রাজধানীতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ফের বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পেই ভরসা করছে। বাসমালিকদের চূড়ান্ত অসহযোগিতা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নানা গড়িমসি আর রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক দুর্বৃত্তায়নে যে প্রকল্প পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে পড়েছে, সেই প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নেই এখন ঢাকার যানজট নিরসনের পথ খুঁজছে সরকার।
বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালনা পদ্ধতি প্রবর্তন এবং এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়রকে আহ্বায়ক করে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ১০ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এ কমিটির কাজ ছিল, ঢাকার সব পরিবহন-মালিকদের সমন্বয়ে একটি কোম্পানি গঠন ও ঢাকার রুটগুলোতে শুধু নির্দিষ্ট রঙের বাস পরিচালনা করা।
ঢাকার ৪২টি রুটকে বিভিন্ন রঙের গুচ্ছ বা ক্লাস্টারে বিভক্ত করে এই বাসগুলো পরিচালনা করার পরিকল্পনা ছিল। এতে গ্রিন ক্লাস্টারের তিনটি রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা নগর পরিবহনের বাস পরিচালনা করা হলেও নানা অসংগতিতে সেই উদ্যোগ থমকে যায়।
থমকে যাওয়ার বড় কারণ
নির্দিষ্ট রুটে ঢাকা নগর পরিবহনের বাস নামানোর পরও বেসরকারি বহু কোম্পানির বাস পরিচালনার সুযোগ উন্মুক্ত রাখা ছিল। সেসব বাসের শ্রমিকরা ঢাকা নগর পরিবহনের চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কাঙ্ক্ষিত যাত্রী না পেয়ে লোকসান করতে থাকে এই সেবা। বিআরটিসির কিছু দ্বিতল বাস এখন ঢাকা নগর পরিবহনের ব্যানারে চললেও সেগুলোও এখন লোকাল সার্ভিসের মতোই চলছে। অনেক দিন কাউন্টার ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলেও এখন চলছে ভাড়ায়। ঢাকার ঘাটারচর থেকে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর বা ঘাটারচর থেকে পোস্তগোলা রুটে চলাচলকারী এসব বাসের ফিটনেস নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন যাত্রীরা।
চালক ও শ্রমিকদের অভিযোগ, ঢাকা নগর পরিবহনের পক্ষ থেকে তাদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। রেষারেষি করে যাত্রী তোলার নিয়ম না থাকায় বাস থাকে ফাঁকা। এতে তাদের আয়-রোজগার কমছে।
বাসমালিকরাও দীর্ঘদিন লোকসান দিয়ে ঢাকা নগর পরিবহনের বাসগুলো পরিচালনা করতে নারাজ।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভেস্তে যাওয়া প্রকল্পটির পুনর্জাগরণ ঘটাতে চাইছে ডিটিসিএ। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই কাজ আরও জোরেশোরে শুরু হয়েছে।
কী থাকছে নতুন পরিকল্পনায়
বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্প পরিচালক ধ্রুব আলম বলেন, ঢাকার ৩৮৮টি রুটকে সমন্বয় করে প্রাথমিকভাবে ৪২টি রুটে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। রেশনালাইজেশন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে ৯টি ক্লাস্টার (৯টি ভিন্ন ভিন্ন রঙের), ২২টি কোম্পানিতে রূপান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গোলাপি রঙের গুচ্ছে চারটি, নীল গুচ্ছে চারটি, লাল গুচ্ছে পাঁচটি, কমলা গুচ্ছে ছয়টি, সবুজ গুচ্ছে আটটি, বেগুনি গুচ্ছে ছয়টি, নর্থ গুচ্ছে তিনটি, নর্থ ওয়েস্ট গ্রুপে তিনটি, সাউথ গুচ্ছে দুটি রুট পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে নতুন করে। এ পর্যন্ত ৮০টির বেশি কোম্পানি থেকে বিভিন্ন রুটে বাস পরিচালনার আবেদন পাওয়া গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিএসসিসি প্রশাসকের সভাপতিত্বে বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিবহন-মালিকদের আবেদনপত্র যাচাই-বাছাইয়ের জন্য এখন কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে।
কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির নামে বাস রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। ব্যক্তির নামে বাসের রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিট দেওয়া হবে না। দুটি কোম্পানি এক রুটে চালাতে চাইলে যৌথ উদ্যোগে আসতে হবে। নগরে বাস রুট পুনর্বিন্যাসের পর রাজধানীর ভেতরে কাউন্টার ও টিকিট ব্যতীত কোনো বাস চলবে না।
টিকিটের পরিবর্তে ধীরে ধীরে র্যাপিড পাস ব্যবহারের সুযোগ রাখা হবে। পুনর্বিন্যস্ত রুটে বাসে অটো ডোর (নিউম্যাটিক ডোর) লাগানো হবে ধাপে ধাপে। আসনবিন্যাস পরিবর্তন করা হবে প্রতিটি বাসে। প্রতিটি বাসে ড্যাশক্যাম থাকবে, স্টপেজেও ক্যামেরা থাকবে। ড্রাইভার ও হেলপারের নিয়োগ হবে কোম্পানি থেকে, তারা কোনো ভাড়া আদায় করবেন না।
২০২১ সালে নগর পরিবহন চালু হলে চালকের বেতন ২২ হাজার টাকা ও সহকারীর বেতন ১৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। সেই অনুযায়ী চুক্তিপত্র দেওয়া হয়। তবে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করার লক্ষ্যে পরিবহন শ্রমিকরা সেই চুক্তির শর্ত মানেননি। এবার বলা হচ্ছে, প্রকল্পটিতে গতি এলে মালিকরা যেন শ্রমিকদের বেশি টাকা বেতন দেন সেই দিকটি নিশ্চিত করা হবে।
বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের আওতায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ১২০টির অধিক বাস স্টপেজ তৈরি করা হয়েছে। ডিটিসিএর পরিদর্শন ও পরিবীক্ষণ টিম নিয়মিতভাবে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ পাইলট প্রক্রিয়া তদারকি করছে। ডিটিসিএর প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে ঢাকায় ১০টি বাসস্টেশন করা হবে। এতে আন্তজেলা বাসগুলো আর ঢাকায় প্রবেশ করবে না। সে জন্য ট্রান্সফার স্টেশনের ব্যবস্থা রাখা হবে। এ স্টেশনগুলো হলো ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের দক্ষিণে ঝিলমিল-বাঘাইর, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উত্তরে কাঁচপুর-১, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দক্ষিণে কাঁচপুর-২, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে হেমায়েতপুর, নবীনগর-চন্দ্রা সড়কের পাশে বাইপাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুরে, এমআরটি-৬ ডিপোর সঙ্গে উত্তরার ভাটুলিয়ায়, ইনার রিং রোডের পশ্চিম পাশে আঁটিবাজারে, ঢাকা বাইপাসের দক্ষিণে কাঞ্চনে।
সায়েদাবাদ আন্তজেলা বাস টার্মিনাল সরিয়ে কাঁচপুরে নিয়ে যাওয়া হবে। ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে জমি হস্তান্তর করেছে সওজ।
বড় বাধা আমলাতন্ত্র; অভিযোগ পরিবহন-মালিকদের
গত বছর বিআরটিসির একটি সভায় সংস্থাটির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম বলেছিলেন, বেসরকারি বাস কোম্পানির মালিকরা ঢাকা নগর পরিবহনে বাস দিতে রাজি না হলে শুধু বিআরটিসির বাস দিয়েই রুট পরিচালনা করা সম্ভব। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এতে সায় দিয়েছিলেন। তবে এ বিষয়ে একমত নন পরিবহন খাতের মালিক ও বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির আহ্বায়ক কমিটির নেতা এম এ বাতেন বলেন, ‘ঢাকা নগর পরিবহনব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজাতে গেলে আমাদের নতুন বাসও নামাতে হবে। এখন বিআরটিএ নতুন করে বাসের রুট পারমিট, লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ কিছু দিচ্ছে না। কিছু আলোচনা এগোলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা আটকে যাচ্ছে। নতুন মডেলের বাস নামাতে না পারলে এই প্রকল্পের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আবার জলে যাবে।’
কমিটি গঠনে পদ্ধতিগত ভুল: অধ্যাপক ড. শামসুল হক
বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটি গঠনে পদ্ধতিগত ভুল রয়েছে। সরকারের অন্য সব কমিটির মতো এটিও আমলানির্ভর কমিটি। নগর পরিবহনকে শৃঙ্খলায় আনা ও তদারকি করার সার্বিক বিষয়গুলো দেখভাল করার কথা পেশাদার লোকজনের। অথচ এখন কয়েকজন অস্থায়ী কর্মকর্তা এসব প্রকল্প দেখভাল করছেন। ঢাকা নগর পরিবহনের যানবাহনের মান কেমন, বাসমালিকরা যাত্রীদের জিম্মি করে ফেলছেন কি না, বাস রুট পরিচালনায় প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন হলো- এসব দেখভাল করতে হলে স্থায়ী লোকজন দিয়ে কমিটি করতে হবে।
ঢাকার ৪২টি রুট পুনর্বিন্যাস করার কথা বলছে কমিটি। তবে এসব রুটে বিভিন্ন গতির গণপরিবহন চললে বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রক্রিয়া ভেস্তে যাবে বলে মন্তব্য করেন শামসুল হক। তিনি বলেন, একই করিডরে নগর পরিবহনের বাসও চলবে, আবার লেগুনাও চলবে, তাহলে তো হবে না। দেখা যাবে, নগর পরিবহনের যাত্রী টেনে নিচ্ছে লেগুনা। রুট পুনর্বিন্যাস করতে গেলে আগে কোন করিডরে কোন গতির যানবাহন চলবে এটি নির্দিষ্ট করতে হবে। না হলে বাসমালিকরা লোকসানের মুখে পড়বেন।
পরিবহন-মালিকদের রাজনৈতিক প্রভাবে প্রকল্প বারবার ভেস্তে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে শামসুল হক বলেন, বিগত সরকারের আমলে এনায়েত উল্যাহ, ওসমান আলীদের মতো প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের কারণে বাস রুটে শুধু একটি কোম্পানির বাস চালানো যায়নি। পরবর্তী সময়ে আবার রাজনৈতিক সরকার এলে তাদের মতো কেউ এসে একই কাজ করবেন। তাই ঢাকার নগর পরিবহনকে শৃঙ্খলায় আনতে হলে এই অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। রুট পারমিট, ফিটনেস, লাইসেন্স নিয়ে যে দৌরাত্ম্য তা বন্ধ করতে হবে এই সরকারকেই।