১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনে বড় ভূমিকা রাখে বাঙালি মুসলমান, যদিও তাদের স্বপ্নভঙ্গ হতে দেরি হয়নি। বাংলা ভাষার আন্দোলন সেই স্বপ্নভঙ্গেরই প্রথম বিস্ফোরণ। এই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে সদ্য জন্ম নেওয়া পাকিস্তানের বাংলাভাষীরা তাদের হারানো জাতিসত্তা খুঁজে পায়। যে সাম্প্রদায়িকতার মোহ ব্রিটিশ-ভারত ভাঙে, পাকিস্তান সৃষ্টি করে, সেই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেই বাঙালি রুখে দাঁড়ায়। সেটি ছিল এক তাৎপর্যময় জাতীয় উন্মেষ, নবজাগরণ, যা বাঙালিকে আত্ম-অন্বেষণের পথ দেখায়।
বলাবাহুল্য, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিসত্তার যে স্ফুরণ, তা থেমে থাকেনি। ১৯ বছর ধরে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাঙালি গণমানুষ আত্মানুসন্ধান করেছে, পরিশুদ্ধ হয়েছে এবং তারই বাঁকে বাঁকে অগ্রসর হয়ে পৌঁছে গেছে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার যে, ব্রিটিশ ঔপনিবেসিক শাসনের বাতাবরণে এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চর্চায় বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের মনোজগতে জাতপরিচয়ের যে সংকট তৈরি হয়, বাংলা ভাষা আন্দোলন সেই সংকট ভাঙতে থাকে। পূর্ববঙ্গ বা নতুন পূর্বপাকিস্তানের বাংলাভাষীরা নতুন উপলব্ধিতে সমৃদ্ধ হয়। ভাষা ও সংস্কৃতির বাঁধন ধর্মের বাঁধনকে ছাপিয়ে দেয়। পাকিস্তানের মেকি ধর্মবাধন কিংবা বর্বর সামরিক আধিপত্য, কিছুই তাকে বাধতে পারে না। ধর্ম ও সামরিক আধিপত্য যত বাধতে চায়, তত তার মোহমুক্তি ঘটে। বেগবান হয় বাঙালির আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ।
গণমানুষের এই প্রগতিশীল রাজনৈতিক উত্তরণে মুখ্য ভূমিকা রাখেন বাঙালির অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জয় বাংলার স্লোগানে শক্তি খুঁজে মানুষ, তুঙ্গে ওঠে ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন। বেগবান হয় ছাত্র-জনতার আন্দোলন, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মওলানা ভাসানী। এরপর আসে উনসত্তরের গণবিস্ফোরণ, পতন ঘটে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের, আসেন নতুন জেনারেল ইয়াহিয়া খান, ঘটে ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন, যে নির্বাচনে ছয় দফার পক্ষে, আত্মমর্যাদার পক্ষে দাঁড়ায় বাঙালি। পরিশেষে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও ২৫ মার্চের পাকিস্তানি গণহত্যার পথ বেয়ে আসে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, যা বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।
মোটকথা, ছয় দফার আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালির যে পথপরিক্রমা তাতে শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন অবিসংবাদী নেতা–বঙ্গবন্ধু। ইতিহাসের সত্য হচ্ছে, এ সময় বাঙালি জনগোষ্ঠীর মনোজগতে মহাবিক্ষার যে বহ্নিশিখা প্রজ্বলিত হয়, তার মূল কারিগর ছিলেন শেখ মুজিব। তিনি বঞ্চিত, অবহেলিত জাতির বুকে বল দিয়েছেন, কণ্ঠে প্রতিবাদের ভাষা দিয়েছেন, জাতীয় মর্যাদা পুনরুদ্ধার, অধিকার ও আত্মপরিচয়ের সংকট দূর করেছেন। এমনকি প্রতিরোধের শক্তি জুগিয়েছেন এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষ বাঙালিকে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাঠে নামানোর কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।
মনে রাখা সংগত হবে যে, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহিদের রক্তে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তার মূল প্রতিপক্ষ ছিল ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীরা, যারা বেশির ভাগই ছিল পাকিস্তানপন্থি উগ্র ধর্মবাদী, ধর্মান্ধ এবং সাম্প্রদায়িক। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ নেতৃত্বের কাছে পাকিস্তান বাহিনীর পরাজয়ের পর এরা বছরের পর বছর আত্মগোপনে থেকেছে, কিন্তু কৌশলে তাদের ছিটমহলগুলো সক্রিয় রেখেছে। তারা বৈদেশিক সমর্থন লাভ করেছে এবং পুনর্জাগরিত এই বিষবৃক্ষগুলো জাতির শাশ্বত উদারতাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। অন্যদিকে বিজয়ী মুক্তিযুদ্ধপন্থিরা আত্মতুষ্টিতে বিভোর থেকেছে, বিভাজিত হয়েছে এবং তারা সামনের বিপদ অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ফলে গত ৫৪ বছরে স্বাধীনতার প্রতিপক্ষরা প্রায় সব অঙ্গনে বলশালী হয়েছে। ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতার স্থপতির হত্যাযজ্ঞে তারা প্রথম সফলতা লাভ করে; দ্বিতীয়ত, সামরিক শাসকদের ছত্রছায়ায় তারা নতুন জীবন লাভ করে এবং তৃতীয়ত, ২০২৪ সালের সরকার উৎখাতের সফল আন্দোলনে নিজেদের স্বমহিমায় প্রকাশ করে। কোনো সরকার স্বৈরাচারী হলে, নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস হলে, গণমানুষের মৌলিক অধিকার লুণ্ঠিত হলে সে সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ অনস্বীকার্য। কিন্তু ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনের দৃশ্য কারণ বা প্রেক্ষাপট যা-ই থাকুক না কেন, দেশি-বিদেশি পরিকল্পনা বা অর্থায়ন নিয়ে যতই বিতর্ক চলুক না কেন, এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রূপ পায়নি। ফলে ভয়ংকর নৈরাজ্য দেশকে গ্রাস করেছে, পরিকল্পিত ‘মব সন্ত্রাস’ উসকে দেওয়া হয়েছে। ফলে বর্বর আঘাত এসেছে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিজাগানিয়া স্মারকচিহ্নগুলোর ওপর। অস্বীকারের উপায় নেই, এসব অপকর্মে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থন ছিল ষোলো আনা, সংবিধান ছুঁয়ে ক্ষমতায় বসলেও তারা সংবিধানকে ছুড়ে ফেলেছে এবং আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বাঙালির সংস্কৃতিবিরোধী আন্দোলনে পরিণত করে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসকে সরাসরি আঘাত করেছে।
বিগত অর্ধ শতকে নানা পালাবদল ঘটেছে, সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বদলে অসুস্থ রাজনীতি এবং উগ্রপন্থার মহড়াও হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের মাটিতে তালিবানি বা উগ্র ধর্ম পন্থার বিপ্লব কি সফল হবে? সম্ভাব্য সব অর্থেই বলা যায়, না, এর সুযোগ নেই। কারণ বাঙালি মুসলমান একদিকে যেমন পাকিস্তান-আফগানিস্তানের জনগোষ্ঠী নয়, তেমনি ভারতের বিশেষ অঞ্চলের মুসলমানও নয়। তারা নিশ্চিতভাবেই প্রবল ধর্মপ্রাণ, কিন্তু তাদের আছে ভাষা-সংস্কৃতি- সাহিত্য-শিল্পকলার এমন এক গৌরবী শক্তি, যা তাদের স্বতন্ত্রতা দিয়েছে, আত্মরক্ষার বর্ম দিয়েছে। এর বাইরেও আছে বাঙালির সুবিশাল মুক্তিযুদ্ধ, যা যেকোনো অশুভ আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে সক্ষম। অতএব জেনে রাখা ভালো, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর গুঁড়িয়ে, শেখ মুজিবের প্রতিকৃতি ধ্বংস করে এবং মুক্তিবাহিনী ও ১৯৭১-কে আঘাত করে হয়তো প্রতিহিংসার সাময়িক লালন হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ ইতিহাস নিজের শক্তিতেই তার সত্যকে রক্ষা করার শক্তি ধারণ করে।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। নতুন নাগরিকরা সর্বক্ষেত্রে আজ সমাজ নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ বা জাতীয় স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে যে আদি সংকট–তার কি সুরাহা হয়েছে? না, হয়নি। কাজেই মূলে ফিরে যেতে হবে। সংকটের সমাধান খুঁজতে হবে।
১৯৯০-এর পর থেকে আশাজাগানিয়া গণতান্ত্রিক নবযাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু সে যাত্রাও মসৃণ হতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রশ্নে, অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার প্রশ্নে সংকট জিইয়ে রাখা হয়েছে। অস্বীকার করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে, মুক্তিযুদ্ধকে; আঘাত হানা হয়েছে বাঙালি সেকুলার সমাজশক্তির প্রতিটি স্তম্ভে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি এই বিরূপ মনোভাবে জাতি লাভবান হয়নি, বরং কণ্টকাকীর্ণ ও উত্তরোত্তর বিভাজিত হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক এই প্রক্রিয়ায় দেশের স্বাধীনতার চিহ্নিত প্রতিপক্ষরা শক্তি সঞ্চয় করেছে।
এটিও সবার জানা যে, শত প্রতিবন্ধকতার পরও ইতিহাসের অমোঘ সত্যগুলো বেরিয়ে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠীগুলো নিরন্তর বিষবাষ্প ছড়ালেও নতুন প্রজন্মের বৃহৎ অংশ মুক্তিযুদ্ধের অবিকৃত ইতিহাসের প্রতি আস্থাশীল হয়েছে। কারণ তারা ইতিহাসের বিকৃতি থেকে বেরিয়ে ন্যায় ও সত্যের পক্ষ নিতে চায়, স্বদেশকে এগিয়ে নিতে চায়। সে জন্য রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি গুণগত পরিবর্তন বাঞ্ছনীয়। পুরোনো ব্যর্থতা ও কলঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসা বাঞ্ছনীয়। আমার বিশ্বাস, পরিবর্তনের এ ধারাটি সূচনা করে রাজনীতিতে সমূহ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করা যেতে পারে, জাতীয় ঐক্যের পথে বড় বাধাটি দূর করা যেতে পারে।
আরেকটি কথা, রাজনীতিতে সরকারের বিরোধিতা অপরাধের কিছু নয়, বরং সেটিই গণতন্ত্র। কিন্তু অপরাধ হচ্ছে, একটি সরকারের বিরোধিতার নামে জাতির জনককে অবজ্ঞা করা এবং জাতির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও রক্তস্নাত ইতিহাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। আমি জানি না, আত্মঘাতী চেতনার ধারকরা তাদের অবস্থান পাল্টাবেন কি না। যদি পাল্টায় তাহলে শুভবুদ্ধির জয় হবে। কারণ জাতীয় ঐক্য বা জাতীয় সমঝোতার প্রধান শর্ত হচ্ছে–নিঃশর্ত এবং পরিপূর্ণ সততা ও আবেগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রহণ করা, একই সঙ্গে জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধকে বুকে ধারণ করা। পূর্ণ উপলব্ধিতে সবাইকে অনুধাবন করতে হবে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো দলের নন, তিনি ইতিহাসের মহানায়ক, বাংলাদেশের রাষ্ট্র পিতা। বঙ্গবন্ধুর যারা দলীয় অনুসারী, তাদেরও উচিত হবে জাতির জনককে গণ্ডিবদ্ধ না করা, তাকে সার্বজনীন করা। বাংলাদেশের অস্তিত্ব মানার প্রধানতম শর্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বমহিমায় গ্রহণ করা, মুক্তিযুদ্ধকে তার অবিকৃত ইতিহাসে বরণ করা। এর ব্যতিক্রম অপরিণামদর্শিতা। যতদিন না এ কাজটি করা সম্ভব হবে, ততদিন সংকট জিইয়ে থাকবে–সংকট দীর্ঘায়িত হবে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক