চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৬ নম্বর রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীরা দীর্ঘ ৫৬ বছর দেশের কোনো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেননি। স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দিলেও তা খুবই নগণ্য। ১৯৬৯ সালে এ এলাকায় কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর একজন পীর নারীদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। তারপর থেকে এ ইউনিয়নের নারীরা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল ইসলাম সরকার এই ইউনিয়নের নারীরা যাতে ভোট দেন সে জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেন। তার উদ্যোগ সফল হয়েছে। প্রায় ৫ হাজার নারী ভোট দিয়েছেন। একজন জেলা প্রশাসকের অনন্য উদ্যোগে ৫৬ বছরের পশ্চাৎপদতা থেকে বেরিয়ে এসেছে রূপসার নারীরা। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে খবরের কাগজের মুখোমুখি হয়ে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন এ উদ্যোগের নেপথ্য কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চাঁদপুর প্রতিনিধি ফয়েজ আহমেদ।
খবরের কাগজ: ৫৬ বছর পর নারীদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার মূল প্রেরণা কী ছিল?
মো. নাজমুল ইসলাম: রূপসা দক্ষিণ ১৬ নম্বর ইউনিয়নের নারীরা বহু বছর ধরে ভোটকেন্দ্রে যাননি। ১৯৬৯ সালে এ এলাকায় কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। সে সময় ভারতের জৈনপুরের একজন পীর এখানে এসে মানুষের সুস্থতায় অবদান রেখেছিলেন। তখন ওই পীর নারীদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এ ছাড়া পুরুষদের প্রভাবসহ নানা সমস্যার কারণে সব মিলিয়ে নারীদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। সর্বশেষ স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দেখা গেছে, ৭০০ নারীর মধ্যে মাত্র ১৬ জন ভোট দিয়েছেন। এসব ঘটনা আমাকে ভাবিয়ে তোলে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই ইউনিয়নের নারীরা যাতে ভোট দেন, সে জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করি। একাধিকবার স্থানীয় ইমামসহ নারীদের নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করি। সে সব বৈঠকে নারীদের ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো হয়। পর্দা বজায় রেখে নারীদের ভোটদান সহজ করতে ইউনিয়নের আটটি ভোটকেন্দ্রে নারীদের জন্য ২০টি পৃথক বুথ স্থাপন করি। এসব বুথে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ভোট গ্রহণের সব পর্যায়ের দায়িত্বে ছিলেন নারী কর্মকর্তারা। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, আনসার ও ভিডিপির নারী সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে নারী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। আমি মনে করি, যদি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত এখানে থাকতেন, তিনি নিশ্চয়ই গর্বিত হতেন, কারণ আজ রূপসা দক্ষিণের নারীরা সেই নারী ক্ষমতায়নের বার্তা বাস্তবে পৌঁছে দিচ্ছেন।
খবরের কাগজ: এই প্রথা ভাঙতে কোনো সামাজিক বা প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?
মো. নাজমুল ইসলাম: গ্রামীণ এলাকায় প্রভাবশালী পুরুষদের প্রভাব ও ধর্মীয় ভীতি নারীদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে অনীহা তৈরি করত। বুথে পুরুষদের উপস্থিতি নারীদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করত। প্রশাসনিকভাবে, আমরা নিরাপদ ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছি। সিনিয়র সিটিজেন বা অসুস্থ নারীদের রিকশায় করে কেন্দ্রে আনা হয়েছিল। মোট কথা ভোটদানে নারীদের উৎসাহিত করতে যা করা প্রয়োজন সবই করেছি। সব মিলিয়ে এটি ছিল সামাজিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ অতিক্রমের প্রচেষ্টা।
খবরের কাগজ: আলাদা নারী বুথ ও নারী কর্মকর্তা নিয়োগের পেছনের কারণ কী?
মো. নাজমুল ইসলাম: নারীদের ভয়মুক্তভাবে ভোট দেওয়ার জন্য প্রতিটি কেন্দ্রেই বিশেষ নারী বুথ স্থাপন করা হয়। এসব বুথে কোনো পুরুষ ছিল না। ধর্মীয় ও সামাজিক ভীতি কমাতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা লক্ষ্য করেছি, ইসলাম, হিন্দু ও খ্রিষ্টান সব ধর্মের নারীরা এই উদ্যোগে উৎসাহিত হয়েছেন। এটি নারী ভোটারদের জন্য নিঃসন্দেহে নিরাপদ ও উৎসাহমূলক পরিবেশ তৈরির এক উদাহরণ।
খবরের কাগজ: ভোটের দিন নারীদের কেন্দ্রে উপস্থিতি দেখে আপনার ব্যক্তিগত অনুভূতি কী ছিল?
মো. নাজমুল ইসলাম: ভোটের দিন হাজার হাজার নারী ভোটকেন্দ্রে আসেন। যেখানে আগে ৭০০ ভোটারের মধ্যে মাত্র ১৬ জন নারী ভোট দিয়েছেন, সেখানে এবার ৫ হাজারের বেশি নারী ভোট দিয়েছেন। আমি মনে করি এটা ঐতিহাসিক সাফল্য এবং অনুপ্রেরণাদায়ী একটি ঘটনা। সংবাদকর্মীরা জানাচ্ছেন, তাদের সাংবাদিক জীবনের অভিজ্ঞতায় এমন দৃশ্য তারা আগে দেখেননি। নারীদের উৎসাহের সঙ্গে ভোট দিতে যাওয়ার দৃশ্য আমার মন ছুঁয়েছে।
খবরের কাগজ: এই উদ্যোগের মাধ্যমে নারী ক্ষমতায়নের জন্য ভবিষ্যতে কী বার্তা দিতে চান?
মো. নাজমুল ইসলাম: রূপসা দক্ষিণের ঘটনা দেখিয়েছে, নারীরা শুধু ভোট দিচ্ছেন না, বরং দায়িত্ব ও ক্ষমতার পরিচয়ও দিচ্ছেন। এটি অন্য এলাকার নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা। নারীর জন্য বিশেষভাবে পরিকল্পিত উদ্যোগ সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক নেতৃত্ব, প্রেরণা ও নিরাপদ পরিবেশ থাকলে নারীরা যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম। নারীরা আমাদের মেরুদণ্ড, তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নয়ন অসম্পূর্ণ। এটি নারী ক্ষমতায়নের বার্তা বহন করবে। যদি বেগম রোকেয়া এই দৃশ্য দেখতেন, তিনি নিশ্চয়ই উৎসাহিত হতেন, কারণ নারীর ক্ষমতায়নের অগ্রদূত হিসেবে তিনি এই বার্তার সফল বাস্তবায়ন দেখতে পেতেন।
খবরের কাগজ: জেলা প্রশাসক হিসেবে আপনি কি মনে করেন–এটি রূপসা ইউনিয়নের জন্য স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা?
মো. নাজমুল ইসলাম: অবশ্যই। নারীদের অংশগ্রহণে যে পরিবর্তন এসেছে, তা রূপসা ইউনিয়নের জন্য স্থায়ী। সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা অতিক্রম করে নারীরা সচেতন হয়েছেন। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে এবং ভবিষ্যতের ভোট সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রূপসা দক্ষিণের এই উদাহরণ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্য মডেল হতে পারে।
খবরের কাগজ: আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
মো. নাজমুল ইসলাম: এই উদ্যোগ নারী জাগরণের প্রতীক। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে এটি দেখাচ্ছে, নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। রূপসা দক্ষিণের উদাহরণ দেখিয়েছে, নারীরা নিজেদের অধিকার ও দায়িত্বের বিষয়ে সচেতন। এটি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা। ভবিষ্যতে এই উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়ন ও সমাজের উন্নয়নে অনন্য অবদান রাখবে।