জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনগুলোতে প্রার্থী মনোনয়নে নানা বিষয় বিবেচনায় নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। দলের মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন, এমন কয়েকজনকে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য করা হতে পারে। আবার দলের মনোনয়ন পেয়েও জয় পাননি, এমন কয়েকজনকে নিয়েও আলোচনা রয়েছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা খবরের কাগজকে এমন তথ্য জানিয়েছেন।
দলের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা জানান, সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী বাছাইয়ে দলের জন্য অবদান, পরিবারের অবদান, পেশাসহ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া জেলাভিক্তিক কোটা বিবেচনায় কয়েকজনকে মনোনীত করবে আওয়ামী লীগ।
নির্বাচন কমিশনের একটি সূত্র জানায়, আগামী ফেব্রুয়ারিতে সংরক্ষিত আসনের ভোট হতে পারে। কয়েক দিনের মধ্যে এ ভোটের তফসিল ঘোষণা করার আলোচনা চলছে। ৩০০ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের নির্বাচন করবেন। নির্বাচনে জয়ী দলগুলো কতটি আসনে জয় পেয়েছে, সেই অনুপাতে সংরক্ষিত আসন বণ্টন করা হয়ে থাকে।
জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে। সে হিসাবে ৩০০ আসনের মধ্যে কোনো দল বা জোটের ছয়জন সংসদ সদস্য থাকলে তারা একটি সংরক্ষিত আসন পাবে। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে ২৯৯ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২২৩টি আসনে জয় পেয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ৬২ আসনে জয় পেয়েছেন। জাতীয় পার্টি ১১টি আসনে জয় পেয়েছে। একজন প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় একটি আসনে ভোট গ্রহণ স্থগিত আছে।
সংখ্যার অনুপাতে এবার আওয়ামী লীগ অন্তত ৩৭টি ও স্বতন্ত্ররা ১০টি সংরক্ষিত আসন পাবে। জাতীয় পার্টি দুটি আসন পেতে পারে। তবে স্বতন্ত্ররা আওয়ামী লীগে যোগ দিলে হিসাব পরিবর্তন হয়ে যাবে। তখন আওয়ামী লীগ ৪৮টি সংরক্ষিত আসন পাবে।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, স্বতন্ত্ররা সংসদে সরাসরি আওয়ামী লীগে যোগ না দিলেও তাদের প্রাপ্য ১০টি সংরক্ষিত আসনের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ মনোনীত নারীদের সংসদ সদস্য করা হবে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কয়েকজনের নাম স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছে দেওয়া হতে পারে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান কাজী জাফর উল্যা খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রার্থী বাছাইয়ে অনেক কিছু বিবেচনায় নেওয়া হবে। একজনকে বারবার সংসদ সদস্য করা হবে না। যারা আগে হতে পারেননি, যাদের বাবা-মা অনেক দিন ধরে দলের জন্য অবদান রেখেছেন, এমন অনেককে বিবেচনায় নেওয়া হবে। যারা জোটের প্রার্থীকে আসন ছেড়ে দিয়েছেন বা মনোনয়ন পেয়ে জিততে পারেননি, তাদেরও কাউকে কাউকে বিবেচনায় নেওয়া হবে।’
কাজী জাফর উল্যা বলেন, ‘স্বতন্ত্রদের আওয়ামী লীগে নেওয়া হবে কি না বা তারা আলাদা কোনো ভূমিকায় থাকবেন কি না, তার ওপর সংরক্ষিত আসন বণ্টন নির্ভর করবে। এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী। পরে তার আসনটি ১৪ দলের শরিক জাসদকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেয় আওয়ামী লীগ। ফলে ফরিদুন্নাহার লাইলীকে এবার সংরক্ষিত আসনের সদস্য করা হতে পারে।
এবার মনোনয়নবঞ্চিত হওয়া শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানকে সংসদে দেখা যেতে পারে। জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতারকে এবার ১৪ দলের প্রার্থী করেনি আওয়ামী লীগ। তাকেও এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য করার জোরালো আলোচনা রয়েছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের একাধিক নেতার নাম সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য সানজিদা খানম ও তারানা হালিমকে এবার সদস্য করা হতে পারে।
পরিবার বিবেচনায় একাধিক সংসদ সদস্য মনোনীত করা হতে পারে। নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস কয়েকবার নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তার কন্যা যুব মহিলা লীগের সাবেক সহসভাপতি কোহেলী কুদ্দুস মুক্তিকে এবার সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দেখা যেতে পারে। মুক্তি বর্তমানে নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য। তিনি নাটোর-৪ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
সংরক্ষিত আসনে আলোচনায় আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পুত্র শেখ কামালের স্ত্রী ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে শহিদ সুলতানা কামালের ভাতিজি নেহরিন মোস্তফা দিশি। দিশি বর্তমানে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য। তিনি ঢাকা-৬ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের শহিদ পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকে একাধিক সদস্যকে এবার সংসদে দেখা যেতে পারে। এদের মধ্যে জোরালো আলোচনায় আছেন লেখক শহীদুল্লা কায়সারের মেয়ে শমী কায়সার ও সুরকার আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ।
অভিনয় জগতের অনেকেই সংসদ সদস্য হওয়ার দৌড়ে আছেন। অভিনেত্রী তারিন জাহান, অরুণা বিশ্বাস, তানভীন সুইটি ও রোকেয়া প্রাচী, চিত্রনায়িকা নিপুণ ও মাহিয়া মাহি চেষ্টা করছেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হতে।
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর বর্তমান ও সাবেক গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে থেকেও একাধিক সংসদ সদস্য নির্বাচন করা হবে। মহিলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, যুব মহিলা লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা শ্রমিক লীগের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিবেচনায় আছেন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘মহিলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, যুব মহিলা লীগসহ আমাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর দক্ষ, সৎ, ত্যাগী নেতারা গুরুত্ব পাবেন। সমাজকর্মী বা এ রকম পেশায় যারা খ্যাতি অর্জন করেছেন, এ রকম নারীদেরও বিবেচনায় নেওয়া হবে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আগুন-সন্ত্রাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এমন কাউকে বা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যোগ্য কাউকে পাওয়া গেলে তাদেরও কথাও বিবেচনা করবে আওয়ামী লীগ।’
জাতীয় পার্টিতে সালমা ও শেরিফার নাম আলোচনায়
দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১১টি আসন পেয়েছে। ফলে তারা দুটি সংরক্ষিত আসন পাবে। এ আসন দুটিতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের স্ত্রী শেরিফা কাদের এবং জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান সালমা ইসলামকে সংসদ সদস্য করা হতে পারে। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় একাধিক সূত্র খবরের কাগজকে এমন তথ্য জানিয়েছে। এবারের নির্বাচনে সালমা ইসলাম ঢাকা-১ এবং শরিফা কাদের ঢাকা-১৮ আসন থেকে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন।