‘হাইকোর্টের মাজারে কত ফকির ঘুরে, কজনা আসল ফকির?’ দেশে ব্যান্ডসংগীতের গুরু হিসেবে খ্যাত আজম খানের বহুল জনপ্রিয় গান এটি। শেষতক তিনি এই প্রশ্নের জবাব পেয়েছিলেন কি না, তা জানা নেই।
অবশ্য ‘হাইকোর্টের মাজার’ নামে পরিচিত ‘সুপ্রিম কোর্ট মাজার’ কর্তৃপক্ষের চিন্তায় এই প্রশ্নের লেশ আছে বলে মনে হচ্ছে না।
আজম খানের গানটির ‘এই যে দুনিয়ায় মানুষ আর মানুষ নাই’ লাইনটিও যেন কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করে না। তারা বরং কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘মানুষ’ কবিতায় স্থির। কবিতার
‘অথবা হয়তো কিছুই নহে সে, মহান উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজনালয়
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!’ লাইনগুলো ভেবেই যেন তাদের যত আয়োজন।
পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদ প্রশাসন কমিটির সঙ্গে আলাপ করে এমন ধারণা পাওয়া গেছে। রমজানে এই মাজারে প্রতিদিন হাজার দেড়েক মানুষ ইফতার করেন। অর্থাৎ রমজান মাসের ৩০ দিনে ৪৫ হাজার মানুষকে ইফতার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
বছরের বাকি ১১ মাস প্রতিদিন এখানে কয়েক শ মানুষ দুপুরের খাবার খান। এখানে যারা খেতে আসেন তাদের ধর্ম, বর্ণ, বিত্ত, লিঙ্গ বা আস্তিক-নাস্তিক সব ছাপিয়ে একটাই পরিচয়, তারা মানুষ। মাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে সবাই আর্থিক অনটনের কারণে খেতে আসেন- এমন নয়। কেউ আসেন মানত করে। আবার কেউ আসেন এত এত মানুষের সঙ্গে বসে একসঙ্গে ইফতার করতে পারাকে সৌভাগ্য মনে করে। আবার কেউ কেউ আসেন কেবল লাকড়ির চুলার রান্নার স্বাদ পেতে। কে কী ভেবে এলেন, মাজার কর্তৃপক্ষের ভাবনায় সেসব নেই। তাদের ভাবনায় একটাই বিষয়, উপস্থিত মানুষের সবার ইফতার নিশ্চিত করতে হবে।
মাজারের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু বক্কর, সিনিয়র মাজার সহকারী মো. শফিউর রহমান ও অফিস সহকারী হাবিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তারা জানান, এ ছাড়া ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এবার ১ হাজার ৫০টি করে শাড়ি ও লুঙ্গি বিতরণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাজার কমিটির সদস্যরা সাধারণত তাদের নিজ নিজ গ্রামাঞ্চলে এসব বিতরণ করেন। এ ছাড়া ২০০-৩০০ শাড়ি-লুঙ্গি মাজার অঙ্গনেও বিতরণ করা হবে ঈদুল ফিতরের আগে। ২১ রমজান থেকে ২৭ রমজান পর্যন্ত কিয়ামুল লাইল নামাজও জামাতের সঙ্গে আদায় করা হবে মাজার মসজিদে। রাত সাড়ে ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত এই নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। জামাতে অংশগ্রহণ করা এই শ-দুয়েক মুসল্লির জন্য প্রতি রাতে সাহরির আয়োজনও রাখবে মাজার কর্তৃপক্ষ। তা ছাড়া এবারই প্রথম প্রতিদিন বাদ আসর সহিহ উচ্চারণে কোরআন তিলাওয়াতের শিক্ষা দেওয়া হবে।
মাজারের অ্যাকাউন্টস অফিসার মো. আসাদুজ্জামান গতকাল বুধবার খবরের কাগজকে বলেন, প্রতিদিন আনুমানিক ১৫০০ করে এই ৪৫০০০ হাজার মানুষের ইফতারের সব বাজার আমাদের করতে হয়, তা নয়। আমরা সাধারণত সপ্তাহখানেকের বাজার করি শুরুতে। তারপর মানুষের দান, অনুদান, নিয়ত, মানত বাবদ ছোলা, চিনি, চাল ইত্যাদি আসতে থাকে। আমরা তখন শুধু তেল, মসলা, লাকড়ি এসবের ব্যবস্থা করি। অন্য তেমন কিছু আর লাগে না।
সুপ্রিম কোর্ট মাজার ও মসজিদ প্রশাসন কমিটির সচিব এবং সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (সার্বিক ও আদি অধিক্ষেত্র) এ এইচ এম তোয়াহা বলেন, এসব দান, অনুদান কখনো কখনো এতটাই বেশি আসে যে আমরা উদ্বৃত্ত খাবার আশপাশে যেমন সুপ্রিম কোর্ট জামে মসজিদে পাঠিয়ে দেই। তবে অনুদান যদি না-ও আসে, তবুও এসব খরচের আর্থিক প্রস্তুতি আমাদের আছে। প্রতিবছরই থাকে।
তবে বর্তমানে মাজার মসজিদের সংস্কারকাজ চলমান থাকায় ইফতারে আসা মানুষের বসানোর ক্ষেত্রে হিমশিম খেতে হবে।
মাজারের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু বক্কর জানিয়েছেন, মাজার মসজিদের ভেতরে বসেই অন্যান্য বছর মানুষ ইফতার করত। কিন্তু সংস্কারকাজ করতে গিয়ে এবার এটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাই এবার মাজারের সামনের সড়কে বসে ইফতার সারতে হবে আগতদের। তবে বৃষ্টি হলে বর্তমান অস্থায়ী মসজিদ ভবনের ভেতরে গাদাগাদি করে বসে ইফতার সারতে হবে।
আসছে ঈদুল ফিতরের নামাজের জন্য রমজান মাসজুড়েই সামনের জাতীয় ঈদগাহ মাঠ প্রস্তুত করা হবে। তবুও মাঠের এক কোণে মাজারের লঙরখানাটি আপাতত সরিয়ে নেওয়া হবে। কারণ মসজিদ ভবন নির্মাণের জন্যে জায়গাটি খালি করে দিতে হবে।
মাজারের মসজিদ ভবন পুনর্নির্মাণ করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান (শাদ) এই প্রকল্পটি দেখভালের দায়িত্বে আছেন। তিনি জানান, প্রকল্পটির নাম ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত মাজার মসজিদ নির্মাণ প্রকল্প’। মাজার অক্ষত রেখেই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। চুক্তি অনুয়ায়ী আগামী ডিসেম্বর নাগাদ প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা। আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্থাপত্য অধিদপ্তর। এই প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ৬৮ কোটি ৩২ লাখ সাত হাজার ৯৭৯ টাকা। চুক্তি স্বাক্ষরের তারিখ ২০২৪ সালের ২ এপ্রিল। প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা দুটি বেইজমেন্টসহ চারতলাবিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ।
মাজারের ইতিহাস
এই মাজারের ইতিহাস জানতে চাইলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু বক্কর ছোট্ট একটি পুস্তিকা দেন। পুস্তিকাটির নাম ‘হযরত শাহ্ খাজা শরফুদ্দীন চিশ্তী (রহ.) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও সুপ্রীম কোর্ট মাজার মসজিদ পরিচিতি’। ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত বইটির আর কোনো সংস্করণ হয়নি বলে জানান তিনি। বইটির মুখবন্ধে তৎকালীন কমিটির চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান লিখেছেন, ‘ওলি-এ-বাংলা হযরত শাহ্ খাজা শরফুদ্দীন চিশ্তী (রহ.) বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ওলি। সুলতানুন হিন্দ খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী (রহ.) তার নিকট হতে ইলমে মারেফাতের সুগভীর জ্ঞান অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি হযরত শাহজালাল ইয়েমেনী (রহ.) এর সফরসঙ্গী হিসেবে এ বাংলায় এসে ইসলামের বাণী প্রচার করেন।’
পুস্তিকায় মাজার মসজিদের পরিচিতিতে লেখা হয়েছে, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট প্রাঙ্গণের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে হযরত শাহ্ খাজা শরফুদ্দীন চিশ্তী বেহেস্তি (রহ.)-এর মাজার মসজিদ অবস্থিত। ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে এই মহান ওলির ইন্তেকাল হওয়ার পর তার ভক্তরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তার মাজারটি সংরক্ষণ করতে থাকেন।’ ‘১৯৬৪ সালে ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে মাজারটির কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন।’