গণ-অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মধ্যে একটা আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। তার মধ্যে নির্বাচনব্যবস্থা ও সংস্কার কমিশন অন্যতম। যার প্রধান ছিলাম আমি। এরপর সরকার প্রথম ছয়টা সংস্কার কমিশনের প্রধানকে নিয়ে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- সংবিধান সংস্কার কমিশন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ইত্যাদি। এ সংস্কার কমিশনের প্রধানদের নিয়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে উচ্চতর কমিশন গঠিত হয়েছে। উচ্চতর কমিশনের কাজ হলো সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলা ও আলোচনা করে ঐকমত্যে পৌঁছানো। যেখানে সব রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করবে এবং জুলাই জাতীয় সনদে পরিণত হবে। ঐকমত্য কমিশন প্রথম দফায় ছয়টি সংস্কার কমিশন থেকে ১৬৬টি সুপারিশ নিয়ে প্রেস সিট তৈরি করে রাজনৈতিক দলের কাছে পাঠিয়েছে। তাদের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তীতে দুই দফা ঐকমত্য কমিশন আলোচনা করে। প্রথম দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এক বা একাধিক আলোচনা করে ৬০-এর অধিক বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায়। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ধাপে ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ২৩টি সভা করেছে এক মাস সময় নিয়ে। তার ভিত্তিতে ১৮টি মৌলিক সংস্কার করেছে। যার ভিত্তিতে একটা জুলাই জাতীয় সনদের খসরা তৈরি হয়েছে। এখন চূড়ান্ত করে রাজনৈতিক দলের কাছে দেওয়া হবে। যার ভিত্তিতে এটা স্বাক্ষরিত হবে। এখন রাজনৈতিক দলের কাছে দাবি উঠেছে কীভাবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হবে- এ ব্যাপারে যেন সিদ্ধান্ত হয় এবং এটা একটা আইনি বাধ্যবাধকতার সৃষ্টি হয়। আমরা উচ্চতর কমিশনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করব কীভাবে এটা বাস্তবায়ন হবে। দেশ অর্থনৈতিকভাবে লুটপাটের শিকার হয়েছিল, এখন তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। সবকিছু ঠিকই আছে। দ্রব্যমূল্য মোটামুটি স্থিতিশীলতার মধ্যে আছে। বিদ্যুৎ নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা নেই। বিদ্যুতের বকেয়া বিল পরিশোধ করা হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণটা স্থিতিশীলতার মধ্যে আছে। মব সমস্যা আছে। এসব সত্ত্বেও জনআকাঙ্ক্ষার নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন।
মানুষের ভোটের অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত একটি মানবাধিকার। তাই নির্বাচনে জনগণ যেন তাদের এ গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, তা আমাদের দেখতে হবে। তাহলে নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ ফিরে আসবে। মানুষ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবে।...
এখন প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করা। সেজন্য নির্বাচন অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে অর্থাৎ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে হবে। মানুষ যদি সহিংসতামুক্ত হয়, তাহলেই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবে। নির্বাচনে যারা ভোট দেবে তারা নারী-পুরুষ এবং সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষ- সবাই যেন এতে অন্তর্ভুক্ত হয়। কেউ যেন বাদ না পড়ে। আর আওয়ামী লীগের ব্যাপারে বলব, এটা আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশনই নির্ধারণ করবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে কি পারবে না। সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রজাতন্ত্রের সব কর্মচারীকে পরিপূর্ণভাবে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে। সীমাহীন দলীয়করণের মাধ্যমে বিগত সরকার এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যকার বিভাজন প্রায় সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়ে পড়েছিল। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের অনেকেই দলীয় ক্যাডারের মতো আচরণ করেছিল। তারা সরকারের দমন-পীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়ে কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছিল। এগুলো দূর করেই নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হবে। আমাদের আইনগুলো শক্তিশালী, কিন্তু ভিত্তিগুলো দুর্বল। অর্থাৎ দুর্বল চিত্তের ব্যক্তিদের, দুর্বল চরিত্রের ব্যক্তিদের- যাদের দলীয় আনুগত্য আছে, সেই সব ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার ফলে তারা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। এটা ব্যক্তির সমস্যা, এটা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা। কারণ, বিধিবিধান যদি সঠিকভাবে না মানা হয়, তাহলে তা প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে। ব্যক্তির সমস্যাই হচ্ছে বড় সমস্যা। সে জন্যই সংস্কার প্রয়োজন। বিধিবিধানের প্রয়োজন। পদ্ধতির সংস্কার ও প্রক্রিয়ার সংস্কার প্রয়োজন।
বাংলাদেশ অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। একই সঙ্গে আমরা এ কথাও বলি যে, এখনো স্বাধীনতার অনেক স্বপ্ন আমাদের পূরণ হয়নি। মানুষ ভোট দিতে গেছে কিন্তু ভোট দিতে পারেনি। ভোটের মাঠে বিকল্প থাকতে হয়। নিজেদের মধ্যে ভোট হলে তো সেই বিকল্প থাকে না। তাই মানুষ অতীতে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি। পছন্দমতো প্রার্থী বাছাই করতে নির্বাচন সবার জন্য অংশগ্রহণমূলক হওয়া প্রয়োজন, যা বিগত সময়গুলোতে দেখা যায়নি। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে গণতন্ত্র, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ভোটাধিকারসহ সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনের সচেতন ব্যক্তিদের ভূমিকা রয়েছে।
আমাদের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়ার কারণ- ভোট দিতে গেলে সঠিকভাবে ভোট দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে তাদের মনে শঙ্কা ছিল। দেশে বহুদিন ধরে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না বলে অনেকে মনে করে থাকে। এ ধরনের নানান শঙ্কা তাদের মনে কাজ করে। কাজেই তারা ভোট দিলে বা না দিলে তাতে কিছু এসে যায় না। ক্ষমতাসীনরা যাদের চায় তারাই নির্বাচিত হবে। এই নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার ওপর মানুষের ব্যাপক অনাস্থা। এর একটি কারণ হলো, যে প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে তার মধ্যে অন্যতম হলো নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের ওপর মানুষের অনাস্থার কারণ ছিল ব্যাপক দলীয়করণ। অনাস্থা নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার ওপর এবং এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর। এসব কারণে মানুষ ভোট দিতে চায়নি এবং তারা মনে করে তারা ভোট দিলেও তাদের প্রত্যাশিত প্রার্থীদের পরাজয় নিশ্চিত। কাজেই ভোটদানে তারা অনীহা প্রকাশ করে এসেছে সব সময়। কাজেই আমরা বলেছি, নির্বাচনি ব্যবস্থাপনায় ব্যাপকভাবে সংস্কার দরকার। এ অবস্থা দূর করতে না পারলে নির্বাচনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। অর্থাৎ নির্বাচনব্যবস্থা কোনোভাবেই কার্যকর হবে না। বিগত সরকারের আমলে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নির্বাচনে টাকার খেলা। যোগ্য-অযোগ্য যেই হোক, তারা মনোনয়ন কিনে নিত। মনোনয়নের পর তারা বিভিন্নভাবে টাকা-পয়সা ব্যয় করে তাদের জয় নিশ্চিত মানুষের ভোটের অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত একটি মানবাধিকার। তাই নির্বাচনে জনগণ যেন তাদের এ গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, তা আমাদের দেখতে হবে। তাহলে নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ ফিরে আসবে। মানুষ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবে। আমরা আমাদের সংস্কার প্রস্তাবে জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সর্বতোভাবে উৎসবমুখর নির্বাচনি ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপক্ষে মতামত দিয়েছি। নিজে কেন্দ্রে গিয়ে ভোটদানের মধ্যদিয়ে দেশের মানুষ আবারও নির্বাচনমুখর হয়ে উঠবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)