যেকোনো দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য নারী-পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ অপরিহার্য। শুধু পুরুষদের শ্রম ও মেধার ওপর ভর করে কোনো দেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারে না। বাংলাদেশেও নারীরা দিনে দিনে কর্মক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। আমাদের দেশে নারীর কর্মসংস্থান গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সেবা খাতে নারীর অংশগ্রহণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবুও কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা ও বৈষম্যের সমস্যা এখনো একটি গুরুতর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়লেও তা এখনো পুরুষদের তুলনায় কম। গ্রামীণ এলাকায় নারীরা কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে কাজ করলেও তাদের কাজ প্রায়ই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় না। শহরাঞ্চলে তৈরি পোশাকশিল্পে লাখ লাখ নারী শ্রমিক কাজ করছেন, যা তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের নারী শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ এখনো কৃষি ও গৃহভিত্তিক কাজে যুক্ত। কৃষি খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৭৪.১% আর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে এই হার ৯৬.৬%। তুলনামূলকভাবে শিল্প খাতে মাত্র ৮.৭% এবং সেবা খাতে ১৭.২% নারী কর্মরত। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের ডেটা অনুযায়ী, ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪৩.৭%, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৮১.১%। এই বৈষম্যমূলক পরিসংখ্যান প্রমাণ করে–যদিও কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রবেশ বাড়ছে কিন্তু তাদের জন্য কর্মপরিবেশ এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। বিশেষত গ্রামীণ ও কম শিক্ষিত নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাসম্পন্ন কর্মপরিবেশ গড়ে ওঠেনি।
কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা সংকট
নারীরা কর্মস্থলে শারীরিক, মানসিক ও যৌন হয়রানির ঝুঁকিতে থাকেন। কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া, অভিযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সামাজিক লজ্জা বা ভয়ের কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশ পায় না। অনেক নারী রাতের শিফটে কাজ করতে গিয়ে যাতায়াত নিয়ে সমস্যায় পড়েন। পরিবহন সুবিধার অভাব, রাস্তাঘাটে অপর্যাপ্ত আলো ও অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাদের বিপদের ঝুঁকি বাড়ায়। কর্মজীবী নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো সমাজের মানসিকতা। অনেক পরিবার এখনো নারীর চাকরি বা বাইরে কাজ করাকে নেতিবাচকভাবে দেখে। শহরের অনেক নারী অফিসে যাওয়ার পথে হেনস্তার শিকার হন। গার্মেন্টস, কলকারখানা কিংবা সেলস প্রমোশনাল কাজে নিযুক্ত নারীরা প্রায়ই সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্বারা মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। এ ছাড়া মাতৃত্বকালীন সুবিধা না দেওয়া, চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের হুমকি কিংবা ছুটি না দেওয়া–এসব অভিজ্ঞতা অনেক নারীর নিত্যদিনের সঙ্গী।
যৌন হয়রানি ও মানসিক চাপ
কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি নারীদের জন্য অন্যতম বড় সমস্যা। সহকর্মী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা গ্রাহকের দ্বারা অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য, আচরণ বা চাপ নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
মজুরি বৈষম্য ও পদোন্নতিতে বাধা
বেতনবৈষম্য একটি বড় সমস্যা। অনেক প্রতিষ্ঠানেই সমান দায়িত্ব পালন করেও নারীরা পুরুষদের চেয়ে কম বেতন পান। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা কম বেতন পান বা অনানুষ্ঠানিক চুক্তিতে কাজ করতে বাধ্য হন। নেতৃত্বের পদে নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। মাতৃত্বজনিত দায়িত্ব এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক মনোভাব তাদের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করে।
মাতৃত্ব ও কর্মজীবনের ভারসাম্য
মাতৃত্বকালীন ছুটি ও শিশুর যত্ন নেওয়ার সুবিধার অভাব নারীদের কর্মজীবন ধরে রাখতে বাধা দেয়। সন্তান জন্মের পর অনেক নারী চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সুবিধা এবং নমনীয় কর্মঘণ্টা না থাকায় কর্মজীবন ও পারিবারিক দায়িত্বের ভারসাম্য বজায় রাখা নারীর জীবন কঠিন হয়ে পড়ে।
আইনি কাঠামো ও নীতিমালা
বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা রয়েছে। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা, শ্রম আইন এবং নারী উন্নয়ন নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে বাস্তবায়নের ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাব বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ নারী শ্রমিকদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা বিধান করেছে। যেমন- মাতৃত্বকালীন ছুটি হিসেবে সন্তান জন্মের আগে ও পরে মোট ১৬ সপ্তাহের ছুটি এবং এই সময় পূর্ণ বেতন প্রাপ্তির অধিকার থাকা। নারীদের নির্দিষ্ট কিছু ভারী ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ করার বিধান থাকা। নারী শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, কটূক্তি বা অসম্মানজনক আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ অর্থাৎ নারী শ্রমিকদের সঙ্গে শালীন আচরণ বাধ্যতামূলক।
যেসব প্রতিষ্ঠানে ৪০ জন বা ততোধিক নারীশ্রমিক কাজ করেন; সেখানে শিশুদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন বাধ্যতামূলক। উচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক। সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে অর্থাৎ সমান কাজে নারী-পুরুষের মজুরিতে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। কিন্তু এত সব আইন থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই তা কার্যকর হয় না। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীরা এসব আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন। গৃহকর্মী, রাস্তার হকার, কৃষিশ্রমিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় জড়িত নারীরা নানাভাবে শোষণের শিকার হন কিন্তু প্রতিবাদ জানানোর মতো পরিস্থিতি তাদের থাকে না। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয় না। আবার অনেকেই জানেন না কোথায় অভিযোগ করতে হবে। আইনের ভাষা কঠিন ও প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় নারী শ্রমিকরা অনেক সময় ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এখানে যদি কর্মক্ষেত্রটা জেন্ডার সেন্সিটিভ না হয় তাহলে রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে খুব বেশি সফল হবে না। সে জন্য আমরা কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নিরাপদ এবং শোভন কর্মস্থল– এই আন্দোলনকে জোরদার করতে চাই। নিরাপদ করা মানে পরিবেশটা নারীর জন্য স্বাচ্ছন্দ্যজনক করা, পরিবেশটা যেন কর্মবান্ধব হয় সেই বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।’
কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ যেভাবে বাড়ছে, সেই হারে উচ্চ পদে নারীদের দেখা যায় না–এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে নারীর দক্ষতার অভাব আছে বলে আমরা মনে করি না, মানে এগুলো পলিসির ব্যাপার এবং তা চেঞ্জ করতে হবে। নারীকে তার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, ধর্মীয় অনুশাসন সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় পলিসির কারণে সেটা হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি যেটা এখন আমরা ফলো করছি সেখানে নারীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে কিন্তু কর্মক্ষেত্র নারীবান্ধব করার জন্য যে বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা দরকার সেই জায়গাটাতে এখনো পর্যন্ত কোনো দৃষ্টি নেই। এটা তো থাকতে হবে। কর্মসংস্থানের দায়িত্ব যারা নিচ্ছেন, যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আছেন তাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। নারী যেন তার যোগ্যতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে পারেন সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে নারীর অবদান অপরিসীম। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও বৈষম্য দূর করা শুধু নারীর অধিকার রক্ষার বিষয় নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিরাপদ, সমতাভিত্তিক ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব। নারীরা নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশে কাজ করতে পারলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।