গত বছরের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল বহুল প্রত্যাশিত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। কিন্তু আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় চিত্র। গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত টার্মিনালের কাজ মাত্র ৫ শতাংশ বাকি থাকলেও গত আট মাসে তা শেষ হয়নি। এ অবস্থায় আগামী অক্টোবরেই টার্মিনালটি চালুর চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া।
খবরের কাগজকে তিনি বলেন, টার্মিনালের কাজ ৯৯.৫০ ভাগ শেষ হয়েছে। সামান্য কিছু কাজ বাকি আছে। এগুলো গুছিয়ে আনতে পারলেই আমরা টার্মিনালটি জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য চালু করে দেব। আমাদের চেষ্টা থাকবে আগামী অক্টোবরেই যেন থার্ড টার্মিনাল চালু করা যায়।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের ৫ শতাংশ কাজের মধ্যে বিভিন্ন ইন্সটলেশন, ক্যালিব্রেশন ও মেশিন প্রি-টেস্টিংয়ের কাজ বাকি ছিল। কিন্তু গত আট মাসেও তা শেষ হয়নি। এসব কাজ শেষ করে দ্রুতই তৃতীয় টার্মিনালটি বেবিচকের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামের।
২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের কাজ। সরকারের ৫ হাজার কোটি টাকা আর জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা বাকি টাকার জোগান দেয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থার্ড টার্মিনালটি আংশিক উদ্বোধন করেন। তবে এটি যাত্রীদের ব্যবহার উপযোগী হতে আরও কিছু সময় লাগবে বলে তখন জানানো হয়। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) মনে করছে, এ বছরের শেষেই যাত্রীরা টার্মিনালটি ব্যবহার করে বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে পারবেন।
বেবিচক কর্মকর্তারা জানান, জাপানকে সম্পূর্ণ দায়িত্বই দেওয়া হচ্ছে। অপারেশনস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স এর কাজ থাকবে জাপানের হাতে। যার মধ্যে থাকছে ফ্লাইট অপারেশন ও যাত্রী ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বেবিচকের হাতে শুধু নিরাপত্তা, এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ আর কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের দায়িত্ব থাকবে।
এ ছাড়া এই টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কে করবে তা নিয়েও জলঘোলা হয় অনেক। যাত্রীসেবা নিয়ে বহু অভিযোগ থাকার পরও শেষ পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে দুই বছরের জন্য দেওয়া হয়েছে এই টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজ। তবে বাংলাদেশ বিমান কতটা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সেবা দিতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে জাপানের।
এদিকে থার্ড টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিমান। সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বহরকে সমৃদ্ধ করতে ও সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে অত্যাধুনিক বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনা হচ্ছে গত দেড় বছর ধরেই। এ খাতে ইতোমধ্যে প্রায় হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলোর বেশ কিছু বহরে যুক্তও হয়েছে। এরই মধ্যে ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৩টি ইকুইপমেন্ট জিএসই বহরে সংযোজিত হয়েছে। আরও ৩৪টি নতুন ইকুইপমেন্ট আগামী কয়েক মাসের মধ্যে যুক্ত হয়ে ফ্লিট সমৃদ্ধ করে আমাদের সক্ষমতা আরও বাড়াবে।’
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা নিয়ে সন্দিহান জাইকা। তবে এখন থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য বিমান যেসব ইকুইপমেন্ট বিদেশ থেকে আমদানি করছে, তাতে বাংলাদেশ বিমান আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিতে পারবে বলে আমি আশা করছি।’
এই টার্মিনালের পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য ৬ হাজার দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হবে। শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য প্রায় ৪ হাজার কর্মীর প্রয়োজন হবে। এত জনবল নিয়োগ ও তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া একটি চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অনেকে। এ বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান খবরের কাগজকে বলেন, প্রাথমিকভাবে হয়তো প্রশিক্ষিত লোকবলের সংকট হতে পারে। তবে আমরা চেষ্টা করব আংশিকভাবে হলেও কাজ শুরু করার। পর্যায়ক্রমে সম্পূর্ণ কার্যক্রমে যাবে টার্মিনালটি।
অন্যদিকে বিমান বলছে, এরই মধ্যে জনবল নিয়োগের কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। এ বিষয়ে বোসরা ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৭০০ জনেরও বেশি কর্মীর দল রয়েছে আমাদের। এর পাশাপাশি পরিপূরক হিসেবে ৪০০ জন অতিরিক্ত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগ করছে বাংলাদেশ বিমান। দ্রুতই আরও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।’
থার্ড টার্মিনালের সক্ষমতা
শাহজালাল বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক মানের নতুন এই টার্মিনালটির আয়তন ২২ দশমিক ৫ লাখ বর্গফুট। বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দর দুটি টার্মিনালে ১০ লাখ বর্গফুট স্পেস রয়েছে। তৃতীয় টার্মিনালটি হলে বিমানবন্দরের বর্তমান যাত্রী ধারণক্ষমতা ৮০ লাখ থেকে বেড়ে ২ কোটি হবে এবং কার্গো ক্যাপাসিটি বর্তমান দুই লাখ টন থেকে বেড়ে পাঁচ লাখ টন হবে। তিন তলা টার্মিনাল ভবনটির আয়তন ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার। তৃতীয় টার্মিনালে ২৪টি বোর্ডিং ব্রিজের ব্যবস্থা থাকলেও প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১২টি বোর্ডিং ব্রিজ চালু করা হবে। বহির্গমনের জন্য ১৫টি সেলফ সার্ভিস চেক ইন কাউন্টারসহ ১১৫টি চেক ইন কাউন্টার থাকবে। ১০টি স্বয়ংক্রিয় পাসপোর্ট কন্ট্রোল কাউন্টারসহ ৬৬টি ডিপারচার ইমিগ্রেশন কাউন্টার থাকবে। এই টার্মিনালে একসঙ্গে ৩৭টি উড়োজাহাজ রাখা যাবে। রানওয়েতে উড়োজাহাজের অপেক্ষা কমাতে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি হাইস্পিড ট্যাক্সিওয়ে। এতে আরও বেশি বিমান ওঠানামা করবে বলেও আশা করছেন বিশ্লেষকরা। এ ছাড়া তৃতীয় টার্মিনালটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যাতে যাত্রীদের টার্মিনালে ঢুকতে ও বের হতে সুবিধা হয়। এ জন্য টার্মিনালটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ভূগর্ভস্থ রেলপথ এবং বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের সঙ্গে একটি টানেলের মাধ্যমে সংযুক্ত হবে। এ ছাড়া হজযাত্রীরা আশকোনা হজ ক্যাম্প থেকে আরেকটি টানেল দিয়ে থার্ড টার্মিনালে যেতে পারবেন।