যেকোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে মাতৃভাষা এক মহত্তম সম্পদ। কারণ নিজের ভাষার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ও আত্মস্থকরণ যতটা অনায়াসসাধ্য, অন্যের ভাষায় তা কঠিন ও দুরূহ। বাঙালির শিক্ষাব্যবস্থায় মাতৃভাষা বাংলা কখনোই অধিক গুরুত্বসহ ও অপরিহার্যভাবে ব্যবহৃত হয়নি। বিদেশি ভাষার প্রচণ্ড দাপট সবসময়ই এখানে মাথা উঁচু করে থেকেছে। যে কারণে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বহুধা বিভক্ত হয়েছে। দেশপ্রেম ও নীতি-নৈতিকতা এবং আদর্শের ক্ষেত্রে ভিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি, চিকিৎসা যে শিক্ষাই হোক না কেন, তা নিজের মাতৃভাষায় যেভাবে অর্জন করা সম্ভব, অন্য কোনো ভাষাতেই তা সম্ভবপর নয়। মানুষের চিন্তা মানুষকে বড় করে। আর সে চিন্তা বিকশিত হয় মাতৃভাষায়। সে মাতৃভাষা যখন শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্ব পায় না বা কার্যকর থাকে না, তখন আমাদের চিন্তা রুগ্ণ ও অপুষ্টিকর হয়ে যায়। চিন্তা ছাড়া ব্যক্তি, দেশ, জাতি বড় হতে পারে না। চিন্তার বড় শক্তি তার নিজের মাতৃভাষা। দুর্ভাগ্য, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় তা হয়নি। বর্তমান অবস্থা আরও ভয়াবহ ও মহাবিপর্যয়ের শিকার। বিভিন্ন ভাষায় শিক্ষাব্যবস্থা চলছে। শিক্ষাঙ্গনগুলো অসুস্থ রাজনীতির দৌরাত্ম্যের শিকারে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র শিক্ষাব্যবস্থাকে মাতৃভাষার মাধ্যমে পরিচালিত করবে, সুব্যবস্থা করবে, সমাজকে উন্নত করবে, মনুষ্যত্বকে উদ্বোধিত করবে। বাস্তবে সে শিক্ষার ধারা উল্টোদিকে প্রভাবিত হচ্ছে। শিক্ষার এ মহাবিপর্যয় রোধ করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সুস্থ রাজনীতি, সুস্থ চিন্তা, শুভবুদ্ধি, নিজস্ব শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য এবং মাতৃভাষাকে মর্যাদা দেওয়া। অসুস্থ রাজনীতি, ধর্মের অপব্যবহার, বহুভাষামিশ্রিত শিক্ষাব্যবস্থা, নৈতিকতাবিবর্জিত শিক্ষা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছে।
করোনাকালে দেখেছি সারা পৃথিবীতে শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে ভেঙে পড়েছিল। আমাদের শিক্ষাব্যস্থাতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। জীবন-জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ চলেছে। সে অবস্থায় শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে তলানিতে নেমে এসেছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়েছিল। অনলাইনে নামমাত্র শিক্ষা দেওয়া, শিক্ষার্থীরা পরিবার বাঁচাতে শিক্ষাকে ছুড়ে ফেলে কর্মজীবন বেছে নিয়েছিল। অসংখ্য ছাত্রীকে অর্থনৈতিক কারণে শিক্ষা ছাড়তে হয়েছে। জীবনের দায়ে পরিবার তাদের বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। অগণিত কিশোরী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা যে পুঁজি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তা বহু আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। মানবিক মানুষ গড়ে তোলার থেকে পুঁজিনির্ভর শিক্ষাকেই অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা পরিণত হয়েছে পণ্যে। যেখানে শিল্প-সাহিত্যকে একরকম ছুড়ে ফেলে বাজারমূল্যনির্ভর বিষয়কে পাঠ্য হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে অধিক হারে মুনাফা লাভ করা যায়। করোনাকালীন ভয়াবহ সময়েও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুঁজিবাদী মালিকরা নিজেদের মুনাফার কথাই বিবেচনা করেছে, মানবিক হতে পারেনি। এতে করে বহু শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে গেছে। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতেও শিক্ষা বাণিজ্যনির্ভর। এতে করে শিক্ষাব্যবস্থা মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ছে। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একসময় ভাষার অধিকার হরণের নির্লজ্জ চেষ্টা করা হয়েছে। শিল্প-সাহিত্যের ওপর আগ্রাসন চালানো হয়েছে। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর বহুবার বহুভাবে বহুকৌণিক রাজনৈতিক আঘাত এসেছে। কিন্তু এ দেশের মানুষ তার নিজের ভাষা-শিল্প-সাহিত্যে কখনো আপস করেনি। নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেনি। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান এসব জাতধর্মের চেয়ে বড় উঠেছে বাঙালির বাঙালিত্ব। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মহাবিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এসব চেতনা কতটুক ধারণ করে, আদৌ করে কি না! তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে এসব বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত আছে কি না! ভালোবাসার সঙ্গে গ্রহণ করছে কি না! এসব চর্চার ভেতর শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলছে কি না! এসব এখন সময়ের শাণিত প্রশ্ন। রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষা এখন পণ্য হিসেবে অঙ্কের খাতায় যুক্ত হয়েছে। মানববিদ্যা ব্যাপারটি এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযোজ্য মনে করে না। এ সুযোগটিই গ্রহণ করে মধ্যবিত্ত আদর্শিক জীবনব্যবস্থাকে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। ফলে শিক্ষা হয়ে উঠছে পুঁজি বিকাশের নিষ্ঠুর হাতিয়ার।
শিক্ষাব্যবস্থায় ‘ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়’ নামক একটি বস্তুর প্রবল প্রকোপ আছে। যেখানে বাঙালি সংস্কৃতিকে তারা ধারণ লালনের প্রয়োজন মনে করে না। বিদেশি সংস্কৃতি ধারণ করায় অভিজাত্য মনে করে। এর ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। চোখের সামনে গড়ে ওঠা যে প্রজন্ম, তারা অধিকাংশই শুদ্ধভাবে না পারে বাংলায় কথা বলতে, পড়তে ও লিখতে, না পারে বাংলা সাহিত্য-সংগীত-শিল্পকলার রসাস্বাদন করতে। এটা কেবল ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও আচার-প্রথার প্রতিও তাদের বিশেষ অনুরাগ কিংবা শ্রদ্ধাবোধ নেই। বরং এক ধরনের অবজ্ঞা ও উপেক্ষার মনোভাব তৈরি হয়েছে। ঘোর বিশ্বায়নের যুগে এ অনিবার্য পরিণাম নাকি মেনে নিতেই হবে! কিন্তু এতে যে আরও বিভ্রান্তি ও নৈরাজ্য তৈরি করবে- বাঙালির নিজস্ব সত্তা যে কালের যাত্রায় একসময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠবে, মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, বিদেশি সংস্কৃতিনির্ভর ও পুঁজিবাদের মোহগ্রস্ত ভবিষ্যতের দিকেই ধাবিত করবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সে হিসাবটি আদৌ আছে?
এ অপধারা তৈরির মূল কারণ যে শুধু ইংরেজি মাধ্যম আর ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা, তা কিন্তু নয়। এর জন্য সমানভাবে দায়ী এক ধরনের মেরুদণ্ডহীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র, অযোগ্য প্রচার মাধ্যম, অপরিপক্ব বিজ্ঞাপনী সংস্থা, দেশাত্মবোধবর্জিত কর্পোরেট সম্প্রদায়, কিছু অভিসন্ধিপ্রবণ লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী এবং অবশ্যই অদূরদর্শী অভিভাবক। শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমশ মাথা নুয়ে পড়ছে। কারণ প্রতিক্রিয়াশীল ও পুঁজিবাদী শ্রেণির কাছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অসহায় আত্মসমর্পণ; অবক্ষয়ী আমলাতন্ত্রের সীমাহীন দুর্নীতি; শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য- নিজস্ব ভাষার সুষ্ঠু প্রয়োগের ব্যাপারে প্রবল অনীহা, কর্পোরেট মহলের সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব ও নির্লজ্জ মুনাফাবৃত্তি; সমাজের এক শ্রেণির মানুষের ভাষিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক অপরাজনীতি এবং সবশেষে অভিভাবক শ্রেণির সম্মিলিত অবহেলা ও উপেক্ষার শিকার হয়ে শিক্ষাব্যবস্থা মূলধারা থেকে ছিটকে যাচ্ছে।
শিক্ষাঙ্গন হলো আদর্শ, নৈতিকতা, দেশপ্রেম তৈরির সবচেয়ে পবিত্র জায়গা। সে শিক্ষাঙ্গন বর্তমানে বহুমাত্রিকতা নীতিহীনতায় প্রশ্নবিদ্ধ। অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগবাণিজ্য, দলীয় রাজনীতির দাসত্ব, পদ-পদবির জন্য নির্লজ্জ ও ব্যক্তিত্বহীন চাটুকারিতা। আদর্শিক চিন্তা, নীতিবোধ, নৈতিকতা, মূল্যবোধ- এসব মগজের ভেতর থেকে বের হয়ে কর্পূরের মতো হারিয়ে যাচ্ছে। ন্যায়বোধ, শুভবুদ্ধি, নৈতিকতা, দেশপ্রেম- এ শব্দগুলো যে শুধু শব্দ নয়- ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য যে সবচেয়ে মূল্যবান, সেটা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। অথচ একসময় শিক্ষা অর্জন ও মূল্যবোধের অন্যতম ভিত্তি ছিল ধর্ম ও দর্শন। দীর্ঘদিনের লালিত আচরণ-বিশ্বাস, সমাজের নিজস্ব আদর্শ ও নিয়মনীতি, রীতি, নীতি ও প্রথা মেনে চলার ভেতর ছিল সম্মানবোধ। এর সঙ্গে জড়িত সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা, শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, সর্বোপরি সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত হওয়া বিশেষ কতকগুলো গুণ। মানুষের আত্মিক ও সামাজিক উৎকর্ষের জন্য এবং জাতীয় জীবনে উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করার জন্য সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের লালন, চর্চা ও বিকাশের বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এসব বর্তমানে হারিয়ে যাচ্ছে। ন্যায়বোধ, নৈতিকতা, শিষ্টাচার, মূল্যবোধ দূরে ঠেলে লেবাস ধারণ করে ধর্মকেই রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সমাজে নিজের অবস্থান সুদৃঢ়তর করার জন্য। যা ভবিষ্যতের জন্য মোটেও ভালো কথা নয়। শিক্ষাধারাতেও এখন এসব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একটা জাতি গঠনের মূল নায়ক শিক্ষক। সেই আদর্শ, নীতিবান, মাথাউঁচু শিক্ষক এখন কয়জন আছেন, যারা মেরুদণ্ড সোজা করে অবিচল থাকেন! শিক্ষকরা কি আগের মতো বইয়ের পোকা হয়ে থাকেন, নীতিতে অটল থাকেন, মাথা উঁচু করে বাঁচেন! নাকি সুবিধা লাভের আশায় দলীয়বৃত্তে বন্দিত্ব বরণ করে, মেরুদণ্ডহীনতায় জীবন যাপন করেন! শিক্ষকতার যে নীতি-আদর্শ তা কয়জন ধারণ করেন! রীতিমতো ঘনঘোর অন্ধকার নেমে এসেছে শিক্ষকতা পেশায়। শিক্ষাথীদের হীনস্বার্থে ব্যবহার করে ফায়দা লোটা সহজতর পন্থায় পরিণত হয়েছে। এতে করে শিক্ষকদের মূল্য দিতে হচ্ছে ভালোমতো। পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মানসম্মান হারাতে হচ্ছে। শিক্ষকরা এখন ক্ষমতাপ্রত্যাশী, আর তা অর্জনে অদ্ভুতরকম হীনস্বার্থে দলীয় লেজুরবৃত্তি আর শিক্ষার্থীদের জঘন্যভাবে ব্যবহার বর্তমানে স্পষ্টত। এটা হুট করেই হয়েছে তা নয়। যখন যারা ক্ষমতায় গেছে, তারাও শিক্ষকদের ব্যবহার করেছে, আর শিক্ষকরাও আনন্দের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছেন। এতে করে শিক্ষকদের আসল মেরুদণ্ডটাই হারিয়ে গেছে। নিজেদের পড়া ও শিক্ষার্থীদের পড়ানো এসব মস্তিষ্ক থেকে বিলীন হয়ে গেছে। যদিও এ কথা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নিষ্ঠুর, নির্লজ্জ বাস্তব।
শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় নেই বললেই চলে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাধ্যবাধকতায় হয়তো পড়ালেখাটা এখনো কিছুটা আছে, কিন্তু সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্র তো এক নয়। শিক্ষার্থীদের পকেটে এখন ‘পাওয়ার’ কাজ করে। টাকা আর ক্ষমতার কাছাকাছি থাকে। শিক্ষকদের এখন তারা আর আগের সেই গুরুজনের মতো ভক্তি করে না। কারণ শিক্ষকরাই তাদের দ্বারা পরিচালিত হন। স্কুল-কলেজ তো দূরের কথা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চান্সেলরও যখন শিক্ষার্থীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হোন, তখন দেশ-জাতির মেরুদণ্ডটা কীসের ওপর আর নির্ভর করে! এসবই দুঃসহ বেদনা।
আগে পড়ালেখার একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল। এখন পড়া ব্যাপারটাই যেন থাকছে না। পুরো অনীহা এ বিষয়ে। কিন্তু তারা বড় হতে চায়, প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। বিষয়টা কেমন যেন গড়মিলে, এবড়োখেবড়ো। জোরে কিছু বলা যায় না। যদি তাদের আত্মসম্মানে লাগে, চাকরি করার সাধ মিটায়ে দেবে! এ সময়কালে বলাই যায়, একশ্রেণির শিক্ষক ছাত্র পোষেণ নিজের আধিপত্য বজায় ও বিস্তার ঘটাতে। ফলে সেসব ছাত্রের পড়ালেখার দরকার কী! তাদের পকেটে অনায়াসে টাকা ঢুকে যায়। রেজাল্ট ভালো হয়ে যায়। চেহারা চকচকে হয়ে যায়। আদর্শবান অসহায় শিক্ষকদের এসব দেখে নীরবে ক্ষতবিক্ষত হতে হয়। সেই ক্ষত দিন দিন আরও বাড়ছেই।
শিক্ষকদের ভেতর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এখন তলানিতে। ক্ষমতালিপ্সু-স্বার্থান্বেষী শিক্ষকরা দলের অনুগত দাস হয়ে, নিজেকে ‘পাওয়ারফুল’ ভেবে নিজেদের মধ্যে শ্রদ্ধা-সম্মানের ব্যাপারটিকে মূল্যহীন মনে করেন। দলাদলি, ভাগবাটোয়ারা লাভেই ব্যস্ত থাকেন। শিক্ষক যে হওয়া যায় না, হয়ে উঠতে হয়- ব্রত ও সাধনায়, সে জিনিসটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। ক্ষমতা, অর্থ এসবের দখলে ব্যস্ত একটা বৃহৎ শিক্ষকগোষ্ঠী। নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ, গবেষণা- এসব কথার কথায় পরিণত হচ্ছে। যে শিক্ষকরা নিজে সাধনা করছেন, নীতি নিয়ে চলছেন, শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন, তাদের কপালে অনেক দুঃখ এসে জমে বহুবিধ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে। অপমান-অপদস্ত হতে হয়। সুস্থধারায় যদি আমরা ফিরতে না পারি, আমরা যদি পড়ালেখায় না ফিরতে পারি, তাহলে আমাদের শিক্ষা ও মূল্যবোধ ভয়াবহ অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। শিক্ষক যে জাতি গঠনের নায়ক, তিনি নিজেই যদি মেরুদণ্ড বেচে দেন, অনুগত দাসে পরিণত হন, পেশিশক্তির প্রয়োগ করেন হীনস্বার্থে, কোমলমতি বাচ্চাদের অন্ধকারে অন্ধমোহের দিকে ঠেলে দেন- এর চেয়ে বড় দুঃসহ অবস্থা আর হতে পারে না।
পরিশেষে যে কথা বলা জরুরি, অর্থনৈতিক উন্নয়নে দ্রুত গতি অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক সমতা অর্জনের জন্য প্রাথমিক চালিকাশক্তি হিসেবে শিক্ষার গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের অবশ্যই শিক্ষা খাতকে ব্যাপক গুরুত্ব দিতে হবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকতে ব্যবসার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নে জোর দিতে হবে। নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, ঐতিহ্যকে ধারণ করে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি গভীর গুরুত্ব দিতে হবে, যা অর্থনীতির সঙ্গে তাৎপর্যপূণ মূল্য সংযোজন করে জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ এবং অবশ্যই শিক্ষকের মর্যাদা সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন।
লেখক: বহুমাত্রিক লেখক এবং ডিন, কলা ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, প্রাইম ইউনিভার্সিটি।