কিছুদিন আগ পর্যন্ত কিশোর গ্যাং আতঙ্কে ভুগছিলেন মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার বাসিন্দারা। দফায় দফায় অভিযান ও গ্রেপ্তারে সেই পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে এক এলাকা বদলে আরেক এলাকায় গিয়ে অপরাধমূলক তৎপরতা চালানোর চেষ্টা তারা করছে বলে জানা গেছে।
কিশোর গ্যাংয়ের হটস্পট হিসেবে খ্যাত সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর একাধিক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খবরের কাগজকে এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এ বিষয়ে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, গ্যাং দমনে পুলিশের নিয়মিত অভিযান ও টহল অব্যাহত রয়েছে। গ্যাংয়ের সদস্যরা এখন গ্রেপ্তার আতঙ্কে রয়েছে। তারা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সে জন্য সতর্ক রয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া তারা যেন জামিন না পায় সে বিষয়ে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় কিছুদিন আগেও ভয়ানক দৌরাত্ম্য ছিল কিশোর গ্যাংগুলোর। তবে সম্প্রতি এসব এলাকায় তাদের তৎপরতা কমায় অনেকটা স্বস্তি ফিরেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের পাশাপাশি পুলিশ কর্মকর্তারাও মনে করছেন, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। তারা জানান, মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই, অস্ত্র উঁচিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখল, কোপাকুপি, নারীদের উত্ত্যক্ত করাসহ নানা অপরাধ ঘটিয়ে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। বর্তমানে রাজধানীর কিশোর গ্যাংয়ের হটস্পট খ্যাত মোহাম্মদপুর, উত্তরা, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকাতেও তাদের তৎপরতা অনেকাংশেই কমেছে, ফলে এলাকাগুলোতেও ফিরেছে স্বস্তি।
পরিস্থিতির উন্নতির কথা জানিয়ে স্থানীয়রা বলেছেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানের কারণে প্রতিদিনই গ্রেপ্তার হচ্ছে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা। ধরপাকড়ের কারণে তারা দলছুট হয়ে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তবে সব কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়নি। কৌশল পাল্টে কোনো কোনো কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এক এলাকার বদলে আরেক এলাকায় গিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করছে।
সংশ্লিষ্ট চারটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) খবরের কাগজকে বলেন, পুলিশের নিয়মিত অভিযানে বেশির ভাগ গ্যাং লিডার ও সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ জন্য এসব এলাকায় অপরাধ কমে এসেছে। দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এসব এলাকার পরিবেশ এখন শান্ত। সাধারণ মানুষ নিরাপদে আছেন।
এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে গডফাদার বা পৃষ্ঠপোষকরা। কিশোর গ্যাংয়ের মদদদাতা ও আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
জানা যায়, গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর কেরানীগঞ্জের তুলসীখালী ব্রিজ এলাকায় সেনাবাহিনীর টহল দল একটি কিশোর গ্যাংয়ের ১৬ সদস্যকে আটক করে। কিশোর গ্যাংয়ের ওই সদস্যরা ধলেশ্বরী নদীতে নৌকার ওপর বেশ উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন করে নাচানাচি করছিল। এ ছাড়া সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, আদাবর ও হাজারীবাগ থেকে কিশোর গ্যাংয়ের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, পুলিশের নিয়মিত অভিযানের ও টহলের কারণে গ্যাং সদস্যরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। গ্রেপ্তার আতঙ্কে তারা এলাকা বদলাচ্ছে। এ ছাড়া অনেকে এখন গা ঢাকা দিয়েছে। প্রকাশ্যে বাইক রেসিং, ঘোরাফেরা, চাঁদাবাজি, চুরি-ছিনতাই ও কোপাকুপির ঘটনা অনেকটা কমেছে। তবে এখন তারা সন্ধ্যার পর অলিগলিতে বিচ্ছিন্নভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে বলেও জানান তারা।
কিশোর গ্যাং নিয়ে যা বলছেন চার থানার ওসিরা
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী ইফতেখার হাসান খবরের কাগজকে বলেন, পুলিশের নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তারের কারণে কিশোর গ্যাং সদস্যরা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গা ঢাকা দিয়েছে। গত তিন মাসে মোহাম্মপুরে শতাধিক গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে।
একই বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘গত দুই মাসে ১৭ জন গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের সবাই এখন কারাগারে। এই গ্যাং সদস্যদের দমন করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।’
রাজধানীতে গ্যাংদের আরেক হটস্পট যাত্রাবাড়ী এখন একবারে শান্ত। যাত্রাবাড়ী থানার ওসি কামরুজ্জামান তালুকদার খবরের কাগজকে বলেন, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, যাত্রাবাড়ীতে এখন কিশোর গ্যাংসংশ্লিষ্ট কোনো অভিযোগ আসছে না।
মিরপুর মডেল থানার ওসি সাজ্জাদ নোমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘মিরপুর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব অনেকটাই বিলীন হওয়ার পথে। পুলিশ নিয়মিত নজরদারি করছে। যখনই কোনো অভিযোগ পাচ্ছি, কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। অভিভাবকদেরও এতে সম্পৃক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
কী বলছেন স্থানীয়রা
মোহাম্মদপুর, উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীর একাধিক বাসিন্দা জানান, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত কমেছে। তবে চুরি-ছিনতাই থেমে নেই। পুলিশ আগের চেয়ে পেশাদারত্ব নিয়ে কাজ করায় অপরাধ কমে এসেছে। এ ছাড়া থানায় সেবার মান বেড়েছে। রাতে সেনাবাহিনী ও টহল পুলিশ নিরাপত্তা দিচ্ছে বলেও জানান তারা।
মিরপুর-১০ নম্বরের বাসিন্দা বাতেন খান খবরের কাগজকে বলেন, এখন চাঁদাবাজি কমেছে। তবে সুযোগ পেলেই ছোট অপরাধ করছে গ্যাংগুলো। ধরা পড়ার ভয়ে অবশ্য এখন জনসমক্ষে কম আসছে তারা।
এখন প্রকাশ্যে না হলেও বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সুযোগ পেলেই অপরাধে জড়াচ্ছে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া গ্যাং সদস্যরা। এমনই মন্তব্য করে মোহাম্মদপুর ফিউচার হাউজিংয়ের ৩ নম্বর রোডের একটি ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান শান্ত খবরের কাগজকে বলেন, সুযোগ পেলেই রাতের অন্ধকারে গ্যাং সদস্যরা বিদ্যুতের তার কেটে নিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ১ ও ২ নম্বর রোডের একটি বাড়ির তার কেটে নিয়ে গেছে, যার দাম হবে ৩০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, অপরাধ কমেছে সত্যি, তবে পুলিশি টহল কমায় এসব অপরাধ হচ্ছে।
একই বিষয়ে উত্তরার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘উত্তরার দুই থানা এলাকায় আগের চেয়ে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত কমেছে। তবে উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকার দিকে তাদের কিছু বাড়াবাড়ির খবর শোনা যায়।’
ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান হয় যেভাবে
রাজধানীর উত্তরায় ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে স্কুলছাত্র আদনান কবিরকে সমবয়সী কিশোররা খেলার মাঠে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে। মূলত এ ঘটনার পরই কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতার বিষয়টি প্রথম দেশবাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে। এ ঘটনার পর র্যাব অভিযান চালিয়ে ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘নাইন স্টার গ্রুপ’ নামে দুই কিশোর গ্যাংয়ের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছিল। এরপর কিশোর গ্যাংয়ের সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি জানা যায় ২০১৯ সালে।