বৃহস্পতিবার থেকে আবার শুরু হচ্ছে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। গত সোমবার তিন বিচারক নিয়োগের মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। বিচারকরা কাল থেকেই বিচারকাজ শুরু করবেন। শুরুর দিনে পুরোনো মামলা শুনানির জন্য কার্যতালিকায় থাকতে পারে। তবে জুলাই-আগস্টে গণহত্যার অভিযোগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাইতে পারে রাষ্ট্রপক্ষ। ট্রাইব্যুনাল এই আবেদন মঞ্জুর করলে পরোয়ানা তামিল বা গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হতে পারে।
মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সঙ্গে বৈঠক করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, ১৭ অক্টোবর থেকে ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ শুরু হবে। জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গণহত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর বিচার এই ট্রাইব্যুনালেই হবে। বুধবার (আজ) ট্রাইব্যুনালের এজলাস কক্ষে বিচারপতিদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে। পরদিন বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন বিচারপতির বেঞ্চ এজলাসে বসবেন। মূলত সেদিন থেকেই বিচারকাজ শুরু হবে। শুরুর দিন প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কয়েকটি আবেদন করা হবে।
এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ভবন মেরামত ও সংস্কারকাজের অগ্রগতি পরিদর্শন শেষে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট রেজিম আমাদের ছাত্র-তরুণ-জনতার ওপর নির্মমভাবে গুলি চালিয়েছিল। এই গণ-অভ্যুত্থানে কমপক্ষে দেড় হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। দিন দিন মৃত্যুর নতুন সংখ্যা পাচ্ছি। এ ছাড়া হাজার হাজার মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। অনেকের অঙ্গহানি হয়েছে, চিরদিনের জন্য বিকলাঙ্গ হয়েছেন। সরকার এই বিচার করতে বদ্ধপরিকর। এই বিচার করতে বাংলাদেশের মানুষের কাছে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই বিচারকাজ আগামী ১ নভেম্বরের মধ্যে শুরু করার কথা রয়েছে।
আসিফ নজরুল আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ কেন, এই উপমহাদেশের ইতিহাসে শান্তিকালীন সময়ে এতবড় গণহত্যার নজির কোথাও নেই। এমনকি পৃথিবীতেও এটা খুবই বিরল বলা চলে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অবশ্যই সুবিচার হবে। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, চুলচেরা বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ নেবেন। তাই আমরা এটুকু বলতে পারি, এখানে সুবিচার হবে।’
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, পেন্ডিং ৩০টি মামলার মধ্যে কয়েকটি বৃহস্পতিবার (কাল) কার্যতালিকায় থাকতে পারে। শুনানির জন্য প্রসিকিউশন প্রস্তুত। ডিফেন্স ল’ইয়ার (আসামি পক্ষের আইনজীবী) উপস্থিত থাকলে শুনানি হতে পারে। তবে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে এ পর্যন্ত দাখিল হওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানাবে রাষ্ট্রপক্ষ। ট্রাইব্যুনাল আবেদন মঞ্জুর করলে কাল থেকেই পরোয়ানা তামিলে মাঠে নামবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সে ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার অভিযানও শুরু হতে পারে।
নিয়োগ পাওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার প্রথম কর্মদিবসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার। এ সময় ট্রাইব্যুনালের দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী উপস্থিত হন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারা ট্রাইব্যুনালে আসেন। এ সময় ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার ও অন্য কর্মকর্তারা তাদের অভ্যর্থনা জানান।
সোমবার রাতে হাইকোর্টের বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান করে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। আইন সচিব শেখ আবু তাহেরের সই করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ (১৯৭৩ সালের আইন নং ২১)-এর ধারা ৬-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হলো। এ ছাড়া হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীকে ওই ট্রাইব্যুনালের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো।
১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে সংঘটিত গণহত্যার বিচারের জন্য দ্রুততম সময়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করে অন্তবর্তী সরকার। গত ১৪ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত শেখ হাসিনাসহ সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে অন্তত ৫৩টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে একটি অভিযোগে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধী সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগেরও শাস্তি চাওয়া হয়েছে।
গত দুই মাসে ট্রাইবুনালের তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠন, প্রসিকিউশন টিম পুনর্গঠন এবং সবশেষ সোমবার ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল ভবন মেরামত ও সংস্কার করা হয়।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালের ২৫ মার্চ। সে সময় মামলার তদন্ত ও বিচারকাজে ব্যাপক তৎপরতা দেখা যায়। এ নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনাও তৈরি হয়। বিচারকাজ ত্বরান্বিত করতে ২০১২ সালের ২২ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-২ নামে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দুটিকে একীভূত করে আবার একটি ট্রাইব্যুনাল করা হয়। এ সময়ের মধ্যে অনেক আলোচিত মামলার রায় ও রায় কার্যকর করা হয়। গত ১৪ বছরে ৫৫টি মামলার রায় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। এসব মামলায় ১৪৯ জনকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ৬ জনের। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা ৫ জন এবং একজন বিএনপির নেতা। ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজে স্থবিরতা তৈরি হয় গত বছরেই। সবশেষ চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি শেরপুরের নকলার তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। সেই সময়ে ট্রাইব্যুনালে ৩০টি মামলার বিচার চলছিল। এরপর আর কোনো মামলার বিচারকাজ পরিচালনা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার পরিবর্তনের আগে ও পরে ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারকের মধ্যে একজন অবসরে যান। আরেকজনকে হাইকোর্টে ফিরিয়ে আনা এবং সর্বশেষ ২৭ আগস্ট বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ-পিআরএল ভোগরত) এ এইচ এম হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া অব্যাহতি নিলে বিচারকাজ বন্ধ হয়।