যেন টাকার খনি বিআরটিসি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বাস ডিপোগুলো হয়ে উঠেছে লুটপাটের স্বর্গরাজ্য। ডিপো বা ইউনিটপ্রধান, ব্যবস্থাপক, হিসাবরক্ষক, চালক-কর্মচারী মিলে রাজস্ব আত্মসাৎ করে বিআরটিসিকে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে অবনমন ঘটিয়েছেন। ২০২২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত তিন বছরে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতেই ১৫ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব লুটপাটের প্রমাণ মিলেছে বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ তদন্তে।
- চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে ৩ বছরে ১৫ কোটি টাকার বেশি অনিয়মের অভিযোগ
- ভুয়া বিল, ট্রিপ চুরি ও জ্বালানি বিক্রির মাধ্যমে বিভিন্ন ডিপোতে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে
- এসব অভিযোগ তদন্ত করছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ
একই সঙ্গে রাজধানীর গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া এলাকায় বেসরকারি বাসমালিকদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার বিশেষ শাটল বাসে ‘ডিজিটাল পস মেশিন’ জালিয়াতি করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার সরকারি রাজস্ব চুরির অভিযোগও পাওয়া গেছে এই ‘ম্যানেজার-চালক’ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এসব অনিয়ম নিয়ে ইতোমধ্যে তদন্তে নেমেছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।
চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে ১৫ কোটির টাকার বেশি লুটপাট
২০২২ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১৫ কোটি ৫৮ লাখ ২২ হাজার ২৬২ টাকার আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে এই ডিপোতে। প্রাতিষ্ঠানিক রাজস্ব আদায়, ব্যাংকে জমা, অগ্রিম প্রদান, ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি এবং অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো থেকে আত্মসাৎ ও লুটপাট করা হয়েছে। এই দুর্নীতির তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি খবরের কাগজের কাছে আছে।
এই দুর্নীতির সঙ্গে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর বর্তমান ও সাবেক তিনজন ডিপোপ্রধানসহ বিআরটিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে তদন্ত প্রতিবেদনে। অভিযুক্ত কর্মকর্তারা হলেন চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর সাবেক ম্যানেজার মো. মোশাররফ হোসেন সিদ্দিকী (বর্তমানে ঢাকা ট্রাক ডিপোর ম্যানেজার); চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর সাবেক ম্যানেজার মো. মফিজ উদ্দিন (বর্তমানে জোয়ারসাহারা বাস ডিপো ও ট্রেনিং সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত) এবং চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর বর্তমান ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কর্মকর্তারা গত ১৫ বছরে বিভিন্ন মন্ত্রীর মাধ্যমে সুপারিশ করিয়ে বিআরটিসির বিভিন্ন ডিপোতে নিয়োগ নিয়েছেন। সেখান থেকে তারা কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সরকার পরিবর্তনের পরও ‘রহস্যজনক’ কারণে তাদের কোনো পদের পরিবর্তন বা শাস্তি হয়নি।
চট্টগ্রামে বিআরটিসির ট্রাক ডিপোর এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত জ্বালানি তেল ও ফেরি বিল, গ্যারেজশ্রমিকের মজুরি, মাইলেজ বিল, দৈনিক ভাতা, ট্রিপ কম-বেশি দেখানো এবং টিএ/ডিএ বিলের নামে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে প্রায় ৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা নগদ উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে আনুমানিক ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেই প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোর জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী দুই ইউনিটপ্রধানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের একজনকে ‘আওয়ামী প্রীতির’ কারণে এবং অন্যজনকে জোয়ারসাহারা ডিপোতে কোটি টাকা লোকসান সত্ত্বেও ‘বিশেষ আনুকূল্যে’ চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ অনিয়ম তদন্তে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিআরটিসির পরিচালক (প্রশাসন) রাহেনুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রামের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন রাজধানীতে প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন সেই প্রতিবেদন অধিকতর মনোযোগের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বেপরোয়া তিন ডিপো ম্যানেজার
কোনো কেনাকাটা না করেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে খুলনা ডিপোর ম্যানেজার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে। এই ডিপোর একাধিক কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুলনা ডিপোর বাসগুলো কার্যত অচল। সেগুলোকে অসৎ উদ্দেশ্য থেকে সচল দেখানোর জন্য তিনি নতুন যন্ত্রাংশ না কিনে সচল ও আংশিক অচল গাড়ির যন্ত্রাংশ খুলে অন্য গাড়িতে সংযোজন করে ড্রাইভারদের দিয়ে জোর করে বাস চালাচ্ছেন। মোশাররফ হোসেন এভাবে বাসগুলোর কার্যক্রম সচল রাখার নামে মেরামত খাতে প্রতিনিয়ত ব্যয় দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিআরটিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোশাররফ হোসেন একসময় মতিঝিল ডিপোর দায়িত্বে ছিলেন। তখন মতিঝিল ডিপোর কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার কথা বলে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই টাকা বেতন খাতে খরচ না করে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়। এ ছাড়া শুধু সাধারণ খাত থেকে আরও প্রায় দেড় কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ দেখানো হয়েছে।
বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ এক তদন্ত প্রতিবেদনে মোশাররফ হোসেনের এই আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ মিলেছিল। কিন্তু সাবেক চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সমালোচনার মুখে তাকে সরিয়ে খুলনা ডিপোতে ম্যানেজার হিসেবে বদলি করা হয়। বিআরটিসির খুলনা ডিপোর একাধিক কর্মচারী জানিয়েছেন, মোশাররফ হোসেন এখন ঢাকা বা চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপোতে বদলি হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে মোশাররফ হোসেনকে একাধিকবার ফোন করা হয়। তাকে বার্তাও পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
বিআরটিসির সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট ডিপোতে প্রতিদিন নিয়ম করে ট্রিপ চুরি এবং গাড়ি সচল রাখার নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা লোপাট করা হচ্ছে। এ ছাড়া বাসের জন্য বরাদ্দ তেল, মবিল, গ্রিজসহ বিপুল পরিমাণ জ্বালানি খোলা বাজারে বিক্রি করে দেওয়ার সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিআরটিসি চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেও কোনো প্রতিকার মিলছে না বলে অভিযোগ তুলেছেন ডিপোর সাধারণ চালক ও কর্মচারীরা। উল্টো দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় সৎ কর্মকর্তা ও চালকদের হয়রানিমূলক বদলি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সিলেট ডিপোর সাধারণ কর্মচারীদের অভিযোগ, রাজস্ব বাড়িয়ে লাভজনকভাবে গাড়ি পরিচালনা করতে চাইলে সেখানে বাধা দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রকৃত পিএলও (পরিকল্পনা) শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে কাজ করতে না দিয়ে আড়ালে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ভুয়া ও জালিয়াতিপূর্ণ ভাউচারে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোয় হিসাব শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বদলি করে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে রাজস্ব বাড়িয়ে লাভজনক রুটে গাড়ি চালানোর আবেদন করায় কয়েকজন চালককে শাস্তিস্বরূপ দূরবর্তী বিভিন্ন ডিপোতে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিআরটিসির সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহ ডিপোর দায়িত্বে থাকা নবম গ্রেডের কর্মকর্তা এনামুল হক কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দুটি সরকারি গাড়ি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। এর মধ্যে ‘০০০১’ নম্বরসংবলিত একটি জিপ গাড়ি তিনি নিজে ব্যবহার করেন, যার চালক হিসেবে রয়েছেন নজরুল। ‘৭৯৪৪’ নম্বরের একটি ব্লুবার্ড গাড়ি সার্বক্ষণিকভাবে পারিবারিক কাজে ব্যবহার করেন, যার চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রফিকুল। নবম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার এই ধরনের বিলাসী ও নিয়মবহির্ভূত গাড়ি ব্যবহার নিয়ে সংস্থার ভেতরে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এনামুল হকের বিরুদ্ধে টুঙ্গিপাড়ায় এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করার অভিযোগে ফৌজদারি অপরাধের মামলা রয়েছে। এমন গুরুতর মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও তাকে গোপালগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিপোর দায়িত্বে পদায়ন করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে এই কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। অনিয়মের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তারা প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগের জন্য বলেন।
কোথা থেকে পান এসব তথ্য, প্রশ্ন পরিচালকের
বিআরটিসির এসব অনিয়ম নিয়ে জানতে চাইলে পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন) মো. রাহেনুল ইসলাম রেগে যান। তিনি এ প্রতিবেদককে উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কোথা থেকে পান এসব তথ্য! এগুলো মিথ্যা।’
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা সব প্রশ্ন শুনে তার কার্যালয়ে যেতে বলেন। পরে প্রতিবেদক সেই সাক্ষাৎকারের সময়সূচির আবেদন জানিয়ে বার্তা পাঠালে তিনি কোনো সাড়া দেননি।
অভিযানের খবর পেলে নথি সরিয়ে ফেলা হয়
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সভায় বিআরটিসির একাধিক দুর্নীতির প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) ড. জিন্নাত রেহানা নিজেও বেশ কয়েকটি দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করেছেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে কিছু দুর্নীতির প্রমাণও পান তিনি। জিন্নাত রেহানা জানান, অনিয়মের তথ্য জেনে যাওয়ার পর হিসাব-নিকাশের প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরিয়ে ফেলেন ডিপোর কর্মকর্তারা। তখন উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের অভাবে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।
তবে এবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ নড়েচড়ে বসেছে। বিআরটিসির দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে আরও তদন্ত হবে বলে জানান জিন্নাত রেহানা।