দায়মুক্তির অবৈধ সুযোগে কুইক রেন্টালের নামে রাষ্ট্রের ৫ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা লুট করেছে ওরিয়ন গ্রুপ। শুধু তাই নয়, এই খাতে দেশের বেশ কয়েকটি কোম্পানি একইভাবে রাষ্ট্রের অন্তত ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। সরকারি পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এদিকে কুইক রেন্টালের অবৈধ সুযোগের আইনগত বিধান নিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছরে ব্যাপক সমালোচনার পর এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুইক রেন্টালসংক্রান্ত আইনে দায়মুক্তির বিধান অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট।
বৃহস্পতিবার (১৪ নভেম্বর) হাইকোর্টের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে হাইকোর্ট বলেন, ‘কুইক রেন্টালসংক্রান্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০-এর ৯ ধারায় দায়মুক্তির বিধান অবৈধ এবং অসাংবিধানিক। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক এই রিট দায়ের করেন। শুনানিতে রিটের পক্ষে তিনিই বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তার সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার সিনথিয়া ফরিদ।
কুইক রেন্টালের অবৈধ সুবিধার কারণে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে প্রতিবছর রাষ্ট্রের বিপুল অঙ্কের লুটপাটের চিত্র ফুটে উঠেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পরিসংখ্যানে। ৩ বছরের চুক্তির মেয়াদ নবায়নের সময় সরকারের উচ্চপর্যায়ের যোগসাজশে ইচ্ছাকৃত দীর্ঘদিন বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ রেখে অবৈধভাবে ক্যাপাসিটি চার্জ আদায় করা হয়েছে। এ জন্য আইনগতভাবে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন, অভিযোগ দায়ের এমনকি কোথাও মামলা করার সুযোগ রাখা হয়নি।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, ‘এ ধরনের আইন সংবিধানের অধীনে হতে পারে না। আদালতে যেতে পারবে না- এমন দায়মুক্তির আইন করা যাবে না। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরে সরকারি যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, বিদ্যুতের চাহিদা মিটিয়ে সেগুলো যাতে পুনরায় উৎপাদনে যেতে পারে, সে বিষয়ে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে যে চুক্তিগুলো হয়েছে, সরকার সেগুলো পুনর্মূল্যায়ন করবে। যাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, তাদের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে পারবে এবং প্রয়োজনে চুক্তির শর্তও বদলাতে পারবে।’
রায়ের পর ড. শাহদীন মালিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা জানি, আইন অনুযায়ী সরকারের ক্রয়-বিক্রয় একটি পাবলিক টেন্ডারের মাধ্যমে হয়। এখানে টেন্ডার ছাড়াই মন্ত্রীকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তৎকালীন সরকার তাতে সম্মতিও জানিয়েছে। মন্ত্রী কোনো দরপত্র ছাড়াই একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি করেছেন। মন্ত্রী এককভাবে নিজের বিবেচনায় যে কারও সঙ্গেই চুক্তি করতে পারেন, কুইক রেন্টাল আইনে সেই সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের ৬(২) উপধারায় বেশ কিছু বিদ্যুৎ প্রকল্প হয়েছে জানিয়ে শাহদীন মালিক বলেন, ‘কুইক রেন্টাল প্রজেক্টের বিশেষত্ব হলো, তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ করুক বা না করুক, পুরো টাকা পাবে। অর্থাৎ ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে সে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে কিন্তু ১০০ মেগাওয়াটের টাকাই পাবে। এটা লুটপাটের বিশেষ আইন হয়েছে। এই আইনের ৬(২) উপধারায় এক ব্যক্তিকে অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এটা কোনো প্রজাতন্ত্রে হতে পারে না। মূলত ৬(২) ধারার অধীনে বা পুরো আইনের অধীনে যে চুক্তি করা হয়েছে, সেসব চুক্তির ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না, চ্যালেঞ্জ করা যাবে না বা আদালতে মামলা করা যাবে না। অর্থাৎ আদালতের এখতিয়ারকে এ আইন বহিষ্কার করেছিল। এটা তো হতে পারে না। একজনের সঙ্গে ৫০ কোটি টাকার একটি চুক্তি করা হলো। আরেকজনের সঙ্গে ১০০ কোটি টাকার আরেকটি চুক্তি করা হলো। আর তাদের বলা হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদন করেন বা না করেন, বিদ্যুতের সব পয়সা দেব। এটা তো লুটপাটের চরম ব্যবস্থা। এই আইনের মাধ্যমে লুটপাটকে আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনটি পাস হয় ২০১০ সালের ১২ অক্টোবর। এ আইনের আওতায় নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না, সে বিধানও রাখা হয়। ফলে আইনটি সে সময় ‘দায়মুক্তি’ আইন হিসেবেও পরিচিতি পায়।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৮ আগস্ট আইনটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে। এরপর এ আইনের বিতর্কিত ৬(২) উপধারা ও ৯ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত ২৭ আগস্ট হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক। রিটে ওই দুটি ধারাকে সংবিধানের ৭, ২১, ২৬, ২৭, ৩১, ৪২, ৪৪, ৪৬, ১৪৩ ও ১৪৫ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করা হয়। ২ সেপ্টেম্বর রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ওই ধারা দুটি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। রুলের শুনানি শেষে ধারা দুটি অবৈধ ঘোষণা করা হয়।
আইনের বিতর্কিত অংশ: বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের পরিকল্পনা বা প্রস্তাবের প্রচার অংশে ৬(২) উপধারায় বলা হয়, ‘যা কিছুই থাকুক না কেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রীর সম্মতি নিয়ে যেকোনো ক্রয়, বিনিয়োগ পরিকল্পনা বা প্রস্তাব ধারা ৫-এ বর্ণিত প্রক্রিয়াকরণ কমিটি সীমিতসংখ্যক বা একক কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ ও দর-কষাকষির মাধ্যমে ওই কাজের জন্য মনোনীত করে ধারা ৭-এ বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণে অর্থনৈতিক বিষয় বা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানোর পদক্ষেপ নেবে।’
৯ ধারায় আদালতের এখতিয়ার রহিতকরণ অংশে বলা হয়, ‘এই আইনের অধীনে কৃত বা কৃত বলে বিবেচিত কোনো কাজ, গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোনো আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে আদালতের কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।’
পিডিবির হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯-১০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ১৫ বছরে পিডিবিকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৭৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এরই মধ্যে ওরিয়ন গ্রুপসহ দেশের ২৩টি কোম্পানি হাতিয়ে নিয়েছে ৯৫ হাজার ৫৬১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে ওরিয়ন গ্রুপের বিদ্যুৎ উৎপাদনসংক্রান্ত ৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫টি প্রতিষ্ঠান শুধু ক্যাপাসিটি চার্জের নামে রাষ্ট্রের কাছ থেকে ৫ হাজার ৩৭৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ওরিয়ন পাওয়ার মেঘনাঘাট লিমিটেড, ডাচ্-বাংলা পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড, ডিজিটাল পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড, ওরিয়ন পাওয়ার ঢাকা লিমিটেড এবং ওরিয়ন পাওয়ার সোনারগাঁও লিমিটেড। অপর দুটির মধ্যে একটি সৌরবিদ্যুতের, যার জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ নেই। আরেকটি হলো- ওরিয়ন পাওয়ার ঢাকা ইউনিট-২। বর্তমানে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।
ক্যাপাসিটি চার্জ আদায়ে শীর্ষে রয়েছে সামিট গ্রুপ। গ্রুপটি ক্যাপাসিটি চার্জ আদায় করেছে ১৪ হাজার ৮৫৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা। গত ১৫ বছরে বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জকে একটি ‘লুটেরা মডেল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে সক্ষমতা তৈরি করেছে, তা ২০৩০ সালেও প্রয়োজন হবে না। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৯ হাজার ৭২৭ মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অথচ ব্যবহার না করেই উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, আগামী ছয় বছরে চাহিদা দাঁড়াতে পারে ১৯ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। ২৫ শতাংশ রিজার্ভ ধরলে তখন ২৩ হাজার ২৫২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সক্ষমতা হলেই চলার কথা। এদিকে সক্ষমতা বাড়লেও দেশে লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিবছর গরমের সময় গড়ে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। চাহিদার তুলনায় এখন দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। কিন্তু এ সক্ষমতাই অর্থনীতির মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত সরকার চুক্তি করেছে, বিদ্যুৎ কিনলে বা না কিনলেও মাস শেষে টাকা দিতে হবে। উৎপাদন বন্ধ থাকার পরও দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দিতে হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা। এই হাজার হাজার কোটি টাকা যাচ্ছে রাষ্ট্রের তহবিল থেকে। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে এখনো চলছে লুটপাটের মহোৎসব।