‘অন্য বছরগুলোয় রোজার ঈদের আগে ভালো বেচাবিক্রি হয়েছে। এবার সে তুলনায় অনেক কম। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই অনেকে ভয়ে বাজারে আসছেন না।’ এভাবেই ঈদের বেচাবিক্রির ব্যাপারে অভিমত প্রকাশ করেন রাজধানীর বসুন্ধরা সিটির রিচম্যান আউটলেটের ম্যানেজার মীর মহসিন। অন্য বিক্রেতারাও একই তথ্য জানান।
রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে মোহাম্মদপুর, মিরপুর নিউ মার্কেট, বাইতুল মোকাররম মার্কেট, এমনকি ফুটপাতের বিক্রেতারাও বলছেন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। দীর্ঘদিনের নির্ধারিত কাস্টমাররা বাজারে আসছেন না। আশা পূরণ হচ্ছে না। এমনকি অনেক দোকানদার কাস্টমার টানতে ছাড়ের ঘোষণাও দিয়েছেন, তবে সাড়া মিলছে না। ঈদের মাত্র তিন দিন বাকি থাকলেও পোশাক, জুতা, স্যান্ডেল, কসমেটিকস থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্য- সব দোকানেই একই চিত্র। গত দুই দিন বিভিন্ন বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
গতকাল বেলা ২টার পর বসুন্ধরা সিটির বিভিন্ন ফ্লোরে ক্রেতা দেখা গেছে। তবে দোকানিরা বলছেন, এবার বিক্রি খুবই কম। নামিদামি ব্র্যান্ডের দোকানেও ছিল না কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা। এই শপিং কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলায় অবস্থিত জেন্টল পার্কের ম্যানেজার হাবিবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সকাল থেকেই কাস্টমার আসছেন। এটা-সেটা দেখছেন। কিন্তু গত বছরের তুলনায় বিক্রি কম। আমাদের এখানে পাঞ্জাবি ২ হাজার ৪৯০ থেকে ৩ হাজার ৪৯০ টাকা, শার্ট ১ হাজার ৯৯০ থেকে ২ হাজার ৮৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই তলার মনেরেখ আউটলেটের বিক্রয়কর্মী মোল্লা হোসেনও বলেন, ‘যেভাবে আশা করেছিলাম সেভাবে বিক্রি হচ্ছে না। দুপুর গড়িয়ে গেলেও বিক্রি তেমন হয়নি। অস্থিরতার কারণেই এবার বিক্রি কমে গেছে। ভারত ও পাকিস্তান থেকে প্রচুর থ্রি-পিস কালেকশন করা হয়েছে। এসব পণ্য ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’ এই তলার লেন্ড ব্র্যান্ডের ম্যানেজার রবিউল ইসলামও বলেন, ‘ভালো বিক্রির আশায় অনেক কালেকশন করা হয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় কাস্টমার নেই। ২০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। তার পরও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।’
এই মার্কেটের বিভিন্ন তলায় নামিদামি ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে ইয়োলো, ইজি ফ্যাশন, আর্টিসান, টুয়েলভ, জেন্টল পার্ক, ইনফিনিটি, রিচম্যান, লুবনান, দর্জিবাড়ি, ইল্লিয়্যিন, ক্যাটস আই, ফিট এলিগ্যান্স, রাইজ, র’নেশন, প্ল্যাস পয়েন্ট, আড়ং, স্টাইল ইকো। এ ছাড়া জ্যোতি, জামদানি হাউস, নীল আঁচল শাড়িজ, কালাঞ্জলি শাড়িজ, ঢাকা জামদানি কুটির, শাড়িবাজার, শালিমার, অর্চিসহ অনেক অভিজাত শাড়ির দোকানও রয়েছে। লেভেল ফাইভে লা-রিভ, রেড, বাটা, এপেক্স, ওরিয়ন, বে শোরুমও রয়েছে। বিক্রেতারা ক্রেতার অপেক্ষায় থাকলেও সাড়া কম পাচ্ছেন।
এদিকে বাইতুল মোকাররম মার্কেটেও দেখা গেছে, বিক্রেতারা অপেক্ষায় থাকলেও ক্রেতা কম। এই মার্কেটের নিচতলায় রেড সুইস ইলেকট্রনিকসের বিক্রয়কর্মী জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘অন্য বছরে ঈদুল ফিতরে বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়। এবার সে তুলনায় কিছুই নেই। সংসার সাজাতে ব্লেন্ডার, রাইস কুকার, কিচেন হুড, ওভেনের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তার পরও এবার বিক্রি কম।’ একই মার্কেটের ইমাম টেলিকমের ম্যানেজার জহির উদ্দিনও বলেন, ‘অন্য বছরে ঈদে প্রচুর টিভি, ফ্রিজ, এসি বিক্রি হয়েছে। এবার তার ছিটেফোঁটা নেই।’ এই মার্কেটের আতর হাউসের স্বত্বাধিকারী মোফাজ্জল হোসেনও বলেন, ‘রমজান এলে আমাদের ব্যবসা জমে ওঠে। এই সময়ে আতর, জায়নামাজ বেশি বিক্রি হয়। কিন্তু সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাত্র একটি টুপি ও একটি আতর বিক্রি করেছি। তাহলে বোঝেন কেমন বিক্রি হচ্ছে।’
এদিকে মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটের মাহিন শাড়িজের স্বত্বাধিকারী মান্নান মুন্সী বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এবার দীর্ঘদিনের কাস্টমার বাজারে আসেন না। এ জন্য বিক্রি কমে গেছে। মাথায় হাত পড়ে গেছে। কারণ অনেক আশা করে প্রচুর মাল আনা হয়েছে। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে না।’ আদাবর রিং রোডের টুয়েলভের বিক্রয়কর্মী সাব্বির হোসেন বলেন, ‘১০ থেকে ১৫ রমজান মোটামুটি বিক্রি হয়েছে। তার পর থেকে কমে গেছে।’ টোকিও স্কোয়ারেও দেখা গেছে এই চিত্র। মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় বিক্রমপুর ফেব্রিকসসহ অন্য দোকানেও দেখা গেছে ক্রেতা এলেও সেই তুলনায় বেচাবিক্রি কম বলে বিক্রেতারা জানান। শৈলী ফেব্রিকসের বিক্রয়কর্মী আল-আমিন বলেন, ‘রোজার প্রথম থেকেই বেচাকেনা শুরু হয়েছে। তবে যেভাবে আশা করেছিলাম সেভাবে হচ্ছে না। অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন।’ এই মার্কেটের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় শিশু ও বড়দের পোশাকের শত শত দোকানের বিক্রয়কর্মীরা হাঁকডাক দিচ্ছেন। কিন্তু ক্রেতা কম।
কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া ফল বিতানের স্বত্বাধিকারী মনির হোসেনও বলেন, ‘আগের মতো ফল বিক্রি হচ্ছে না। মনে হয় মানুষের টাকা কমে গেছে। এ জন্য অনেকেই বাজারে আসেন না।’
অভিজাত এলাকা গুলশানের ভাসাভি, পিংক সিটিতেও একই অবস্থা বলে বিক্রেতারা জানান। ভাসাভির ইনচার্জ ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘অনেক কালেকশন রয়েছে। কিন্তু এবারে বিক্রি অনেক কমে গেছে। বেশি দামের কাস্টমার নেই।’
রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে নিউ মার্কেট, বায়তুল মোকাররমসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটপাতও বেচাবিক্রিতে জমে ওঠে। কিন্তু বড় বড় মার্কেটের মতো এবার তাদেরও বিক্রি কমে গেছে। বায়তুল মোকাররমের ফুটপাতের বিক্রেতা দেলোয়ার হোসেন, নিউ মার্কেটের জয়নাল হোসেন, কৃষি মার্কেটের শরিফ উদ্দিনসহ অন্যরা প্রায় একই সুরে কথা বলেন। তাদের কথায় চলে এসেছে, আগে গাড়ি থেকে নেমে অনেকেই তাদের দোকান থেকে শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি কিনেছেন। এবার সেই চিত্র নেই। ঈদের আর তিন-চার দিন বাকি রয়েছে। অনেকেই বাড়ি চলে যাচ্ছেন। ভালো মানের পণ্য রাখলেও বিক্রি হচ্ছে না।’
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। ব্যবসায়ীরা বা বিক্রেতাদের বক্তব্যই সত্য। দেশে যে অস্থিরতা চলছে, সেটা অস্বীকার করা যায় না। এই অস্থিরতার প্রভাব ঈদের বাজারেও দেখা গেছে। কারণ মানুষ প্রথমে চায় নিরাপত্তা ও স্বস্তি। সেটার ঘাটতি রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। অনেকেই ভয়ে বাজারে আসেন না। তার পরও বলব, দেশে যে অবস্থা তাতে আমরা অসন্তুষ্ট না।’