৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের তিন ছেলে এবং এক কন্যাসন্তান। চার সন্তানই উচ্চশিক্ষিত। কেবল তা-ই নয়, পেশায় উচ্চপদস্থ অবস্থানের পাশাপাশি সমাজের উঁচুস্তরে তাদের বসবাস। ছেলেদের একজন বুয়েটের অধ্যাপক, একজন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (যুগ্ম সচিব) এবং অন্যজন কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। একমাত্র মেয়ে স্কুলশিক্ষিকা। কিন্তু গর্ভধারিণী মা মরে ঘরে পড়ে রইলেন, দেখলেন না তার কোনো সন্তান। এমনকি মরদেহ পচে-গলে যখন পোকায় খাচ্ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে–তখনো হতভাগ্য মায়ের অবস্থা সম্পর্কে জানেন না সন্তানরা। অবশেষে দুর্গন্ধ পেয়ে স্থানীয়রা ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিলে পুলিশ গিয়ে নুরজাহান বেগমের গলিত মরদেহ উদ্ধার করে।
গত রবিবার দিনগত রাতে রাজধানীর পল্লবী থানার মিরপুর-১১ নম্বর এলাকার নিজ বাড়ির একটি ফ্ল্যাটের কক্ষ থেকে পুলিশ ওই বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশের ধারণা, আনুমানিক ৮ থেকে ১০ দিন আগে নুরজাহান বেগমের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনাটি জানাজানি হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ওই বৃদ্ধার প্রতি সন্তানদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও ধিক্কার জানাতে দেখা যায় অনেক সাধারণ মানুষকে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, নুরজাহান বেগমের তিন ছেলের মধ্যে একজন হলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম আশিকুর রহমান, আরেকজন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (যুগ্ম সচিব) ড. এ কে এম আনিসুর রহমান এবং অন্যজন কানাডাপ্রবাসী এ কে এম আতিকুর রহমান। একমাত্র মেয়ে ফাতিমা নাসরিন সুলতানা ঢাকার একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষিকা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একজন পদস্থ কর্মকর্তা গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু তার মৃত্যু যে ধরনের পরিবেশে হয়েছে এবং মরে যেভাবে কয়েক দিন ধরে পড়ে ছিলেন, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কেননা, স্থানীয়দের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পেরেছে, ওই বৃদ্ধার চার সন্তানই উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত অবস্থানে রয়েছেন। অথচ তাদের গর্ভধারিণী মায়ের এভাবে মৃত্যুর বিষয়টি কষ্টদায়ক।
এ প্রসঙ্গে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির গতকাল মঙ্গলবার খবরের কাগজকে বলেন, অনেক বছর আগেই স্বামী হারিয়েছেন বৃদ্ধা নুরজাহান বেগম। তিনি এবং তার মেয়ে ফাতিমা নাসরিন সুলতানা পল্লবীর ওই বাসায় থাকতেন। মেয়ে ফাতিমার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, তিনিও কিছুদিন আগে মারা গেছেন। মা-মেয়ে পাশাপাশি দুই কক্ষে থাকলেও মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি নাকি মেয়ে টের পাননি–পুলিশের কাছে এমনই মন্তব্য করেন ফাতিমা নাসরিন। তা ছাড়া নুরজাহান যে কক্ষে থাকতেন বা মরদেহ পড়ে ছিল, সেখানকার স্যাঁতসেঁতে ও পরিত্যক্ত আবর্জনার মতো পরিবেশ দেখে মেয়ে ফাতিমা নাসরিনকে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। মা মারা যাওয়ার পর প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ঘরে পচছিলেন, অথচ পাশের কক্ষে থেকেও তিনি কোনো গন্ধ পাননি কিংবা মায়ের খোঁজ নেননি, বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এমন পরিবেশে কীভাবে তাদের মা বসবাস করছিলেন বা মেয়েও সেখানে থাকলেন, সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ওই ফ্ল্যাটে কোনো পুরুষ মানুষ থাকতেন না। বৃদ্ধা মা ও মেয়ে একসঙ্গেই এই ফ্ল্যাটে আলাদা দুটি কক্ষে থাকতেন। বৃদ্ধার কক্ষটি ছিল অনেকটাই বসবাসের অযোগ্য। কক্ষজুড়ে ময়লা-আবর্জনা ও মেঝেতে শেওলা জন্মেছিল। বিছানার ওপরই পড়ে ছিল বৃদ্ধার মরদেহ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৃত বৃদ্ধার চার সন্তানই উচ্চপদস্থ ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলেও ছেলেরা মায়ের কোনো খোঁজখবর রাখতেন না। বৃদ্ধার মৃত্যুর খবর পেয়ে বুয়েটের শিক্ষক ছেলে একবার ঘটনাস্থলে এবং একবার থানায় গেলেও মোংলা বন্দরে কর্মরত যুগ্ম সচিব ছেলেটি গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত আসেননি। বৃদ্ধার সন্তানদের নিজেদের মধ্যেও ভালো সম্পর্ক ছিল না বলেও জানা যায়।
গতকাল বৃদ্ধার সন্তানদের বিস্তারিত পরিচয় জানার পর দুই ছেলে আশিকুর রহমান এবং আনিসুর রহমানের সঙ্গে তাদের মুঠোফোন নম্বরে কল দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বারবার কল করা হলেও তারা ফোন ধরেননি। অন্যদিকে গতকাল পল্লবীর ওই বাসায় গিয়ে নুরজাহানের মেয়ে ফাতিমা নাসরিনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি কারোর সঙ্গেই কথা বলতে রাজি হননি। এমনকি বাসার ভেতরেও কাউকে প্রবেশ করতে দেননি।