাংলা পঞ্জিকা আমাদের জন্য জমিয়ে রাখে। তাই ১ জানুয়ারি আমাদের কাছে ‘নিউ ইয়ার’ বলে একটা হুল্লোড়ের দিন, কিন্তু তা আমাদের নববর্ষ হতে পারেনি। নববর্ষ আমাদের এক সাংস্কৃতিক মহোৎসবের দিন।
তিন
বাঙালি হিন্দু শুধু নয়, বাঙালি মুসলমানের কাছেও তাই। বাংলাদেশ সেটা অনেক বেশি করে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে। আমার মুসলমান ছাত্রছাত্রীরা আমাকে বলেছে যে, তাদের হাদিসে বছরের প্রথম দিনকে এভাবে বিশেষভাবে পালনের কোনো নির্দেশ নেই। তাদেরও অনেক পরব মানতে হয় হিজরি সন অনুসারে। এখানে ইসলামের সংস্কৃতি তার শিকড় ধরে রেখেছে।
কিন্তু আমরা সবাই জানি যে, বাংলাদেশে এই পয়লা বৈশাখে প্রচুর ধুমধাম হয়, পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার চেয়ে অনেক শক্তিশালী ও বর্ণাঢ্য করে উদ্যাপন করা হয়ে আসছে বহু বছর ধরে। সকালে ঢাকার রমনার বটতলায় ছায়ানটের বিশ্ববিখ্যাত গানের অনুষ্ঠান, আর পরে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের (মূলত চারুকলা অনুষদের নেতৃত্বে ও পরিকল্পনায়) বিশাল উজ্জ্বল ও রূপসমৃদ্ধ মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা, যতদূর জানি, ইউনেসকোর অস্থায়ী বিশ্ব-ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে, তার তুলনা পশ্চিমবঙ্গে এখনো তৈরি হয়নি। এর মধ্যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তনে আমাদের একটু সংশয় হয়েছিল সবকিছু আবার পুরোনো দিনের মতো চলবে কি না। কিন্তু মুখবই-ওয়াটসঅ্যাপে দেখছি ঢাকায়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বত্র, বিপুল উৎসাহে ও পরাক্রমে নববর্ষের উৎসব অনুষ্ঠানের রিহার্সাল চলেছে, কাজেই আমাদের মনে এ সংশয় নেই যে, বাঙালির এ ‘ধর্মমুক্ত’ উৎসব আবার দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাভাষী অঞ্চলে নিজের জায়গায় ফিরে এসেছে। এ হলো সেই এক চমৎকার সাংস্কৃতিক সঞ্চারণ বা diffusion, যার কথা সংস্কৃতির নৃবিজ্ঞানীরা আমাদের শিখিয়ে থাকেন, যা ভাষা, ধর্ম সবকিছুকে অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ে।
ইসলাম থেকে হিন্দুরাও কি কম কিছু নিয়েছে? চিত্রকলা, স্থাপত্য, সংগীত থেকে শুরু করে গরম মসলাপাতির রান্না, এমনকি সব ভারতীয়ের পরিচিত পাজামা-পাঞ্জাবি পোশাক আমাদের দিয়েছে ইসলামের সংস্কৃতি। বাঙালির লুঙ্গি পর্যন্ত, তার নামটা মায়ানমারি হোক আর যাই হোক। ফলে পঁচিশে বৈশাখের সঙ্গে পয়লা বৈশাখ হয়ে উঠেছে বাঙালির আর-এক প্রধান ধর্মমুক্ত উৎসব। অখণ্ড, অবিভক্ত বাঙালির উৎসব।
অবশ্যই আমাদের গ্রামীণ হালখাতার মিলিত উদ্যাপন তো এখনো আছে। শহরেও তার সংক্রমণ মুছে যায়নি। বিশেষ করে দিশি অলংকার, পোশাক, মিষ্টি আর মুদির দোকানে এখনো হালখাতার পরব হয়, যদিও, যতদূর মনে হয়, তার সংকোচন ঘটছে। আগে হিন্দু দোকান থেকে ছাপানো গণেশ-চিহ্নিত চিঠিতে নিমন্ত্রণ আসত, বার্ষিক গ্রাহকরা সন্ধেবেলায় দোকানে শরবত/ নরম পানীয় আর মিষ্টির প্যাকেটে এবং গণেশ, লক্ষ্মীদেবী, ঠাকুর রামকৃষ্ণ-সারদা-বিবেকানন্দ, নেতাজি এমনকি রবীন্দ্রনাথের ছবি দেওয়া বাংলা ক্যালেন্ডারে আপ্যায়িত হতেন, এখনো নিশ্চয় হন। অক্ষয় তৃতীয়ার সঙ্গে ভাগাভাগি করে হলেও। দোকানে আগে আমপাতা আর কদম দিয়ে সাজানো হতো, হিন্দু দোকানে গণেশ পুজো হতো, তাও নিশ্চয়ই হয়, টুনি বাল্বের ঝালরের সঙ্গে। গ্রামে মায়েরা নদীতে স্নান করে এসে হাতপাখায় আমাদের বাতাস করতেন বা বাঁশের গোটানো নতুন পাতার গোছা বা আমার পঞ্চপল্লব সেই নদীর জলে ভিজিয়ে আমাদের গায় ছিটে দিতেন, খালি গায়ে সেই জলকণার সুখস্পর্শ আমাদের মনে আছে। ভুলেও গেছি আরও কত কী হতো। ভালো খাওয়াদাওয়া, নতুন পোশাক- সেসব ভুলিনি।
চার
কিন্তু সেসব পারিবারিক উদ্যাপনকে আড়াল করে এখন আরও অনেক বেশি বিনোদন ও প্রদর্শনধর্মী সাংস্কৃতিক নববর্ষ এসে ক্রমশ তার জায়গা নিচ্ছে। শহরে সকালবেলায় কোনো ক্লাবের উদ্যোগে এনসিসি-দীক্ষিত ছেলেমেয়েদের শোভাযাত্রা ও কুচকাওয়াজ দেখি, আবার তার সঙ্গে ট্রাকে গানের দলের দলবদ্ধ রবীন্দ্র বা নজরুলসংগীতের সমস্বরও কানে এসে পৌঁছায়।
বস্তুতপক্ষে এসব ব্যাপকতর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই এখন বাংলা নববর্ষের প্রধান স্মারকচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমগ্র বাংলাভাষী অঞ্চলে, বাংলাদেশে হয়তো পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক বেশি করে। এমনকি বিদেশে- নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের গির্জা প্রাঙ্গণে, এমনকি ম্যাডিসন স্কয়ারে। বন্ধুবর মহীতোষ তালুকদারের সৌজন্যে তারও তালিমের ছবি আমরা মুখবইয়ে দেখতে পাই। এ রকম নিশ্চয় ঘটে লন্ডনে ও ইংল্যান্ডের নানা প্রান্তে, অস্ট্রেলিয়ায়, হয়তো জাপানেও। তাতে বাংলাদেশের বন্ধুরা নেতৃত্ব দেন। ভারতের অন্যান্য বাঙালি বসতিঘন শহরে- দিল্লি, মুম্বাই, হায়দরাবাদ বা ব্যাঙ্গালোরেও।
পাঁচ
ইংরেজি নববর্ষের একটা রীতি হলো, মধ্যরাত্রের গির্জার ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে, ওরা যাকে বলে Ringing out the old, ringing in the new. মানে পুরোনোকে বিদায় জানানো, নতুনকে অভ্যর্থনা করা। একটা পরিবর্তনের জন্য প্রত্যাশা করা। পশ্চিমে শীতের তুষারাচ্ছন্ন তীব্রতার মধ্যেই পুরোনো বছর চলে যায়, নতুন বছর আসে। ওদের পৃথিবীতে শীত খানিকটা মৃত্যুর রূপক। বেশ কিছু পরে, এপ্রিলে হয়তো ও-দেশে বসন্ত আসে, পৃথিবীতে প্রকৃতিতে নতুন জীবন নিয়ে। পশ্চিমদেশে সে পরিবর্তন দেখার মতো। পাতাঝরা গাছের শীর্ণ কালো ডাল কীভাবে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই অন্তহীন ঝলমলে সবুজ পাতায় ভরে যায়।
আমাদের নববর্ষ খানিকটা বসন্তের গায়ে-গায়েই চলে আসে। আসে কালবৈশাখীর ঝড় নিয়ে, বৃষ্টি নিয়ে, যা গাছপালাকে নবজীবন দেয়।
তাই আমরা এ নববর্ষের কাছে কী চাইব? অনেক কিছু আছে চাইবার। একটা যুদ্ধহীন পৃথিবী চাইব, অন্তহীনভাবে এ চাওয়া আমাদের চলবে। ঘরের কাছেপিঠে একটা ভয়-বিদ্বেষহীন কুসংস্কারহীন গণতান্ত্রিক পরিসর চাইব, একটা দুর্নীতিহীন, বঞ্চনাহীন, মূঢ়তাহীন প্রতিবেশ চাইব। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানের আদান-প্রদানের যে সংস্কৃতি এসব অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে গড়ে উঠেছে, এ উপমহাদেশে তাকে অস্বীকার করার বা ভাঙবার চেষ্টা তো এখনো বন্ধ হয়নি। এবারের নববর্ষ সেই চেষ্টার মুখে ছাই নিক্ষেপ করুক।
আমরা জানি, শুধু নিছক চাওয়াতেই বা ঘণ্টা-থালাবাসন-বাজানোতেই থেমে গেলে হবে না। কিছু আমাদের পথে নেমে চাইতে হবে, জোর গলায় চাইতে হবে।
লেখক: ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ ও গবেষক এবং সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়