জালিয়াতি ও শুল্কফাঁকির মাধ্যমে আনা বিলাসবহুল গাড়ি চলছে চট্টগ্রামের সড়কে। ব্যবহার করা হচ্ছে ভুয়া একাধিক নম্বরপ্লেট। কাস্টম হাউস ও বিআরটিএর কাছে তথ্য নেই এসব গাড়ির। ফলে দেশে প্রবেশ কীভাবে করছে বিলাসবহুল অত্যাধুনিক গাড়ি? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করার পর তদন্তে নেমেছে সংস্থাটি।
চট্টগ্রাম কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানায়, প্রায় ১০ কোটি টাকা শুল্ক-কর পরিশোধ না করেই ‘নিশান সাফারি’ আনা হয় দেশে। গত সোমবার চট্টগ্রামের খুলশী থেকে বিলাসবহুল নিশান সাফারি গাড়িটি জব্দ করা হয়। এ গাড়ির আমদানির কোনো তথ্য নেই কাস্টম হাউসে।
এর আগে ‘বিএমডব্লিউ সেভেন’ সিরিজের একটি গাড়ি আটক করে কাস্টমস গোয়েন্দা। এরপর ওই গাড়ি আমদানিতে শুল্ক ফাঁকি ও অর্থ পাচারের ঘটনা আলোচনায় আসে। আমদানির সময় গাড়ির মডেল, তৈরির সালসহ সবকিছু জালিয়াতি করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা হয়।
এই দুটি গাড়ির মধ্যে একটির শুল্ক ফাঁকির তথ্য পেয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা। অপরটির শুল্ক পরিশোধের কোনো তথ্য যেমন কাস্টম হাউসে নেই, তেমনি সড়কের চলাচলের জন্য বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) কাছেও কোনো তথ্য নেই। অথচ গাড়িটি ভুয়া নম্বরপ্লেট ব্যবহার করে সড়কে চলছে।
শুল্ক গোয়েন্দাদের ধারণা, এসব অপরাধে শুধু আমদানিকারকই নয়, ক্রেতাদের প্রতারণার তথ্য মিলছে হরহামেশা। একশ্রেণির প্রতারক এসব গাড়ি দেশে নিয়ে আসছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে ২০২০ সালের ৩ মে ব্র্যান্ড নিউ বিএমডব্লিউ প্রাইভেট কারটি খালাস করে নেয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের ‘নাগোয়া করপোরেশন’। খালাসের সময় গাড়িটি বিএমডব্লিউ-৫ সিরিজের ‘৫৩০-ই’ মডেলের ঘোষণা দেওয়া হয়। অথচ গাড়িটি বিএমডব্লিউ-৭ সিরিজের ‘৭৪০-ই’ মডেলের। উৎপাদন হয় ২০১৭ সালে। তবে আমদানির সময় উৎপাদন সাল দেখানো হয় ২০১৯।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. মিনজাহ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘পরপর দুটি গাড়ি আমরা জব্দ করেছি। এসব গাড়ির কোনো ধরনের তথ্য নেই কাস্টম হাউসের কাছে। এ ছাড়া সড়কে চলছে কিন্তু বিআরটিএর কাছেও কোনো তথ্য নেই। অথচ গাড়ির পেছনে নম্বরপ্লেট রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এক শ্রেণির প্রতারক চক্র সরকারকে অন্ধকারে রেখে জালিয়াতির মাধ্যমে এ কারবার করছে। আমরা এই চক্রকে ধরার জন্য কাজ করছি। সম্প্রতি জব্দ করা গাড়িটি মেঘনা গ্রুপের নামে কেনা। প্রবাসী ওসমান গণি মেঘনা গ্রুপ থেকে স্টাম্পে দলিলের মাধ্যমে গাড়িটি কিনেছেন। এ দলিল ছাড়া আর কোনো তথ্য আমাদের কাছেও নেই। আমরা মেঘনা গ্রুপ, কাস্টম হাউস ও বিআরটিএকে চিঠি দিয়েছি। অথচ এই গাড়িটি একাধিক নম্বরপ্লেট ব্যবহার করে সড়কে চলছে। আর আগে জব্দ করা গাড়িতে প্রায় ছয় কোটি টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। নিশান সাফারিতে দেওয়া হয়েছে ১০ কোটি টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি। এ দুই গাড়ির বিষয়ে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
যেভাবে জব্দ হলো নিশান সাফারি গাড়ি
গত সোমবার চট্টগ্রামের খুলশী থেকে বিলাসবহুল নিশান সাফারি গাড়ি জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। পশ্চিম খুলশী ১ নম্বর রোডের রোজ ভ্যালির হাছান টাওয়ারের নিচতলার পার্কিংয়ে নিশান সাফারি গাড়িটি রাখা ছিল। গাড়িটির গায়ে নিশান পেট্রোল লেখা থাকলেও গাড়িটির চেসিস নম্বর দিয়ে ওয়েবসাইটে সার্চ করে নিশান সাফারি পাওয়া যায়।
মো. ওসমান গণি নামে এক দুবাইপ্রবাসী মেঘনা গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান মেঘনা সিডস ক্রাসিং লিমিটেডের কাছ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকায় গাড়িটি কিনেছেন। এমন স্টাম্প দেখিয়েছেন কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের। ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-২৩২৪ রেজিস্ট্রেশনধারী গাড়িটি জব্দ করে চট্টগ্রাম কাস্টম গুদামে জমা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘উপযুক্ত দলিলপত্র ছাড়া শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ভিন্ন উপায়ে বা মিথ্যা ঘোষণায় চোরাচালানের মাধ্যমে নিশান সাফারি গাড়িটি বাংলাদেশে আনা হয়েছে। যা কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ধারা ২(২৪), ১৮, ৩৩, ৮১, ৯০-এর আইনের লঙ্ঘন এবং অপরাধ হিসেবে গণ্য। গাড়িটির মোট আমদানি শুল্ক ৮২৭ শতাংশ এবং আনুমানিক শুল্ক-কর ১০ কোটি টাকা।’
তিনি জানান, দেশে পাঁচ থেকে সাতটির মতো রয়েছে এ গাড়ি। অত্যাধুনিক গাড়িটি সঠিক উপায়ে কিনতে হলে বাজারে কমপক্ষে ১৫ কোটি টাকা পড়বে। কিন্তু জব্দকৃত গাড়ির কোনো ধরনের তথ্য নেই। কীভাবে দেশে এল এটিই প্রশ্ন। এই গাড়িতে ছয় সাতটি নম্বরপ্লেট পাওয়া গেছে।
বিএমডব্লিউ-৭ সিরিজের ‘৭৪০-ই’ মডেলের কার জব্দ
গত ১৩ নভেম্বর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকার মাল্টিব্র্যান্ড ওয়ার্কশপে সার্ভিসিংয়ের সময় গাড়িটি আটক করা হয়। পরে গাড়িটি কাস্টমস হাউস ঢাকার শুল্ক গুদামে জমা দেয় কাস্টমস গোয়েন্দা। গাড়িটির মূল্য এক লাখ ডলারের মতো ছিল। অথচ আমদানি নথিতে গাড়িটির দাম ২০ হাজার মার্কিন ডলার ঘোষণা দেওয়া হয়। শুল্কায়ন করা হয় ৪০ হাজার মার্কিন ডলার দেখিয়ে। গাড়িটি আমদানি হয় চট্টগ্রামের এক গাড়ি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নাগোয়া করপোরেশনের নামে। কিন্তু গাড়িটি বিক্রি করে এলএনবি অটোমোবাইলস। এটি অনুপ বিশ্বাস নামের চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ী কেনেন। এতে ৬০ হাজার ডলার কম দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। হাত বদল হয়ে গাড়িটি সম্প্রতি কিনেছে চৌধুরী ফ্যাশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু চট্ট মেট্রো-গ-১৪-১৭৪৫ নম্বরের গাড়িটি চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার ২৮ ইকবাল রোড ফিশারিঘাটের ঠিকানায় অনুপ বিশ্বাসের নামে নিবন্ধিত।
শুল্কগোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমদানি করা গাড়িটি মিথ্যা ঘোষণায় দলিলাদি জালিয়াতি করে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে কাস্টমস আইন-২০২৩-এর সেকশন ১৮, ৩৩, ৯০, ১২৬ এর ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে। পাশাপাশি একই আইনের ২(২৪) ধারা অনুসারে চোরাচালান হিসেবে গণ্য হবে।